মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলাকাগজ স্পেশাল
অন্তর্বর্তী সরকারের গাফিলতি মৃত্যুঝুঁকিতে লাখো শিশু
প্রণব আচার্য্য
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ, ২০২৬, ১০:১৯ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

সম্প্রতি রাজধানী ঢাকাসহ বেশ কিছু জেলায় হুট করেই শিশুদের মধ্যে হামে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেড়ে গেছে। এমনকি হামে আক্রান্ত হয়ে সারা দেশে শিশু মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে, যা অভিভাবকসহ স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের চিন্তায় ফেলেছে। শিশুদের মধ্যে অতি সংক্রমণপ্রবণ এই রোগের বিস্তারের কারণ হিসেবে টিকা কার্যক্রমের অবহেলা উঠে এসেছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছিল এ কার্যক্রম। পরবর্তিতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এ সংকট কাটাতে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শিশুদের মধ্যে টিকাদানের হার আশঙ্কাজনক হারে কমে যায়, যার ফলে ঝুঁকিতে পড়েছে শিশুস্বাস্থ্য।

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) তথ্য বলছে, বিগত কয়েক বছর ধরে দেশে শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী হচ্ছিল। ২০২৪ সালে এর হার ছিল ৮৬.৬ শতাংশ। এর আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৩ সালে টিকাদানের হার ছিল ৯৩.৬ শতাংশ, ২০২২ সালে ছিল শতভাগ। এর আগের বছরগুলোতেও তা নব্বই শতাংশের আশপাশে ছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময়, ২০২৫ সালে তা নেমে আসে ৫৯.৬ শতাংশে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, সাধারণত সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় ৯–১৫ বছর বয়সী শিশুদের হামের দুটি টিকা দেওয়া হলেও, এর অতিরিক্ত হিসেবে প্রতি চার বছর পরপর হামের টিকা দেওয়ার যে বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া হয়, ২০২৪ সালে তা হয়নি। তিনি বলেন, “২০২০ সালে করোনা, ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন কারণে হামের টিকাদানের বিশেষ ক্যাম্পেইন হয়নি এবং পরবর্তীতেও তা চালু হয়নি।”

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্বাস্থ্য উপদেষ্টা ছিলেন নূরজাহান বেগম। স্বাস্থ্য খাত নিয়ে তার কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না; তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং ড. ইউনূসের গ্রামীণ ব্যাংকের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এমন একজন ব্যক্তিকে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা করা তৎকালীন সরকারের দায়িত্বহীনতারই প্রমাণ। এর ফলে এ খাত গত দেড় বছর অবহেলিত ছিল।

ত্রৈমাসিক জার্নাল ‘সর্বজনকথা’র নির্বাহী সম্পাদক এবং পরিবেশ ও উন্নয়ন অর্থনীতি বিষয়ক লেখক কল্লোল মোস্তফা বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের সময়, ২০২৫ সালে ১২ মাস বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়ার হার নেমেছিল ৫৯.৬ শতাংশে। এর মধ্যে হামের টিকাও (গজ) রয়েছে। এরই খেসারত হিসেবে আজকে হামে আক্রান্ত হয়ে শিশুরা মারা যাচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, “টিকা না দেওয়ার কারণে হামে আক্রান্ত হয়ে শিশু মৃত্যুর দায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যারা দায়িত্বে ছিলেন তাদের নিতে হবে।”

টিকাদান কর্মসূচিতে স্থবিরতার কারণ হিসেবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগে টিকা কেনা হতো স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাতের কর্মসূচি (এইচপিএনএসপি) থাকা অপারেশন প্ল্যানের (ওপি) মাধ্যমে। ওপির লাইন ডিরেক্টর তুলনামূলকভাবে সময়ে টিকা কিনতে পারতেন ইউনিসেফ ও গ্যাভির সহায়তায়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়, ২০২৫ সালের আগস্টে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পূর্ণ প্রস্তুতি ছাড়াই এইচপিএনএসপি তথা ওপি ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়। এর পর থেকে নতুন প্রকল্প-দলির তৈরি, প্রকল্প অনুমোদন, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ, অর্থ ছাড়—সবকিছুতে বিলম্ব হচ্ছে।

