মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      চীন পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
দেশজুড়ে
বিপজ্জনক ‘ডেথ ট্র্যাপ’ লাউয়াছড়ার নান্দনিক রেললাইন
মো. এহসানুল হক, মৌলভীবাজার
প্রকাশ: রোববার, ২৯ মার্চ, ২০২৬, ৫:৪৩ পিএম

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলায় চিরসবুজ লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া নান্দনিক রেলওয়ে লাইনটি এখন দর্শনার্থী ও পর্যটকদের জন্য বিপজ্জনক ডেথ ট্র্যাপ বা মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। ছবি তোলা ও কনটেন্ট তৈরির জন্য বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষেরা এই স্পটকে বেছে নিয়েছেন। ফলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রেলওয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে প্রতিনিয়ত ছবি, ভিডিও ও সেলফি তোলার উপচেপড়া ভিড় হিড়িক দেখা যায়।  

বিশেষ করে ঈদ পরবর্তী ছুটিতে লাউছাছড়া ঘুরতে যাওয়া পর্যটকদের প্রায় সকলেই এই রেললাইনে বসে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেন। বসে বা হাত ধরাধরি করে হেঁটে গল্পও করেন অনেকে। রেললাইনের উপরে এমন কর্মকান্ডের ফলে বাড়ছে ঝুঁকি। এমন বিপজ্জনক প্রবণতার কারণে এ রেললাইনে ইতোমধ্যে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটলেও সচেতনতা ফিরছে না দর্শনার্থীদের। উদ্যানের ভেতরে রেললাইনে সেলফি তোলার ক্রমবর্ধমান প্রবণতা জনমনে গুরুতর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। 

লাউয়াছড়া কর্তৃপক্ষ সুত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জের লাওয়াছড়া বন এলাকায় একটি লেভেল ক্রসিংয়ের কাছে সেলফি তোলার সময় ট্রেনের ইঞ্জিনের ধাক্কায় এক ছাত্র নিহত হন।  

সরজমিন দেখা গেছে, লাউয়াছড়ার ঘন গাছপালার কারণে রেললাইনের বাঁকগুলোতে দৃষ্টিসীমা কম থাকে। তাই, অনেক সময় ট্রেন খুব কাছে চলে এলেও পর্যটকরা তা সময়মতো টের পান না। 

রেলওয়ে কর্মকর্তাদের মতে, ট্রেন অনেক সময় উচ্চগতিতে চলে এবং বনের ভেতর ট্রেনের শব্দ সবসময় আগে থেকে বোঝা যায় না। 

সম্প্রতি এছাড়া চলন্ত ট্রেনের তীব্র বায়ুচাপের কারণে রেললাইনের খুব কাছে থাকা ব্যক্তিরা ভারসাম্য হারিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হতে পারেন। জীববৈচিত্র্যের দিক দিয়ে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান বাংলাদেশের সমৃদ্ধতম বনগুলোর একটি। মৌলভীবাজার জেলা সদর থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে কমলগঞ্জে প্রায় ১ হাজার ২৫০ হেক্টর এলাকাজুড়ে এই উদ্যান অবস্থিত। এ বন দুর্লভ উদ্ভিদ এবং প্রাণীর এক জীবন্ত সংগ্রহশালা। বনে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে নানা ধরনের বন্যপ্রাণী, পাখি এবং কীটপতঙ্গের শব্দ শোনা যায়। এই উদ্যানে ৪৬০ প্রজাতির দুর্লভ উদ্ভিদ ও প্রাণী রয়েছে। এর মধ্যে ১৬৭ প্রজাতির উদ্ভিদ, ৪ প্রজাতির উভয়চর, ৬ প্রজাতির সরীসৃপ, ২৪৬ প্রজাতির পাখি ও ২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী দেখা যায়। 

বিলুপ্তপ্রায় উল্লুকের জন্য এ বন বিখ্যাত। বনের মধ্যে কিছু সময় কাটালেই উল্লুকের ডাকাডাকি কানে আসবে। লাউয়াছড়া উদ্যানে পাখির মধ্যে সবুজ ঘুঘু, বন মোরগ, তুর্কি, বাজ, সাদা ভ্রু সাত ভায়লা, ঈগল, শকুন, হরিয়াল, কালো মাথা টিয়া, পেঁচা, ফিঙে, লেজকাটা টিয়া, কালো বাজ, হীরামন, বাদুড় প্রভৃতি উল্লেখ্যযোগ্য। বনের বিচিত্র পশুপাখির ডাক বানরের ভেংচি আর উল্লুকের ছোটাছুটি পর্যটকদের মনে আনন্দ দেয় প্রতিনিয়ত। দিন দিন এখানে পর্যটক, শিক্ষার্থী, গবেষক, পাখি বিজ্ঞানীর আনাগোনা থাকলেও শীত ও বসন্তের সময় সবচেয়ে বেশি লোকসমাগম হয়। প্রকৃতি ভ্রমণের জন্য রয়েছে তিনটি ট্রে ট্রেইল বা হাঁটা পথ। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের পাশেই রয়েছে মাগুরছড়া খাসিয়া পুঞ্জী। এ ছাড়া লাউয়াছড়া আরেকটি কারণে বিখ্যাত। 

