রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে প্রতিদিনই নিউমোনিয়া ও হাম রোগে শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। আইসিইউতেও শিশুদের শয্যা সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। গত আড়াই মাসে ৫৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যারা কোনো আইসিইউ সুবিধা পাননি। এ ছাড়া আইসিইউতে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেলেও শেষ পর্যন্ত বাঁচানো যায়নি আরও ৯টি শিশুকে। সব মিলিয়ে ৬২টি শিশুর প্রাণহানির এই পরিসংখ্যান শুধু রামেক হাসপাতালের।
অন্যদিকে, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত ১১ দিনে ১০৫ জন হাম আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়। এর মধ্যে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়াও রাজধানীতেও হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে এখন শয্যার চেয়ে রোগী বেশি। ভর্তি রোগীদের বড় অংশই শিশু; জায়গা না থাকায় অনেকে করিডোর ও বারান্দায় থেকেই চিকিৎসা নিচ্ছে।
রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ হাম রাজশাহী অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় ১৮ মার্চ রাজশাহী বিভাগের ১৫৩ রোগীর নমুনা পরীক্ষা করে ৪৪ জনের হাম পজিটিভ পাওয়া গেছে। আক্রান্তের হার প্রায় ২৯ শতাংশ। তার মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী ও পাবনায় সংক্রমণ বেশি হয়েছে।
গত ১ মার্চ থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত রাজশাহীতে ৮৪ জন হামের রোগীকে আইসিইউয়ে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে আইসিইউয়ে নেওয়ার পরও ৯ জন এবং আইসিইউর অপেক্ষায় থাকা তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। পাবনায় গতকাল সকাল পর্যন্ত হামে আক্রান্ত ২৬ শিশু ‘হাম ওয়ার্ডে’ চিকিৎসাধীন। তবে পাবনায় মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়নি। চাঁপাইনবাবগঞ্জে গত তিন মাসে চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল সকালে হাসপাতালে ভর্তি ছিল ৭০ শিশু।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালের শিশু ও নবজাতক বিভাগের কনসালট্যান্ট মাহফুজ রায়হান জানান, আজ (গতকাল) সকালে ৭০ শিশু হাম ওয়ার্ডে ভর্তি ছিল। বিকালে ছুটি দেওয়ার পর প্রায় ৫০ শিশু ছিল। তিন মাসে চারজন মারা গেছে। তাদের মধ্যে চলতি মাসেই দুজন মারা যায়। তিন মাস ধরে তারা আলাদা ওয়ার্ডে রেখে শিশুদের চিকিৎসা দিচ্ছেন।
রাজশাহী মেডিকেলে চিকিৎসাধীন হামে আক্রান্ত যে চার শিশুকে গত বৃহস্পতিবার আইসিইউয়ে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল, তাদের মধ্যে জহির ও হুমায়রা গত শুক্রবার সকালে মারা গেছে।
আরেক শিশু হিয়ার খোঁজ নিতে তার বাবা রিফাতকে ফোন করলে তিনি বলেন, ‘আর খোঁজ নিয়ে কী হবে ভাই, যার খোঁজ নেওয়া, সেই তো আর নাই।’ অন্য শিশু জান্নাতুল মাওয়ার বাবা হৃদয় গতকাল বিকালে বলেন, তার মেয়েকে আজ আইসিইউয়ে নেওয়া হয়েছে।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক হাবিবুর রহমান বলেন, তিনি পরিস্থিতি দেখতে পাবনায় গিয়েছিলেন। পাবনা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের অবস্থা বেশি খারাপ। পাবনা সদর হাসপাতালে আজ (গতকাল) ২৬ জন হামের রোগী ভর্তি ছিল। আলাদা ওয়ার্ডে রেখে তাদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। পাবনায় মৃত্যুর তথ্য তিনি দিতে পারেননি। ১৮ মার্চের পরের তথ্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, রোববার এ তথ্য দিতে পারবেন।
হাবিবুর রহমান আরও বলেন, বিভাগের সব জেলা সদর হাসপাতাল ও উপজেলা হাসপাতালগুলোয় তিনি আগেই নির্দেশনা দিয়েছেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও পাবনায় আক্রান্ত রোগীদের আলাদা করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। রাজশাহীর ব্যাপারে তিনি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
