মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: বিশ্বনেতাদের জলবায়ু সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর       কোনো রোগী যেন চিকিৎসার অভাবে দুর্ভোগে না পড়ে : সমাজকল্যাণমন্ত্রী      রাজধানীর টেকনিক্যাল মোড়ে ককটেল বিস্ফোরণ      হামে প্রাণ গেল আরও তিন শিশুর, মোট মৃত্যু ৬৮৬      একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      
খোলাকাগজ স্পেশাল
বর্ষার আগেই বজ্রপাত আতঙ্ক
শরিফ আহমেদ ইমন
প্রকাশ: রোববার, ২৯ মার্চ, ২০২৬, ১০:১৩ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

বাংলাদেশে বজ্রপাতে বছরে গড়ে প্রাণ হারান ৩০০ জন এবং সবচেয়ে বেশি বজ্রপাতপ্রবণ জেলা সুনামগঞ্জসহ সিলেটের চার জেলা ও নেত্রকোণা। এবারও ঝড়-বৃষ্টির মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই শুরু হয়েছে বজ্রপাত। প্রচণ্ড দাবদাহের পর বৃষ্টি প্রশান্তি না এনে বজ্রপাতের আতঙ্ক নিয়ে এসেছে। বৃষ্টি আর ঝড় হলেই বজ্রপাতে একাধিক মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে।

গতকাল শনিবার ঝিনাইদহের শৈলকূপা, নওগাঁর পত্নীতলা ও মাগুরার শ্রীপুরে পৃথক বজ্রপাতে ৪ কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। প্রতিবছর এত মৃত্যুর পরও বজ্রপাত প্রতিরোধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। অন্যদিকে, প্রকল্পের নামে অর্থের অপচয় হলেও বজ্রপাতে মৃত্যু ঠেকানো যাচ্ছে না।

বাংলাদেশে বজ্রপাতে যারা মারা যান, তাদের ৭০% কৃষক বা যারা খোলা মাঠে কাজ করেন। এ ছাড়া বাড়ি ফেরার পথে ১৪% এবং গোসল ও মাছ ধরার সময় ১৩% বজ্রপাতের ফলে মৃত্যু হয়েছে। ফিনল্যান্ডভিত্তিক বজ্রপাতবিষয়ক গবেষণা সংস্থা ভাইসালার তথ্য এটি।

বিশ্লেষকদের মতে, শহরে বেশির ভাগ ভবনে বজ্র নিরোধক দণ্ড থাকায় বজ্রপাতে মৃত্যু তেমন হয় না। কিন্তু গ্রামে তা না থাকা এবং বড় গাছপালা কমে গিয়ে খোলা মাঠের কারণে সেখানে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি। তাদের মতে, দেশের হাওড় এলাকায় বজ্রপাতে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। কারণ, সেখানকার বেশির ভাগ ফসলি জমিতে বড় কোনো গাছ নেই।

শৈলকূপা, নওগাঁ ও মাগুরায় বজ্রপাতে ৪ কৃষকের মৃত্যু : ঝিনাইদহের শৈলকূপা, নওগাঁর পত্নীতলা ও মাগুরায় পৃথক বজ্রপাতে ৪ কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় তিন উপজেলায় আহত হয়েছেন আরও অন্তত ৮ জন।

গতকাল শনিবার সকালে শৈলকূপার উমেদপুর ইউনিয়নের খড়িবাড়িয়া, পত্নীতলার শিহাড়া ইউনিয়নের তেপুকুরিয়া মাঠে এবং মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার ইছাপুরে এ ঘটনা ঘটে।

নিহতরা হলেন—খড়িবাড়িয়া গ্রামের প্রকাশ বিশ্বাসের ছেলে অপু বিশ্বাস (২২), লক্ষ্মীপুর গ্রামের সুশীল বিশ্বাসের ছেলে সমির বিশ্বাস (৪০), পত্নীতলার শীতল গ্রামের মৃত আয়নাল হকের ছেলে আশরাফ আলী (৩২) এবং মাগুরার সুরুজ মিয়া (৪০)।