১৯৫০ সালে মাইকেল অ্যান্ডারসন নির্দেশিত হলিউডের বিখ্যাত ছবি ‘অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেজ’র কিছু দৃশ্য ধারণ করা হয়েছিল লাউয়াছড়ার এই জাতীয় উদ্যানে। ১৯৯৬ সালে লাউয়াছড়া বনাঞ্চলকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এর গাছের কাণ্ডগুলো ডালপালাবিহীনভাবে বেশ উঁচু হয়ে ওঠে। এটি রেইন ফরেস্টগুলোর মধ্যে অন্যতম। দেশের ১৭টি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মধ্যে এটি প্রাচীনতম। 

নিসর্গ ও জীববৈচিত্র্যপূর্ণ এ বনাঞ্চলের সবুজের বুক চিরে চলে যাওয়া মনোরম রেললাইনটি প্রকৃতিপ্রেমী ও পর্যটকদের কাছে এটি দীর্ঘদিন ধরেই এক আকর্ষণীয় গন্তব্য। কিন্তু এই সৌন্দর্যের মাঝেই নীরবে তৈরি হয়েছে এক বিপজ্জনক বাস্তবতা। রেললাইনে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার প্রবণতা ইতোমধ্যে প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে। ঢাকা থেকে ঘুরতে আসা সাহেদ রানা খোলা কাগজকে বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, সবাই ছবি তুলছে আর ভিডিও বানাচ্ছে। আমিও বাদ পড়তে চাইনি। অনেক সময় অনলাইন কনটেন্টের আকাঙ্খা নিরাপত্তার চিন্তকে ছাপিয়ে যায়। 

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সাবিনা সুলতানা বলেন, ‘অনলাইনে লাইক ও ভিউয়ের জন্য অনেকেই এই ঝুঁকি নিতে বাধ্য হন। রেললাইনের ছবি-ভিডিও এতো সুন্দর যে ফটো না তুললে মনে হয় ভ্রমণটাই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।’

লাউয়াছড়া পুঞ্জির বাসিন্দা সাজু মারছিয়াং জানান, দুই বছর আগে রেলসেতুতে ছবি তুলতে গিয়ে নিহত এবং আহতের ঘটনা ঘটছে। 

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘পর্যটকরা লাইনম্যানের কথা শোনেন না। গত বছর এক ছাত্র মারা গেল, তবুও সচেতনতা নেই। কোনো ছবিই জীবনের চেয়ে বড় নয়-এটা সবার বোঝা উচিত।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল একটি স্থানীয় সমস্যা নয়; বরং এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক নেতিবাচক প্রবণতার অংশ। 

সমাজকর্মী মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন জায়গায় একই ধরনের ঘটনা ঘটছে। কয়েক সেকেন্ডের রোমাঞ্চ জীবননাশের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। 

‘একটি ছবির জন্য কি জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলা যায়? ঈ্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের অধিকার সবারই আছে, কিন্তু সেই উপভোগ যেন কখনোই জীবনের চেয়ে বড় না হয়ে ওঠে—এই বোধটাই এখন সবচেয়ে জরুরি।’

এ বিষয়টি নিয়ে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষও উদ্বিগ্ন। তাদের মতে, ট্রেন সবসময় পর্যাপ্ত শব্দ করে না, বিশেষ করে বনাঞ্চলে। এছাড়া দ্রু তগতির ট্রেনের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সৃষ্ট বায়ুচাপেও মানুষ ভারসাম্য হারাতে পারেন। 

শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার মো. শাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘ঝুঁকির মাত্রা আরও বাঁড়িয়ে দেয় লাউয়াছড়ার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য। ঘন বৃক্ষরাজি ও আঁকাবাঁকা পথের কারণে অনেক সময় দূর থেকে ট্রেন আসা দেখা যায় না। এছাড়া রেললাইনের ওপর দাঁড়িয়ে ছবি তোলা এখন অনেকের কাছে যেন স্বাভাবিক বিষয় হয়ে ওঠেছে।’

‘এ ধরনের ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; বরং এটি একটি উদ্বেগজনক প্রবণতার প্রতিফলন।’

সচেতন নাগরিক কমিটির শ্রীমঙ্গল উপজেলা সভাপতি মো. আলাউদ্দিন বলেন, ‘এমন দুর্ঘটনার পেছনে সচেতনতার অভাব, নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব রয়েছে।’

তিনি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকে সমন্বিতভাবে সচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান জানান। 

ট্যুরিস্ট পুলিশ শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ জোনের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কামরুল হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘লাউয়াছড়া উদ্যানে পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তায় ট্যুরিস্ট পুলিশসহ বন বিভাগের পক্ষ থেকে যথাযথ ব্যবস্থা রয়েছে। তবে রেললাইনে দাঁড়িয়েং ছবি ভিডিও বা সেলফি তোলার ক্ষেত্রে পর্যটক ও দর্শনার্থীদের আরো সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে।’

‘রেলওয়ে লাইনের ওপর ঝুঁকি নিয়ে ছবি তোলা বন্ধ করতে এবং দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ট্যুরিস্ট পুলিশসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো সবসময় সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।’

মৌলভীবাজার জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন জানান, পর্যটন মৌসুমে বিশেষ নজরদারি বাড়ানো হয়। এবারের ঈদুল ফিতরের ছুটিতেও ব্যতয় ঘটেনি। যাতে কেউ রেললাইনে ঝুঁকিপূর্ণভাবে ছবি তুলতে না পারে এদিকে প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগের নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।

কেকে/এমএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  বিপজ্জনক   ডেথ ট্র্যাপ   লাউয়াছড়ার নান্দনিক রেললাইন  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

দেশজুড়ে- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close