ময়মনসিংহ মেডিকেলে ১১ দিনে ভর্তি ১০৫, তিন শিশুর মৃত্যু : ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বাড়তে শুরু করেছে হাম আক্রান্ত রোগী। ময়মনসিংহ জেলা ছাড়াও আশপাশের জেলাগুলো থেকে হাম আক্রান্ত শিশুদের ভর্তি করা হচ্ছে হাসপাতালে। ছোঁয়াচে রোগ ‘হাম’-এর পরিস্থিতি সামলাতে গঠন করা হয়েছে মেডিকেল টিম, করা হয়েছে পৃথক কর্নার। গত ১১ দিনে হাসপাতালে ১০৫ জন হাম আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়। এর মধ্যে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চলতি মাসের মাঝামাঝি থেকে হাম আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। পরিস্থিতি সামলাতে ২৪ মার্চ হাম আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য তিনটি পৃথক মেডিকেল টিম গঠন করে হাসপাতাল প্রশাসন। হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের তিনটি পৃথক কক্ষ করা হয় হাম আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার জন্য। ‘হাম/মিজেলস কর্নার’ নামে ১০ শয্যাবিশিষ্ট কক্ষগুলোতে একটি মেডিকেল টিমের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা চলছে শিশুদের। তবে কক্ষগুলোতেও রোগী সংকুলান হচ্ছে না।
শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক আক্তারুজ্জামান জানান, হাসপাতাল প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী সাধারণ রোগী থেকে হাম আক্রান্ত রোগীদের আলাদা করে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। হাম আক্রান্ত রোগী সাধারণ রোগীদের মধ্যে আছে—এমন সংখ্যা কম। খোঁজ করে পেলে সেই রোগীকে নির্ধারিত স্থানে পাঠানো হয়। আপাতত তিনটি কক্ষে রোগীদের রাখা হচ্ছে এবং কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে, আর কী করা যায়।
তিনি বলেন, সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) লোকজন এই হাসপাতালে এসে নিয়মিত নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করছেন। কিন্তু কী কারণে হঠাৎ হাম আক্রান্ত বেড়ে গেল, তা বোঝা যাচ্ছে না। তবে শিশুদের টিকাদানে সমস্যা হওয়ার কারণে এমনটি হতে পারে। আক্রান্ত রোগী থেকে অন্যদের দূরে রাখতে হবে ও সাবধানে থাকতে হবে। এই রোগটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান জানান, হাম আক্রান্ত রোগী হঠাৎ বেড়েছে। আগে এ ধরনের রোগী এত বেশি দেখা যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, করোনা পরিস্থিতি ও ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে আন্দোলনের কারণে টিকাদান সঠিকভাবে না হওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সারা দেশেই হামের প্রকোপ বেড়েছে। টিকা সঠিকভাবে হলে হাসপাতালে রোগী দেখা যেত না।
তিনি বলেন, ‘আমরা তিনটি আলাদা কর্নার চালু করেছি, যাতে সাধারণ রোগীদের সংস্পর্শে না যায়। প্রকোপ ধীরে ধীরে কমে আসুক, আমরা সেটা চাই। ব্যাপকভাবে হলে আমাদের জায়গা না থাকলেও আইসোলেশনের জায়গাটি বাড়ানো হবে।’
মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালেও খালি নেই শয্যা : রাজধানীতে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে এখন শয্যার চেয়ে রোগী বেশি। ভর্তি রোগীদের বড় অংশই শিশু; জায়গা না থাকায় অনেকে করিডোর ও বারান্দায় থেকেই চিকিৎসা নিচ্ছে।
গত শুক্রবার বিকাল পর্যন্ত হাসপাতালে দেড় শতাধিক রোগী ভর্তি ছিলেন বলে জানিয়েছেন হাসপাতালটির আইসিইউতে দায়িত্বে থাকা সেবিকা মাহমুদা আক্তার। তিনি বলেন, “এখন হামের আউটব্রেক চলছে। হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগীর মধ্যে ১৩০ জনই হামের রোগী, বেশিরভাগই শিশু। ঈদের পর থেকে অনেক রোগী আসছেন। আমরা রোগী সামলাতে হিমশিম খাচ্ছি।”
হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলো এখন রোগীতে পূর্ণ। বেড না পেয়ে অনেক রোগীকে বারান্দা বা করিডোরে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেল, শুধু রোগীর সংখ্যা নয়, গুরুতর রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে।
গত শুক্রবার বিকালে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে দায়িত্বরত জুনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. তানজিনা জাহান বলেন, “হাম রোগী নিয়ে হিমশিম খাচ্ছি। হাম নিয়ে এক রোগী এসেছেন কিছুক্ষণ আগে, তার অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৫০ শতাংশ। তার জীবন বাঁচানোর সর্বাত্মক চেষ্টা করছি।”
কেকে/এলএ