এ ঘটনায় শৈলকূপায় আহত হয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক রঞ্জিত বিশ্বাসসহ দুইজন, আর পত্নীতলায় আহত হয়েছেন চারজন। বাকি দু’জন মাগুরাতে।

নিহত অপু বিশ্বাসের কাকা বিজয় কৃষ্ণ বিশ্বাস জানান, সকাল থেকে খড়িয়াবাড়িয়া মাঠে পেঁয়াজ তুলতে ব্যস্ত ছিলেন চাষিরা। ভাতিজা অপু এবং লক্ষ্মীপুর গ্রামের সমির একই মাঠে পেঁয়াজ তোলার কাজ করছিলেন। তিনি এক গাড়ি পেঁয়াজ নিয়ে বাড়িতে পৌঁছামাত্র শুনতে পান, তার ভাতিজাসহ বেশ কয়েকজন বজ্রপাতে আহত হয়েছেন। তাদের উদ্ধার করে শৈলকূপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসলে চিকিৎসকরা অপু বিশ্বাস ও সমির বিশ্বাসকে মৃত ঘোষণা করেন।

শৈলকূপা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রাশেদ আল মামুন বলেন, বজ্রপাতে মৃত অবস্থায় দুই ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। আহত রঞ্জিত বিশ্বাসকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

শৈলকূপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হুমায়ুন কবির মোল্যা জানান, শৈলকূপার খড়িবাড়িয়া মাঠে বজ্রপাতে দুই কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। এ সময় আহত হন আরও দুই ব্যক্তি। পত্নীতলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, মাঠে গম কাটতে গিয়ে বজ্রপাতে কৃষক আশরাফের মৃত্যু হয়েছে। আহত চারজন পার্শ্ববর্তী সাপাহার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আইনগত প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ নিহতদের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

শ্রীপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ শাহিন মিয়া জানান, সকালে ওই কৃষক মাঠে কাজ করছিলেন। এমন সময় বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে অন্যান্য কৃষকরা তাকে উদ্ধার করে শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

বছরে গড়ে ৩০০ প্রাণহানি, সবচেয়ে বেশি ৫ জেলায় : বাংলাদেশে বজ্রপাতে বছরে গড়ে প্রাণ হারান ৩০০ জন এবং সবচেয়ে বেশি বজ্রপাতপ্রবণ জেলা সুনামগঞ্জসহ সিলেটের চার জেলা ও নেত্রকোণা—এ তথ্য এসেছে এক আলোচনা সভায়। সাম্প্রতিক সময়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘রিজিওনাল ইন্টিগ্রেটেড মাল্টি হ্যাজার্ড আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম’ (রাইমস)-এর সহায়তায় বজ্রপাতবিষয়ক অগ্রিম সতর্কতা জানাচ্ছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ খান মো. গোলাম রাব্বানি বলেন, ‘সাধারণত কিউমুলোনিম্বাস নামে এক ধরনের বিশেষ মেঘের মধ্যকার অপেক্ষাকৃত ছোট জলের কণা এবং অপেক্ষাকৃত বড় জলের কণার সংঘর্ষের ফলে বজ্রপাত সংঘটিত হয়।’ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে গড়ে প্রায় ৩০০ জনের মৃত্যু হয়। বাংলাদেশের সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা ও সিলেটের অন্য জেলাগুলো সবচেয়ে বেশি বজ্রপাতপ্রবণ।

রাব্বানি বলেন, ‘বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব জেলাগুলোতে এপ্রিল ও মে মাসে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত সংঘটিত হয় এবং এর কারণে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুবরণ করেন কৃষকরা। আর এ ঘটনাগুলো সবচেয়ে বেশি ঘটে সকালে বা সন্ধ্যায়, যখন কৃষক মাঠে যান, কাজ করেন বা কাজ শেষে বাড়িতে ফেরেন। সচেতনতা, উচ্চ প্রযুক্তির পূর্বাভাস (নাউকাস্টিং, ফোরকাস্টিং) ব্যবস্থা, বজ্রপাত নিরোধকযুক্ত নিরাপদ ঘরবাড়ি ও আশ্রয়কেন্দ্র বজ্রপাতে মৃত্যু কমাতে পারে।’

