মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      চীন পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলাকাগজ স্পেশাল
ভর্তুকির চাপে সরকার
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশ: শনিবার, ২৮ মার্চ, ২০২৬, ৯:৪৬ এএম আপডেট: ২৮.০৩.২০২৬ ১০:০৩ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

দেশে জ্বালানি খাতে বৈশ্বিক অস্থিরতা ও সরবরাহ সংকটের প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে ঈদযাত্রাকে ঘিরে এই সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর আমদানিতে বিঘ্ন, বাড়তি চাহিদা এবং সরবরাহে অনিশ্চয়তার কারণে সরকারকে প্রতিদিন ১৬৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে। তবে চাপ থাকা সত্ত্বেও আপাতত জ্বালানি তেলের দাম না বাড়ানোর অবস্থানে রয়েছে সরকার।

একই সঙ্গে বিকল্প উৎস থেকে আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হলেও এরই মধ্যে নৌপরিবহন ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। যা নিত্যপণ্যের বাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন— ‘দুর্ভোগ কমাতে সরকার প্রতিদিন জ্বালানি তেলে ১৬৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে।’

গতকাল শুক্রবার দুপুর ১২টায় যশোরে দুস্থ ও অসহায় ব্যক্তির মাঝে অনুদানের চেক বিতরণ অনুষ্ঠানে তিনি এ মন্তব্য করেন।

প্রতিমন্ত্রী বলেন— ‘জনগণের কষ্ট লাঘবে সরকার কাজ করছে। বহির্বিশ্বের অস্থিরতার মধ্যেও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি করেনি। তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে বিদ্যুৎ, গণপরিবহন ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি পায়। চতুর্দিক থেকে চাপ থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কোনো পরিকল্পনা করেনি।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, সারা বিশ্বে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও বাংলাদেশে তা স্থিতিশীল আছে। তার কারণ সরকারের বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি। এতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। মানুষ স্বস্তিতে আছে। কিন্তু ইরান যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে সমস্যা বাড়তে পারে। কারণ সরকারের পক্ষে খুব বেশিদিন জ্বালানি তেলে বাড়তি ভর্তুকি দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

সংকট মোকাবিলায় নতুন পথ খুঁজছে বাংলাদেশ :

মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন দেখা দেওয়ায় বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে জরুরি চাহিদা মেটাতে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ৩ লাখ টন ডিজেল আমদানির অনুমোদন দিয়েছে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। সরকার এখন কাজাখস্তান ও নাইজেরিয়ার সঙ্গে সরকার-থেকে-সরকার (জিটুজি) ভিত্তিতে জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নিচ্ছে। স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি— দুই ধরনের চুক্তির লক্ষ্যেই কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে।

জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ ১৯ মার্চ নাইজেরিয়া এবং ২৪ মার্চ কাজাখস্তান বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে। এতে দুই দেশের সঙ্গে যোগাযোগে কূটনৈতিক সহায়তা চাওয়া হয়েছে। কাজাখস্তানকে সম্ভাবনাময় অংশীদার হিসেবে দেখছে সরকার। দেশটির বড় হাইড্রোকার্বন মজুদ, স্থিতিশীল উৎপাদন এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদে সুবিধা দিতে পারে। এলপিজি আমদানির সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

সংকট মোকাবিলায় সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ৩ লাখ টন ডিজেল আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে এপি এনার্জি ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড থেকে ১ লাখ টন এবং সুপারস্টার ইন্টারন্যাশনাল (গ্রুপ) লিমিটেড থেকে ২ লাখ টন ডিজেল আনা হবে।

বাংলাদেশে প্রতি মাসে ২ লাখ ৮০ হাজার থেকে ৩ লাখ টন ডিজেল প্রয়োজন হয়। পরিবহন, কৃষি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে এই জ্বালানির ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। কর্মকর্তারা জানান, ২৫ হাজার টনের একটি কার্গো প্রায় ১০ দিনের চাহিদা মেটাতে পারে।

ভারত থেকে এলো ৫ হাজার টন জ্বালানি তেল :

এদিকে জ্বালানি তেলের সংকটের মধ্যে দিনাজপুরের পার্বতীপুর ডিপোতে প্রায় অর্ধলক্ষাধিক লিটার বা পাঁচ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল তেল এসে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে জ্বালানি তেল সরবরাহ ঠিক রাখার লক্ষ্যে শুক্রবার ছুটির দিনেও ডিপো খোলা রেখেছে কর্তৃপক্ষ। গতকাল শুক্রবার সকালে বাংলাদেশ-ভারত ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল নিয়ে আসার কার্যক্রম সম্পন্ন হয়।

জানা গেছে, গত মঙ্গলবার দুপুরে ভারতের আসামে অবস্থিত নুমালিগড় রিফাইনারি কেন্দ্র থেকে পাইপলাইনে দিনাজপুরের পার্বতীপুরে রেলহেড অয়েল ডিপোতে ৫৭ লাখ লিটার বা পাঁচ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল তেল সরবরাহ কার্যক্রম শুরু হয়। প্রায় ৬০ ঘণ্টা পর শুক্রবার সকাল ৬টার দিকে ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন প্রকল্পের রিসিপ্ট টার্মিনালে এসব ডিজেল তেল পৌঁছায়। এরপর সেখান থেকে সাড়ে ৮টার দিকে রিসিপ্ট টার্মিনাল থেকে জ্বালানি রেলহেড অয়েল ডিপোর পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা— এ তিন কোম্পানিতে এসব তেল সরবরাহ করা হয়।