প্রবাসী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে হামের প্রকোপে ৪১ শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে বলে জানা নেই। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়, ২০২৫ সালের আগস্টে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পূর্ণ প্রস্তুতি ছাড়াই এইচপিএনএসপি তথা ওপি-ব্যবস্থা বাতিল করার কারণে দেশে হামসহ আরও ৮–১০টি রোগের টিকার সংকট সৃষ্টি হয়েছে। তিনি আরও লিখেছেন, “নূরজাহান বেগম স্বাস্থ্য উপদেষ্টা হিসেবে কী কী কাজ করেছেন, সেসবের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করতে হবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে।” এ সময় তিনি প্রশ্ন তোলেন, “গ্রামীণ ব্যাংকের সাবেক ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক নূরজাহান বেগমকে ঠিক কোন যোগ্যতায় স্বাস্থ্য উপদেষ্টার পদে বসিয়েছিলেন ড. ইউনূস?”

দেশে সব টিকা পায়নি ৪ লাখ শিশু: উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সত্ত্বেও প্রায় ৪ লাখ শিশু ঠিকমতো সব টিকা পায়নি। একেবারেই টিকা পায়নি ৭০ হাজার (১.৫ শতাংশ) শিশু। সম্প্রতি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ। এতে বলা হয়, দেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সত্ত্বেও ৪ লাখ শিশু ঠিকমতো সব টিকা পায়নি এবং ৭০ হাজার (১.৫ শতাংশ) শিশু একেবারেই টিকা পায়নি। শহর অঞ্চলগুলোতে টিকা না পাওয়ার হার বেশি। মাত্র ৭৯ শতাংশ পুরোপুরি টিকা পেয়েছে, ২.৪ শতাংশ এক ডোজও পায়নি, এবং ৯.৮ শতাংশ টিকার সব ডোজ ঠিকমতো পায়নি; সেই তুলনায় গ্রামাঞ্চলগুলোতে ৮৫ শতাংশ শিশু টিকার সব ডোজ পেয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, প্রতিটি শিশুকে টিকা প্রদান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। একেবারেই টিকা না পাওয়া ৭০ হাজার এবং টিকার সব ডোজ ঠিকমতো না পাওয়া ৪ লাখ শিশুর কাছে পৌঁছানো জরুরি, যেহেতু তারা স্বল্প ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে প্রতিরোধযোগ্য শিশু মৃত্যুর ক্ষেত্রে একটি বড় কারণ হয়ে থাকে। এসব শিশু প্রায়ই নানাবিধ জটিলতার মুখোমুখি হয়—দারিদ্র্য, শিক্ষার অভাব এবং স্বাস্থ্যসেবার সীমিত সুযোগ।

হামে রাজধানীর এক হাসপাতালেই ২২ শিশুর মৃত্যু: হঠাৎ হাম আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়া ও মৃত্যুর ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে দেশজুড়ে। দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে প্রতিদিনই ভর্তি করা হচ্ছে হাম আক্রান্তদের। এরই মধ্যে অন্তত ১০টি জেলায় হামের প্রকোপ দেখা দিয়েছে। রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ২২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে, সারা দেশে শুধু মার্চ মাসে কমপক্ষে ২১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

গতকাল সোমবার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. শ্রীবাস পাল ২২ শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, চলতি বছরে হাম আক্রান্ত ছয় শতাধিক রোগী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে, এর মধ্যে ২২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। চলতি মার্চ মাসেই আক্রান্ত পাঁচ শতাধিক ভর্তি হয়েছে। এই চিকিৎসক আরও জানান, বর্তমানে ভর্তি আছে শতাধিক। নিয়মিত টিকা না পাওয়াতেই প্রাদুর্ভাব বেড়েছে।

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  অন্তর্বর্তী সরকার   গাফিলতি   মৃত্যুঝুঁকি   লাখো শিশু  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close