বজ্রপাতে প্রাণহানি বাড়ার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘নাসার প্রকাশিত এক রিপোর্টে বাংলাদেশে বজ্রপাত বৃদ্ধির জন্য জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝড়ের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি কারণের কথা বলা হয়েছে। ভবিষ্যতে পৃথিবীর তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি বাড়লে বজ্রপাতের সংখ্যা ১০ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে।’

রাব্বানি বলেন, ‘একটি বজ্রপাতের সময় প্রায় ২৭ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা সৃষ্টি হতে পারে, যা সূর্যের পৃষ্ঠের তাপমাত্রার চেয়ে প্রায় পাঁচ গুণ। একটি সাধারণ বজ্রপাতে ৩০ কোটি ভোল্ট ও ৩০ হাজার অ্যাম্পিয়ার বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়, যেখানে সাধারণ বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত বিদ্যুৎ মাত্র ১২০ ভোল্ট ও ১৫ অ্যাম্পিয়ার।’

বজ্রপাতের ধর্ম হচ্ছে, মাটিতে আঘাত হানার আগে সবচেয়ে উঁচু যে জায়গাটি পায়, সেখানে গিয়ে পড়ে। বৃক্ষহীন হাওড় এলাকায় কৃষকের শরীরই মাটির চেয়ে উঁচু থাকে। তাই বজ্রপাতের সময় মাঠে বা খোলা জায়গায়, যেখানে উঁচু কোনো গাছ নেই বা বজ্র নিরোধক ব্যবস্থা নেই, সেখানে যারা থাকেন, তারা শিকার হন।

অন্যদিকে, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে হঠাৎ করেই বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এখন বৃষ্টি হলেই প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষক ও দিনমজুর মানুষের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। সময়ের ব্যবধানে মানুষের মৃত্যুর তালিকা দীর্ঘ হলেও এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ রোধে বাস্তব পদক্ষেপ তেমন নেই।

বজ্রপাত প্রতিরোধে ‘গচ্চা’ প্রকল্প : বজ্রপাত প্রতিরোধে কার্যকর কোনো প্রকল্প নিতে পারছে না দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। এরই মধ্যে তালগাছ রোপণ প্রকল্পে শত কোটি টাকা খরচ করেছে আগের সরকার। ওই প্রকল্প বাতিলের পর আবারও আরও একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় বসানো হবে বজ্রনিরোধক দণ্ড (লাইটনিং অ্যারেস্টার), বানানো হবে আশ্রয়কেন্দ্র। এসব প্রকল্পকে ‘পয়সা রোজগারের প্রকল্প’ বলে মন্তব্য করেছেন অনেকে।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বজ্রপাতে সারা দেশে প্রতিবছর আড়াই থেকে তিনশ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এর অন্তত ৯৩ শতাংশই গ্রামাঞ্চলে হয় এবং ৮৬ শতাংশের মৃত্যু হয় উন্মুক্ত স্থানে। সারা দেশে বজ্রপাতের যে ১৫টি ‘হটস্পট’ চিহ্নিত করা হয়েছে, তার মধ্যে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হবিগঞ্জ, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জের মতো জেলা রয়েছে; যেখানে বিস্তৃত ও উন্মুক্ত হাওরাঞ্চল রয়েছে। ফলে বজ্রপাতে এসব অঞ্চলে মৃত্যুর সংখ্যাও দেশের অন্য জেলার তুলনায় বেশি।

২০১৬ সালে বজ্রপাতকে ‘জাতীয় দুর্যোগ’ ঘোষণা করে সরকার। প্রতিবছর ১৩ অক্টোবর জাতীয় দুর্যোগ প্রশমন দিবস পালিত হয়। এবছর দিবসটির প্রতিপাদ্য, ‘আগামী প্রজন্মকে সক্ষম করি, দুর্যোগ সহনশীল ভবিষ্যৎ গড়ি’।

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  বরসরি   বজ্রপাত   আতঙ্ক  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close