বুকের ভেতর আগলে রাখা শেষ আশ্রয়টুকুও হারিয়ে গেল মুহূর্তের অসতর্কতায়। যে বাবা চার বছর ধরে মাতৃহীন দুই সন্তানকে পরম মমতায় আগলে রেখেছিলেন, সেই বাবার নিথর দেহ আজ ঘাসের ওপর পড়ে আছে।
মাগুরা-মহম্মদপুর সড়কের কালুকান্দি মোড়ে এক ঘাতক বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে নিভে গেছে রাসেল শেখের (৩২) জীবনপ্রদীপ। সঙ্গে সঙ্গে ৬ বছরের সামিয়া এবং ৪ বছরের সামিউলের জীবনে নেমেছে ঘোর অন্ধকার।
কান্নার শব্দ নেই, আছে শুধু শূন্য দৃষ্টি।
বুধবার (২৫ মার্চ) সকালেই দুর্ঘটনাটি ঘটে। তখন কেউ জানত না এই মৃত্যুর পেছনে লুকিয়ে আছে কতটা দীর্ঘশ্বাস।
নিহত রাসেলের বাড়ি ফরিদপুরের নগরকান্দার কুঞ্জ নগর গ্রামে। চার বছর আগে, যখন ছোট ছেলে সামিউলের বয়স মাত্র দেড় মাস, তখন তাদের মা ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। আত্মীয়স্বজনহীন এই পৃথিবীতে দুই সন্তানকে নিয়ে একা লড়াই করছিলেন রাসেল। মাত্র তিন মাস আগে মাগুরা সদরের মীরপাড়ায় ভাড়া বাসায় নতুন করে সংসার পেতেছিলেন তিনি। স্বপ্ন ছিল সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যৎ দেওয়ার।
কিন্তু ২৫ মার্চ বুধবার সকালের সেই কালবৈশাখী ঝড় সব তছনছ করে দিল। এখন এতিম শিশুদের দায় নেবে কে?
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাসেল ভ্যানে কাঁচামাল নিয়ে মহম্মদপুরের দিকে যাচ্ছিলেন। দ্রুতগামী একটি ঘাতক বাস তাকে চাপা দিয়ে পালিয়ে যায়। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। বর্তমানে এই দুই শিশুর পাশে দাঁড়ানোর মতো কোনো নিকটাত্মীয়ের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের নানাবাড়ির কেউ জীবিত নেই, আর বাবার ঠিকানায়ও কোনো স্বজনের দেখা মেলেনি। নানি নেই, মা নেই, আজ থেকে বাবাও নেই—পুরো দুনিয়ায় সামিয়া আর সামিউল এখন আক্ষরিক অর্থেই নিঃসঙ্গ।
মহম্মদপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। আমরা ঘাতক বাসটি শনাক্ত করার চেষ্টা করছি এবং মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বিশেষ করে এই অসহায় শিশুদের ভবিষ্যতের বিষয়টি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছি এবং আইনি প্রক্রিয়ায় তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, দুর্ঘটনার পর থেকে ঘাতক বাস মালিক সমিতি বা সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষই এই এতিম শিশুদের দায় নিতে এগিয়ে আসেনি। মা মরা শিশু দুটি যখন বাবার লাশের পাশে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে, তখন উপস্থিত সাধারণ মানুষের চোখেও জল আটকে রাখা সম্ভব হয়নি। এই অসহায় শিশুদের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। সমাজ ও প্রশাসনের সম্মিলিত উদ্যোগই পারে এই দুই শিশুকে অন্ধকারের গহ্বর থেকে রক্ষা করতে।
কেকে/এলএ