ইরান যুদ্ধের কারণে সারা দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের কিছুটা সংকট দেখা দিয়েছে। যদিও পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সরকার নানা উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কারণে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে জ্বালানি বাজারে। অধিক মুনাফার আশায় কিছু ব্যবসায়ী অবৈধভাবে জ্বালানি তেল মজুত করছে। সরকারও স্বীকার করছে, সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও কালোবাজারির কারণে সংকট দেখা দিয়েছে।
ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এতে বিপাকে পড়েছে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। তবে সরকার তেল সংকট মোকাবিলায় শুরু থেকেই বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। কিছুদিন রেশনিং পদ্ধতিতে তেল সরবরাহ করা হয়েছে। পরে যদিও তা তুলে নেওয়া হয়। কিন্তু আতঙ্কে মানুষ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তেল কেনায় চাহিদার সঙ্গে জোগানের পার্থক্য তৈরি হয়েছে। তার ওপর কালোবাজারি সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।
এ ছাড়া সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে তেল সংকটকে কাজে লাগানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
জ্বালানি তেলের সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং অবৈধ মজুতদারি প্রতিরোধে দেশের সব জেলায় ভিজিল্যান্স টিম গঠন করেছে সরকার। একই সঙ্গে অবৈধভাবে জ্বালানি তেল মজুত বা কৃত্রিম সংকট তৈরির তথ্য প্রদানকারীদের জন্য পুরস্কার ঘোষণার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গতকাল সন্ধ্যায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা যায়।
এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, তেলের সরবরাহ সবসময়ই আছে এবং সারা দেশের ডিসি-এসপিদের সঙ্গে কথা বলেছি, তারা মনিটরিং করছেন। তবে এই যে হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার মধ্যে দুর্নীতি আছে এবং সেটা কালোবাজারি (ব্ল্যাক মার্কেটিং) হচ্ছে, যা ইতোমধ্যেই সিরাজগঞ্জসহ সারা দেশে ধরা পড়ছে।
তিনি আরও বলেন, পেট্রোল পাম্পে আগে দিনে এক লরি তেল লাগত; এখন হঠাৎ যুদ্ধের কারণে মানুষ সব তেল সংগ্রহ শুরু করেছে। যার কারণে ওই পেট্রোল পাম্প আগে সারা দিনে যা বেচত, এখন দুই ঘণ্টায় তা বিক্রি হয়ে যায়। তারপর পেট্রোল পাম্পটি বন্ধ হয়ে যায়, আর বলা হয় পেট্রোল পাম্প বন্ধ হয়ে গেছে।
এদিকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অভিযোগ করেছেন, সরকারি ভাবমূর্তি নষ্ট করার উদ্দেশ্যে তেল নিয়ে প্যানিক সৃষ্টি করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, সরকারি ভাবমূর্তি নষ্ট করার উদ্দেশ্যে কিছু কালোবাজারি জ্বালানি তেল মজুত রেখে তা বাইরে বিক্রি করছে। আমির খসরু বলেন, এ পরিস্থিতিতে সবাইকে সচেতন হতে হবে, একে অপরকে সহযোগিতা করতে হবে এবং স্থানীয় সংসদ সদস্যদের আরও সক্রিয় হতে হবে।
শেরপুরে আবাসিক ভবনে নিয়মবহির্ভূতভাবে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল মজুত রেখে ব্যবসা পরিচালনা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না রাখার অভিযোগে এক ব্যবসায়ীকে জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। একই সঙ্গে জননিরাপত্তার স্বার্থে ওই তেলের মজুত সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয়দের কাছ থেকে অভিযোগ পেয়ে গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে শহরের গোয়ালপট্টি এলাকার ‘মেসার্স শিমলা ট্রেডার্সে’ ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার মো. মাহমুদুল হাসান এ অভিযান চালান।
এ সময় শেরপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) নাসরিন আক্তার, জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার সেলিম রেজা ও সদর থানার ওসি সোহেল রানাসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