এ ছাড়া ৩০ হাজার টন পরিশোধিত জ্বালানি তেল নিয়ে হংকং পতাকাবাহী একটি তেলবাহী জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে।

গত বৃহস্পতিবার ‘এমটি গ্রান কাউভা’ নামের ট্যাংকারটি বন্দরে নোঙর করে। জানা গেছে, চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি প্রতিষ্ঠান ইউনিপেক এই চালানটি রপ্তানি করেছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক ইউসুফ হোসেন ভূঁইয়া জানিয়েছেন, জাহাজটিতে ২০ হাজার টন ডিজেল এবং ১০ হাজার টন জেট ফুয়েল রয়েছে। ডিজেল পরিবহন ও শিল্প খাতে ব্যবহার করা হবে, আর জেট ফুয়েল সরবরাহ করা হবে দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরে।

অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন ব্যাহত, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা :

ক্রমবর্ধমান জ্বালানি সংকটে দেশের নৌপথগুলোতে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। এতে হুমকির মুখে পড়েছে সরবরাহ ব্যবস্থা। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দামে গিয়ে প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই সংকটের কারণে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে দেশের অভ্যন্তরীণ গন্তব্যগুলোতে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে। সাধারণত বহির্নোঙরে থাকা মাদার ভেসেল (বড় জাহাজ) থেকে আমদানিকৃত পণ্য খালাস করে ছোট ছোট হাজারো লাইটার জাহাজ দেশের বিভিন্ন নৌপথে তা পরিবহন করে থাকে।

ব্যবসায়ী ও নৌপরিবহন পরিচালনাকারীরা বলছেন, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) থেকে পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ না পাওয়ার কারণে নৌপথে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা অনেকটা ভেঙে পড়েছে। ফলে দেশের দ্রব্যমূল্য খাতে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাফা) সহসভাপতি খায়রুল আলম সুজন বলেন, জ্বালানির এই সংকট ইতোমধ্যেই লজিস্টিক্যাল ও আর্থিক চাপ তৈরি করতে শুরু করেছে।

তিনি বলেন, ‘মাদার ভেসেল থেকে আমদানি করা পণ্য লাইটার জাহাজের মাধ্যমে খালাস করা হয়। লাইটার জাহাজ যদি না চলে, তাহলে মাদার ভেসেল অলস বসিয়ে রাখতে হয়। জাহাজের আকারভেদে দৈনিক ১০ থেকে ২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয় হয়। এই ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হয়, যার চূড়ান্ত প্রভাব ভোক্তা পর্যায়ে পড়ে।’

বাংলাদেশ ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেলের (বিআইডাব্লিউটিসিসি) মুখপাত্র পারভেজ আহমেদ বলেন, প্রায় এক মাস ধরে জ্বালানি সংকটের এই নেতিবাচক প্রভাব পণ্য পরিবহন কার্যক্রমে পড়ছে। তিনি বলেন, ‘জ্বালানি সংকটে গতকালও আকিজ বশির গ্রুপের চারটি জাহাজ গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে পারেনি। ঈদের আগের তিন সপ্তাহসহ গত চার সপ্তাহ ধরে আমরা প্রয়োজনমতো জ্বালানি তেল পাচ্ছি না।’

ডিজেল সংকটের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রুটে চলাচলকারী বড় জাহাজগুলোতে ব্যবহৃত মেরিন ফুয়েল নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিচ্ছে। মাদার ভেসেলগুলো ০.৫ সালফারযুক্ত বিশেষায়িত মেরিন ফুয়েল (এলএসএফও) ব্যবহার করে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে চলতি মাসের শুরুতে সিঙ্গাপুরে এই তেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে, যা বর্তমানে বাংলাদেশের তুলনায় বেশি।

অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন খাতের সঙ্গে যুক্ত সূত্রগুলো বলছে, ডিজেল সরবরাহ সীমিত থাকায় অনেক জাহাজ ও বাল্কহেড সময়মতো গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করতে না পারায় নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দর থেকে পণ্য পরিবহনে বিলম্ব হচ্ছে। এর পাশাপাশি কিছু জাহাজ অপারেটর ফ্রেইট চার্জও বেশি দাবি করছে। ফলে ব্যবসায়ীদের ওপর নতুন করে বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।

গম, ভোজ্যতেল, চাল, সিমেন্টের কাঁচামাল, সারসহ নৌপথে বিপুল পরিমাণ পণ্য নারায়ণগঞ্জে পরিবহন করা হয়। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, চট্টগ্রাম থেকে নারায়ণগঞ্জ আসার নৌপথগুলোতে সম্প্রতি জাহাজের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  ভর্তুকি   চাপ   সরকার  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close