মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দেওয়ায় দেশজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারেও অস্থিরতা চরমে পৌঁছেছে। এরই মধ্যে তেলের সরবরাহ, মূল্য এবং বিতরণব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন, কোথাও ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড, আবার কোথাও সীমিত সরবরাহ—সব মিলিয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ ও পরিবহন খাত সংশ্লিষ্টরা। এ অবস্থার পেছনে সরবরাহ চাপের পাশাপাশি বেপরোয়া মজুদদারদের তৎপরতাকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে সরকারের পক্ষ থেকে আরও স্বচ্ছতা, কার্যকর নজরদারি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি। একই সঙ্গে সাধারণ জনগণকেও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে, যাতে অযৌক্তিক চাহিদা তৈরি না হয় এবং বাজারে কৃত্রিম সংকট না বাড়ে।
রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় পাম্পে তেল নিতে ভোর থেকেই ভিড় জমাচ্ছেন মোটরসাইকেল চালক, প্রাইভেটকার মালিক এবং গণপরিবহন চালকরা। অনেক পাম্পে নির্ধারিত সময়ের আগেই তেল শেষ হয়ে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে যাত্রী পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে, বাড়ছে ভাড়া এবং নিত্যদিনের চলাচলে তৈরি হচ্ছে অনিশ্চয়তা।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই দেশে মজুদদারি বেড়ে গেছে। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী গোপনে তেল মজুদ করে বেশি দামে বিক্রির চেষ্টা করছেন। ফলে সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক থাকলেও অনেক এলাকায় কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে।
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে মজুদ করা বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল উদ্ধার করেছে প্রশাসন। কোথাও গোয়ালঘরে ড্রামভর্তি পেট্রোল, কোথাও বসতবাড়িতে লুকিয়ে রাখা অকটেন—এমন একাধিক ঘটনার তথ্য মিলেছে। এসব ঘটনায় জড়িতদের জরিমানা করা হলেও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি পরিস্থিতি।
ভোক্তারা অভিযোগ করছেন, অনেক পাম্পে তেল থাকা সত্ত্বেও ‘সংকট’ দেখিয়ে বিক্রি সীমিত করা হচ্ছে। আবার কোথাও নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দাম নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়ছে।
এদিকে সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে। জ্বালানি ডিপোতে কঠোর নজরদারি, ফিলিং স্টেশনে সরবরাহ তথ্য প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা, জেলায় জেলায় ভিজিল্যান্স টিম গঠন এবং নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ডিপো থেকে জ্বালানি সরবরাহের নতুন সময়সূচিও নির্ধারণ করা হয়েছে। নিরাপত্তা জোরদারে দেশের বিভিন্ন জ্বালানি ডিপোতে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। সীমান্ত দিয়ে জ্বালানি পাচার ঠেকাতে বাড়ানো হয়েছে টহল ও তল্লাশি কার্যক্রম।
দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ থাকা সত্ত্বেও কৃত্রিম সংকট তৈরি ও চোরাচালান রোধে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। সেই সঙ্গে তেলের দাম স্থিতিশীল রাখতে সরকার প্রতি মাসে ২০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে বলে জানিয়ে সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ এলাকায় সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গতকাল শনিবার সংসদ ভবনে সরকারদলীয় সংসদীয় কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম।
জ্বালানি সংকট ও কৃত্রিম সংকট রোধ প্রসঙ্গে চিফ হুইপ জানান, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লেও বাংলাদেশে সেটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। সরকার প্রতি মাসে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে তেলের দাম ঠিক রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু কিছু অসাধু চক্রের কারণে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা চলছে।
দেশে জ্বালানি তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে এবং মজুদদারি ও অনিয়ম ঠেকাতে দেশের ৯টি জেলার ১৯টি জ্বালানি ডিপোতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মোতায়েনকৃত বিজিবি সদস্যরা অস্থায়ী বেইস ক্যাম্প থেকে একজন কর্মকর্তার নেতৃত্বে দায়িত্ব পালন করছেন। তারা নিয়মিত তদারকি, প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা এবং ডিপোগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করছেন। জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা অনিয়ম দেখা দিলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
বিজিবি সূত্র জানায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে অবৈধভাবে জ্বালানি মজুদ, অতিরিক্ত দামে বিক্রি এবং কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির চেষ্টা ঠেকাতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে যেকোনো ধরনের নাশকতা বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি রাখা হয়েছে।
এদিকে সীমান্ত দিয়ে জ্বালানি তেল পাচার প্রতিরোধেও জোরদার করা হয়েছে নজরদারি। বিজিবি অতিরিক্ত স্থল ও নৌ টহল চালাচ্ছে এবং গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে গোয়েন্দা তৎপরতাও বাড়ানো হয়েছে।
