কিশোরগঞ্জে গত তিন সপ্তাহ ধরে ফিলিং স্টেশনগুলোতে পেট্রোল ও অকটেনের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। পাম্পগুলোতে তেলের জন্য হাহাকার থাকলেও স্থানীয় খোলা বাজারে অতিরিক্ত দামে প্রকাশ্যে বোতলে বিক্রি হচ্ছে ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেন। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ ভোক্তারা।
মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) সকালে জেলার বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে এ চিত্র দেখা যায়।
এদিকে ফায়ার সার্ভিস বলছে, অবৈধভাবে জ্বালানি তেল বিক্রি করা এসব বিক্রেতাদের আইনের আওতায় আনা না হলে যে কোনো সময় ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা।
গ্রাহকরা বলছেন, পাম্পে তেল বিক্রি না হলেও স্থানীয় খোলা বাজারে অতিরিক্ত দামে তেল বিক্রি হচ্ছে। রাতের আঁধারে ড্রামে করে অনেক পাম্পে তেল বিক্রি হচ্ছে। হঠাৎ পাম্পগুলোতে তেল না থাকায় তারা বাধ্য হয়ে বেশি দামে তেল কিনছেন। কিন্তু বিষয়টি দেখেও প্রশাসন এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
তারা তেল সংকট নিরসনে প্রশাসনের ভূমিকা জোরদার করার দাবি জানান।
অপরদিকে পাম্প কর্তৃপক্ষ জানায়, দৈনিক যে পরিমাণ তেলের চাহিদা রয়েছে, সরবরাহ পেলেও তা অল্প সময়ের মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। তবে কিছু অসাধু খুচরা ব্যবসায়ী বেশি দামে তেল বিক্রি করায় সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে এবং পাম্প মালিকরাও আর্থিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
তারা দ্রুত স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, পেট্রোল ও অকটেনের স্বাভাবিক সরবরাহ বন্ধ থাকায় সাধারণ ভোক্তাদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। কোথাও সীমিত সরবরাহ এলেও তা দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। অনেকেই প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পেয়ে মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানবাহন ব্যবহার করতে পারছেন না। ফলে অনেক যানবাহন পেট্রোল না নিয়েই ফিরে যাচ্ছে। অথচ জ্বালানি তেল বিক্রি করতে ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর, বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের অনুমতি অত্যাবশ্যক। পাশাপাশি পরিমাণে কম পাওয়া, ভেজাল এবং দাম বেশি—এমন নানা উপায়ে প্রতারিত হচ্ছেন মানুষ। এ নিয়ে কোথাও কোথাও বাগবিতণ্ডা ও উত্তেজনার ঘটনাও ঘটছে।
এদিকে সংকটের সুযোগ নিয়ে কিছু খুচরা ব্যবসায়ী খোলা বাজারে প্রতি লিটার পেট্রোল ও অকটেন প্রায় ২৫০ টাকা দরে বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
জেলার বিভিন্ন হাট-বাজার থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, সদর উপজেলার যশোদল বাজারে প্রতি লিটার পেট্রোল ২৩০ টাকা, সিদ্ধিসির বাড়ির মোড়ে অকটেন ২৫০ টাকা, জেলা শহরের আখরা বাজারে অকটেন ২৪০ টাকা, করিমগঞ্জ উপজেলার নেয়ামতপুর বাজারে ডিজেল ২৪০ টাকা ও পাকুন্দিয়া সদরে অকটেন ২৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। অথচ সরকার নির্ধারিত দামে পেট্রোল প্রতি লিটার ১১৬ টাকা ও অকটেন ১২০ টাকা থাকার কথা।
মোটরসাইকেল চালক শরিফুল ইসলাম বলেন, “খোলা বাজারে ২৫০ টাকা লিটার দরে তেল বিক্রি হচ্ছে, অথচ পাম্পে তেল নেই। যদি খোলা বাজারে তেল পাওয়া যায়, তাহলে পাম্পে কেন দেওয়া যাচ্ছে না? এটাই আমাদের প্রশ্ন। এতে সাধারণ মানুষকে বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে। আর বিষয়টি প্রশাসন দেখেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।”