ভ্রাম্যমাণ আদালত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মেসার্স শিমলা ট্রেডার্সের মালিক তাপস নন্দী ও শফিকুল ইসলাম হেলাল দীর্ঘদিন ধরে আবাসিক ভবনের নিচে প্রায় ২৭ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার একটি ট্যাংক নির্মাণ করে ডিজেল ও কেরোসিন বিক্রি করে আসছিলেন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। অভিযানের সময় সেখানে প্রায় ১৮ হাজার লিটার ডিজেল মজুত পাওয়া যায়।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘খুচরা দোকানে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল মজুতের অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে নানা অনিয়ম পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানটির খুচরা বিক্রির লাইসেন্স থাকলেও পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কোনো ছাড়পত্র তারা দেখাতে পারেনি। এ কারণে পেট্রোলিয়াম আইন, ২০১৬-এর ২০ ধারায় তাপস নন্দীকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই সঙ্গে শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে মজুত রাখা ডিজেল ও কেরোসিন নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে এবং আবাসিক ভবনে স্থায়ীভাবে জ্বালানি তেল বিক্রি বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুল।
এদিকে চট্টগ্রামে ‘মজুত’ করা প্রায় ছয় হাজার লিটার ডিজেল জব্দ করার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
গতকাল শুক্রবার দুপুরে বিমানবন্দরসংলগ্ন বাটারফ্লাই পার্কের বিপরীতে মাদ্রাসা গেট এলাকায় এ অভিযানে দুজনকে আটক করা হয়েছে।
পতেঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তফা আহম্মেদ গণমাধ্যমকে বলেন, বৃহস্পতিবার থেকে নজরদারিতে রাখার পর শুক্রবার দুপুরে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা (ডিজিএফআই), জেলা প্রশাসন ও পুলিশ যৌথভাবে এ অভিযান পরিচালনা করে।
ওসি বলেন, ‘অভিযানে ৩০টি ড্রামভর্তি ডিজেল উদ্ধার করে দুজনকে আটক করা হয়। জব্দ করা ডিজেলের পরিমাণ ছয় হাজার লিটারের কাছাকাছি হতে পারে।’
এ ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে বলে জানান ওসি মোস্তফা।
এদিকে জেলা প্রশাসনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, প্রাথমিক অনুসন্ধানে তারা জেনেছেন, সমুদ্রগামী জাহাজ ও তেল ডিপো থেকে জ্বালানি তেল পরিবহনের সময় একটি চক্র জ্বালানি তেল সরিয়ে বিক্রির জন্য মজুত করে।
এদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরে জ্বালানি তেল থাকার পরও বিক্রি বন্ধ করে দেওয়ায় একটি পেট্রোল পাম্পকে জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। গতকাল দুপুরে উপজেলার পার্বতীপুর ইউনিয়নের বড়দাদপুর এলাকার মেসার্স ব্রাদার্স অ্যান্ড সিস্টার্স ফিলিং স্টেশনকে এ জরিমানা করা হয়।
ভ্রাম্যমাণ আদালতে নেতৃত্ব দেওয়া নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও গোমস্তাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জাকির মুন্সী এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, মেসার্স ব্রাদার্স অ্যান্ড সিস্টার্স ফিলিং স্টেশনে ‘পাম্পে তেল নেই’ ব্যানার ঝুলিয়ে দিয়ে জ্বালানি তেল বিক্রয় বন্ধ করে দেওয়া হয়। বিষয়টি জানতে পেরে ভ্রাম্যমাণ আদালত ওই পাম্পে যান এবং তেলের মজুত যাচাই করেন।
এ সময় দেখা যায়, সেখানে ২ হাজার ৩৬৮ লিটার পেট্রোল, ৩ হাজার ৭৬০ লিটার ডিজেল এবং ৩ হাজার ৬৫৫ লিটার অকটেন মজুত রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, মজুত থাকা সত্ত্বেও বিক্রি না করার অপরাধে ওই পেট্রোল পাম্পকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। জনস্বার্থে এমন অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।
কেকে/এলএ