জামালপুর সদরসহ প্রতিটি উপজেলায় জ্বালানি তেলকে ঘিরে অস্বাভাবিক এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। পেট্রল পাওয়া যেন সোনার হরিণ বা হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো অবস্থা—এমন চিত্রই দৃশ্যমান। পেট্রল পাম্পগুলোতে তেলের সংকট দেখানো হলেও খোলাবাজারে মিলছে সহজেই—তবে সরকারি দামের চেয়ে দ্বিগুণ-তিনগুণ বেশি দামে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ ও পরিবহন-সংশ্লিষ্টরা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, জামালপুর জেলা সদরসহ প্রতিটি উপজেলার বিভিন্ন পেট্রল পাম্পে দিনের পর দিন ১০০ টাকা বা ২০০ টাকার পেট্রল দেওয়া হচ্ছে, তাও আবার দুই থেকে তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর। আবার অনেকেই দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে তেল না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। অপরদিকে কোনো কোনো পাম্পে ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলতে দেখা যায়। অথচ একই সময়ে উপজেলার বিভিন্ন মোড়, বাজার ও দোকানে খোলাবাজারে পেট্রোল ও অকটেন বিক্রি হচ্ছে লিটারপ্রতি ৪০০-৫০০ টাকায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি সংঘবদ্ধ চক্র কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে।
তাদের অভিযোগ, জামালপুর সদরের বেশ কয়েকটি ফিলিং স্টেশনসহ জগন্নাথঘাট এলাকার চান মিয়া ফিলিং স্টেশন, বয়ড়া একুশের মোড়ের নূরজাহান ফিলিং স্টেশন এবং পপুলার মোড়ের ঝিনাই ফিলিং স্টেশনে পর্যাপ্ত তেল মজুত থাকা সত্ত্বেও সাধারণ ক্রেতাদের কাছে তা বিক্রি করা হচ্ছে না। বরং নির্দিষ্ট চক্রের মাধ্যমে গোপনে সরবরাহ করা হচ্ছে।
এক ভুক্তভোগী জানান, সারাদিন পাম্পে অপেক্ষা করেও তেল পাওয়া যায় না। তবে পরিচিতি থাকলে রাতের বেলায় বেশি দামে তেল পাওয়া সম্ভব।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ট্রাকচালকের অভিযোগ, কিছু পাম্প থেকে সরাসরি গাড়িতে তেল না দিয়ে গ্যালনে করে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে সরবরাহ করা হচ্ছে, যা পরে কালোবাজারে বিক্রি হচ্ছে।
তারাকান্দি এলাকার ব্যবসায়ী মোফাজ্জল হোসেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে লিখেছেন, “পেট্রল পাম্পে নেই, কিন্তু মুদির দোকানে পাওয়া যাচ্ছে। পাম্পে তেল এনেও ‘তেল নেই’ বলা হচ্ছে—এটা যেন মগের মুল্লুক।”
তার এই মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
স্থানীয়রা জানান, প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল পাম্প থেকে সরিয়ে কালোবাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে জড়িত রয়েছে পাম্প মালিক, মধ্যস্বত্বভোগী ও খুচরা বিক্রেতাদের একটি নেটওয়ার্ক। এ ধরনের কর্মকাণ্ড শুধু বাজারব্যবস্থার ব্যত্যয় নয়, বরং ভোক্তা অধিকার লঙ্ঘনের শামিল। একই সঙ্গে এটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। নিয়মিত তদারকি ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম জোরদার করা হলে এ ধরনের অনিয়ম কমানো সম্ভব। এ বিষয়ে জেলার মনিটরিং সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
এদিকে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান কোনো কঠোর অভিযান চোখে পড়েনি।
এ ব্যাপারে পাম্প মালিকরা জানান, তেল ডিপো থেকে পর্যাপ্ত সরবরাহ করা হচ্ছে না। প্রতিটি তেল লরিতে ১৫ হাজার টাকা বেশি দিয়েও ৩-৪ দিন অপেক্ষা করেও তেল পাওয়া যাচ্ছে না।
তেল ডিপো থেকে তেল সরবরাহ না হলে তারা জনগণকে কীভাবে দিবেন—এই প্রশ্ন রাখেন তারা।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, পাম্পে তেল না থাকলেও বাজারে যে তেল পাওয়া যাচ্ছে, তা আসছে কোথা থেকে?
জামালপুর সদর নির্বাহী কর্মকর্তা নাজনীন আক্তারকে বিষয়টি অবহিত করলে তিনি বলেন, ‘‘এ বিষয়ে জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসন মনিটরিং করছে। যদি কোথাও কেউ নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে পেট্রল বিক্রি করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’
কেকে/এসএ