আরেক মোটরসাইকেলচালক আমিনুল বলেন, “পাম্পে গেলেই বলা হচ্ছে তেল নেই, অথচ একটু দূরে গেলেই একই তেল বোতলে করে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। তাহলে প্রশ্ন হলো, এই তেলগুলো আসছে কোথা থেকে? পাম্পে যদি সত্যিই পেট্রোল না থাকে, তাহলে বাজারে এত পেট্রোল কীভাবে পাওয়া যাচ্ছে? বিষয়টি সাধারণ মানুষের কাছে খুবই সন্দেহজনক মনে হচ্ছে। আমাদের কাছে এটি স্পষ্ট—এখানে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট কাজ করছে। তারা পরিকল্পিতভাবে ফিলিং স্টেশনগুলোতে সরবরাহ সীমিত রেখে বা বন্ধ দেখিয়ে বাইরে বেশি দামে তেল বিক্রি করছে। এতে করে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে অতিরিক্ত মুনাফা লুটে নেওয়া হচ্ছে। এ ব্যাপারে প্রশাসনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।”
জ্বালানির এই সংকট ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলেছে কৃষিখাতেও।
সদর উপজেলার যশোদল ইউনিয়নের ভূবিরচর গ্রামের কৃষক আমির হোসেন বলেন, “এখন সেচের মৌসুম চলছে। এই সময়টায় জমিতে নিয়মিত পানি দিতে না পারলে ধানসহ অন্যান্য ফসল বাঁচানো একেবারেই কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু ডিজেল সংকটের কারণে আমরা ঠিকমতো সেচ দিতে পারছি না। ফিলিং স্টেশনগুলোতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও তেল পাওয়া যাচ্ছে না, খালি হাতে ফিরে আসতে হচ্ছে। অন্যদিকে খোলা বাজারে তেল পাওয়া গেলেও সেখানে দাম এত বেশি যে আমাদের মতো সাধারণ কৃষকদের পক্ষে তা বহন করা খুবই কষ্টকর। তারপরও ফসল বাঁচানোর জন্য বাধ্য হয়ে বেশি দামে তেল কিনতে হচ্ছে।”
আরেক ভুক্তভোগী রাকিব হোসেন বলেন, “সরকার নির্ধারিত দাম অনুযায়ী পেট্রোল ও ডিজেল প্রতি লিটার কত হবে, সেটা কাগজে ঠিক করা হলেও মাঠে তার কোনো প্রভাব নেই। ফিলিং স্টেশনগুলোতে নিয়মিত তেলের সরবরাহ নেই, তাই সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলা হচ্ছে। আমরা পাম্পে যাই, সেখানে তেল নেই বলে ফিরে আসতে হয়। তারপরও খোলা বাজারে সেই একই তেল অতিরিক্ত দামে বিক্রি হচ্ছে।”
তবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি নন খুচরা দোকানিরা।
তাদের দাবি, সংসার চালাতে অন্য ব্যবসার পাশাপাশি বোতলে ভরে তেল বিক্রি করছেন তারা।
এ বিষয়ে একাধিক ফিলিং স্টেশন মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ঈদের আগে কর্তৃপক্ষ তাদের চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ করেনি। যেখানে তাদের তিন লরি তেলের প্রয়োজন, সেখানে রেশনিং ব্যবস্থায় সরবরাহ দেওয়া হয়েছে। চলতি মাসে দেওয়া পাঁচ হাজার লিটার ডিজেল ও পেট্রোল ঈদের আগেই শেষ হয়ে গেছে। এখন গ্রাহকরা এসে ফিরে যাচ্ছেন। যেখানে চাহিদা প্রায় নয় হাজার লিটার, সেখানে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র দুই হাজার লিটার।
সচেতন নাগরিক কমিটি জানায়, যানবাহন ছাড়া অন্য পদ্ধতিতে পাম্প থেকে তেল বিক্রি বন্ধ করা গেলে অচিরেই এ সমস্যা থেকে মুক্তি মিলবে। তা না হলে ভবিষ্যতে চরম মূল্য দিতে হতে পারে জেলাবাসীকে। মূলত খুচরা দোকানিরা পাম্প থেকে তেল কিনে বোতলজাত করে বেশি দামে বিক্রি করে, যা এক ধরনের বড় প্রতারণা।
কিশোরগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক মোফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘‘খোলা তেল বিক্রিতে নাশকতার আশঙ্কা থাকে। পাশাপাশি রয়েছে দুর্ঘটনার শঙ্কা। এ জন্য প্রশাসনের আন্তরিকতা প্রয়োজন।’’
এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. কামরুল হাসান মারুফ বলেন, “আমি নিজেও একটি ফেসবুক পোস্ট দিয়েছি—কোথাও খোলা বাজারে তেল বিক্রির তথ্য পেলে আমাকে জানাতে। সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ সবাই গিয়ে আইনি ব্যবস্থা নেবে।”
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ নাহিদ হাসান খান বলেন, ‘‘বিষয়টি অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট দেখেন। তিনি এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের অবহিত করবেন।’’
কেকে/এসএ