দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, ত্যাগী নেতাদের উপেক্ষা ও বিতর্কিতদের প্রাধান্য—এই তিন কারণে ঢাকার দুই সিটিতেই সাংগঠনিক ভিত দুর্বল হয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে দলের তৃণমূল থেকে। দীর্ঘদিন কারাভোগ ও রাজনৈতিক ত্যাগ স্বীকার করা নেতাদের মূল্যায়ন না করা, দায়িত্বশীল নেতাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগসহ বিভিন্ন কারণে ইতোমধ্যেই তৃণমূল ও সাধারণ ভোটারদের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ঢাকা মহানগরীর দুই সিটি করপোরেশনে মেয়র ও কমিশনার পদে জয় নিশ্চিত করা বিএনপির জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঢাকা বিএনপির একাধিক কাউন্সিলর প্রার্থী অভিযোগ করেছেন, দলের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে চলা সমন্বয়হীনতা ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ আসন হাতছাড়া হয়েছে। তাদের মতে, মাঠপর্যায়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে ঐক্যের অভাব, কেন্দ্রীয় দিকনির্দেশনার ঘাটতি এবং প্রার্থিতা নিয়ে বিভক্ত অবস্থান নির্বাচনী ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
প্রার্থীদের আশঙ্কা, একই ধরনের পরিস্থিতি আবারও তৈরি হচ্ছে আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে। এখনো পর্যন্ত সুস্পষ্ট কৌশল, সমন্বিত প্রচার পরিকল্পনা কিংবা প্রার্থী বাছাইয়ে দৃশ্যমান কোনো ঐক্য দেখা যাচ্ছে না। এতে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা বিভ্রান্ত ও হতাশ হয়ে পড়ছেন, যা নির্বাচনী মাঠে দলের অবস্থানকে দুর্বল করে দিতে পারে। তাদের মতে, দ্রুত কার্যকর সমন্বয় ও শক্ত নেতৃত্ব নিশ্চিত করা না গেলে ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া বিএনপির জন্য কঠিন হয়ে উঠবে।
এমন প্রেক্ষাপটে ঢাকা উত্তর-দক্ষিণের মেয়রসহ অধিকাংশ কাউন্সিলর পদে জয় ছিনিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নেমেছে জামায়াত। তারা ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ উভয় সিটিতেই মেয়রসহ অধিকাংশ ওয়ার্ডে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে চায়। দলটি ইতোমধ্যে নির্বাচনী প্রস্তুতিতে অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পোস্টার, ব্যানার ও বিলবোর্ডের মাধ্যমে তাদের সম্ভাব্য প্রার্থীরা প্রচারণা চালাচ্ছেন। পাশাপাশি ঘরোয়া বৈঠক, গণসংযোগ ও ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছেন তারা। একাধিক ওয়ার্ডে কমিশনার প্রার্থীরাও সক্রিয় হয়ে উঠেছেন, যা মাঠপর্যায়ে তাদের অবস্থানকে শক্তিশালী করছে।
আগাম প্রচারণা, সংগঠিত কর্মীবাহিনী এবং পরিকল্পিত কৌশল তাদের এগিয়ে রাখছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, পরিস্থিতি সামাল দিতে বিএনপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব গড়ে তোলা, যেখানে দক্ষ, পরিচ্ছন্ন ও জনগ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদেরই অগ্রাধিকার দিতে হবে। একদিকে প্রতিপক্ষের আগাম প্রস্তুতি, অন্যদিকে নিজেদের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা—এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় করতে না পারলে নির্বাচনে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে দলটিকে।
স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা বলছেন, গত ১৭ বছরে যারা মামলা-হামলা, জেল-জুলুম সহ্য করে দলীয় কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন, তাদের অনেককে এখন বিভিন্ন অজুহাতে মূলধারা থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ‘ত্যাগী নেতাদের নানা ট্যাগ দিয়ে দূরে রাখা হচ্ছে’—এমন অভিযোগ এখন তৃণমূল নেতাকর্মীদের। ফলে একদিকে যেমন কর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে নির্বাচনী মাঠে সক্রিয়তা কমে যাচ্ছে।
দুই সিটির একাধিক নেতাকর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যারা কঠিন সময়ে মাঠে ছিল, এখন তাদের গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। বরং নতুন করে আসা বা বিতর্কিতদের কমিটিতে জায়গা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তাদের মতে, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে সংগঠন আরও দুর্বল হবে এবং নির্বাচনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এদিকে ঢাকা উত্তরের মেয়র ও কমিশনার পদে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো ঘোষণা না আসায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নির্বাচনের আগে দীর্ঘসময় ধরে প্রার্থী ঝুলে থাকা দলের জন্য কৌশলগতভাবে ক্ষতিকর। এতে প্রতিপক্ষ এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায় এবং কর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপির প্রতি তাদের আগ্রহ থাকলেও কিছু বিষয়ে অসন্তোষ রয়েছে। বিশেষ করে চাঁদাবাজি এবং সিন্ডিকেট-সংক্রান্ত অভিযোগ সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে। যদিও দলীয়ভাবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করা হচ্ছে, তবে বাস্তবে এর প্রভাব ভোটারদের মনোভাবকে প্রভাবিত করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
একজন ব্যবসায়ী ভোটার বলেন, ‘আমরা পরিবর্তন চাই, কিন্তু সেই পরিবর্তন হতে হবে পরিষ্কার নেতৃত্বের মাধ্যমে। যদি আবার চাঁদাবাজি বা সিন্ডিকেট তৈরি হয়, তাহলে মানুষ সরে যাবে।’ একই ধরনের মত দিয়েছেন আরও কয়েকজন ভোটার, যারা চান স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিএনপি যদি তৃণমূলের ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে অন্যদের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ায়, তাহলে সেটি উল্টো ফল দিতে পারে। তারা জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বলেন, যেখানে অনেক ক্ষেত্রে দলীয় ত্যাগীদের উপেক্ষা করে নতুন সমর্থকদের ওপর নির্ভর করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রত্যাশিত ফল আসেনি। বাংলাদেশের ভোট রাজনীতিতে সংগঠনের শক্তি এবং তৃণমূলের নিবেদিত কর্মীরাই মূল চালিকাশক্তি। তাদের উপেক্ষা করলে নির্বাচনে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।
তৃণমূল নেতাদের মতে, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পেশিশক্তি বা ভয়ভীতি দেখিয়ে রাজনীতি করার সুযোগ কমে এসেছে। এখন দরকার শিক্ষিত, মার্জিত এবং দক্ষ নেতৃত্ব, যারা জনগণের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে পারবেন।
একজন যুব নেতা বলেন, ‘এখন আর আগের মতো রাজনীতি চলে না। মানুষ সচেতন হয়েছে। তারা ভালো মানুষ, শিক্ষিত মানুষ এবং ভদ্র আচরণের নেতাকে চায়।’ তিনি বলেন, বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে—দলের অভ্যন্তরীণ সংকট কাটিয়ে ওঠা এবং দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব কাঠামো দাঁড় করানো। বিশেষ করে মেয়র পদে এমন একজন প্রার্থী দিতে হবে, যিনি একইসঙ্গে তৃণমূলের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং সাধারণ ভোটারদের কাছেও বিশ্বাসযোগ্য।
কমিশনার প্রার্থীরা বলছেন, সময় এখনো ফুরিয়ে যায়নি। তবে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধ করা, ত্যাগীদের মূল্যায়ন এবং বিতর্কিতদের দূরে রাখতে পারলে বিএনপি ফের শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে।
কেকে/এলএ