গবেষকরা বলছেন, বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লে বাংলাদেশের ওপর বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি হবে। একটি গবেষণা অনুযায়ী, প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১০ ডলার বাড়লে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় বাড়বে। আর যদি দীর্ঘ সময় ধরে তেলের দাম ১২০ ডলারের বেশি থাকে, তাহলে বছরে অতিরিক্ত ব্যয় ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ৬১ হাজার কোটি টাকার সমান।
চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান গবেষক এম জাকির হোসেন খান বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ প্রায় ৯৫ শতাংশ জ্বালানির জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে দেশের মাসিক ব্যয় প্রায় ৮০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বেড়ে যায়। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি একদিকে সংকট হলেও অন্যদিকে এটি একটি সুযোগ। এখনই জ্বালানি স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করতে না পারলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে হবে।
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, সরকার দীর্ঘদিন ভর্তুকি দিয়ে এই চাপ সামাল দিতে পারবে না। একপর্যায়ে মূল্য সমন্বয় করতে হলে শিল্প খাতে ‘ডি-ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন’-এর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি জি এম শফিকুজ্জামান বলেন, দেশে কোনো পণ্যের দাম বাড়ার প্রবণতা দেখা দিলেই মজুদদারি শুরু হয় এবং বর্তমানে জ্বালানি বাজারেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, তেলের সরবরাহ চেইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সরকারকে বিকল্প উৎস থেকে বেশি দামে তেল আমদানি করতে হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থার ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যার ফলে প্যানিক বায়িং বাড়ছে।
তার মতে, সরকার প্রতিদিন মজুদ ও সরবরাহসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করলে এ পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতো। তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, যুদ্ধের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা না থাকলেও এর প্রভাব ইতোমধ্যেই দেশে পড়েছে এবং ভবিষ্যতে তা আরও বাড়বে। বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহ কমে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হবে, যা শিল্প খাত—বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্পে—বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে, জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে মজুদদারির ঘটনাও সামনে আসছে। কুড়িগ্রামের রৌমারীতে এক বিএনপি নেতার বাড়ির গোয়ালঘর থেকে ড্রামভর্তি পেট্রোল উদ্ধার করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। অভিযোগ রয়েছে, এসব পেট্রোল অধিক দামে বিক্রি করা হচ্ছিল। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের জরিমানা করা হয়েছে।
এর আগে পাবনার সুজানগরে একটি বসতবাড়ি থেকে প্রায় দেড় হাজার লিটার পেট্রোল ও অকটেন উদ্ধার করে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। উদ্ধারকৃত জ্বালানি সরকার নির্ধারিত মূল্যে তাৎক্ষণিকভাবে বিক্রি করা হয় এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে জরিমানা করা হয়। এছাড়া একই দিনে বিভিন্ন বাজারে অভিযান চালিয়ে অতিরিক্ত দামে তেল বিক্রির অভিযোগে একাধিক প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়।
জামালপুর সদর উপজেলার পিটিআই মোড়ে ‘মেসার্স জুঁই এন্টারপ্রাইজ’ নামে একটি পাম্পে পেট্রোল নেই বলা হলেও পরে সেখানে ১২টি ড্রামে প্রায় ২ হাজার ৮০০ লিটার পেট্রোল মজুদের তথ্য পায় প্রশাসন। মজুদ থাকা সত্ত্বেও গ্রাহকদের কাছে তেল বিক্রি না করে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগে পাম্পটির ব্যবস্থাপককে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এর আগে শুক্রবার দুপুরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলায় ‘তেল নেই’ লিখে বিক্রি বন্ধ রাখায় একটি ফিলিং স্টেশনে প্রায় ১০ হাজার লিটার জ্বালানি মজুদ পেয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ ঘটনায় পাম্প মালিককে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
ফরিদপুর সদর উপজেলার কানাইপুর বাজার এলাকায় দুটি পেট্রোল পাম্পে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা হয়েছে। মজুদ থাকা সত্ত্বেও তেল বিক্রি না করায় একটি পাম্পকে জরিমানা এবং অপরটিকে সতর্ক করা হয়েছে। হোসেন ফিলিং স্টেশনে পাম্প বন্ধ থাকলেও সেখানে ৭ হাজার লিটার পেট্রোল, ৬ হাজার ৫০০ লিটার অকটেন এবং ১৪ হাজার ৫০০ লিটার ডিজেল মজুদ রয়েছে। ভোক্তাদের কাছে তেল বিক্রি না করায় পাম্পের ম্যানেজারকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় এবং তাৎক্ষণিকভাবে পাম্প চালু করে সব ধরনের যানবাহনে তেল সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়।
অন্যদিকে রয়েল ফিলিং স্টেশনে পেট্রোল ও অকটেন বিক্রি বন্ধ রেখে শুধু ডিজেল বিক্রি করা হচ্ছিল। মজুতে থাকা তেল যাচাইয়ের পর পাম্প কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা শুনে পেট্রোল ও অকটেন সরবরাহ চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে জরিমানা না করে কঠোর সতর্কবার্তা দেওয়া হয়।
কেকে/এলএ