ঢাকা ও দেশের বড় শহরগুলোতে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট চলছে। পেট্রোল ও ডিজেল পাম্পগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিতে হচ্ছে। অনেক স্থানে বিক্রয় সীমিত রাখা হচ্ছে, আবার কোথাও কোথাও হট্টগোলের মতো ঘটনা ঘটছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী টহল দিচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, ফুয়েল কার্ড ও পাস চালুর উদ্যোগ, ট্যাগ অফিসার নিয়োগসহ নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। দেশের জ্বালানি সরবরাহ পর্যাপ্ত এবং সংকট মূলত অতিরিক্ত ক্রয় ও অবৈধ মজুদের কারণে তৈরি হয়েছে, বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। এপ্রিল থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
গতকাল সোমবার সকাল থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন পাম্প ঘুরে দেখা গেছে, যানবাহনের দীর্ঘ সারি। ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে গেট বন্ধ রেখেছেন অনেক মালিক। যেসব পাম্পে তেল পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও প্রয়োজনীয় তেল না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন অনেক যানবাহন চালক।
দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষায় ধৈর্য হারিয়ে অনেক স্থানে গ্রাহকদের সাথে পাম্প কর্মীদের বাগবিতণ্ডা ও হাতাহাতির মতো ঘটনাও দেখা যাচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বেশ কিছু এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে টহল দিতে দেখা গেছে। জ্বালানি সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে গণপরিবহন ও পণ্যবাহী ট্রাকের ওপর। রাস্তায় বাসের সংখ্যা কমে যাওয়ায় অফিসগামী যাত্রী ও সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। ট্রাক চলাচল কমে যাওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
গ্রাহকদের অভিযোগ, তারা ৩–৪ ঘণ্টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে থাকছেন, তবুও পর্যাপ্ত পরিমাণ তেল পাচ্ছেন না। পাম্পগুলোতে একাধিক গাড়িকে মাত্র নির্দিষ্ট পরিমাণ (১৫ লিটার) তেল দেওয়া হচ্ছে এবং বাইকের জন্য ৩০০ টাকার ভিত্তিতে তেল দেওয়া হচ্ছে। অনেকেই দাবি করছেন, প্রয়োজনের তুলনায় চাহিদা বাড়ার ফলে বাজারে চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
পাম্প ম্যানেজাররা বলছেন, সাধারণ সময়ের তুলনায় অনেক বেশি মানুষ ট্যাংকি পূর্ণ করার জন্য আসছেন, যার ফলে তেলের চাহিদা অনেক গুণ বেড়ে গেছে। তারা ‘ট্যাগ অফিসার’ নিয়োগসহ অন্যান্য ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে চেষ্টা করছেন।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সরকার জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যক্রম জোরদার করেছে। প্রতিটি জেলায় ভিজিলেন্স টিম গঠন করা হয়েছে এবং আঞ্চলিক কার্যালয় ও ডিপোভিত্তিক মনিটরিং টিমও কার্যক্রম শুরু করেছে। অনিয়ম রোধে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জরিমানা আরোপ করা হচ্ছে। তেল বিতরণ আরও নিয়ন্ত্রিত করতে ফুয়েল কার্ড ও ফুয়েল পাস অ্যাপ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। পাম্পগুলোতে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সচেতনতা বৃদ্ধি ও গ্রাহকের তথ্য সরবরাহে লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে, মসজিদে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জনসচেতনতা বাড়াতে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সরকারের এ পদক্ষেপগুলোর মাধ্যমে সরবরাহ সংকট মোকাবিলা ও সাধারণ জনগণের ভোগান্তি কমানো লক্ষ্য রাখা হয়েছে।
গতকাল সোমবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে জ্বালানি তেলের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে ব্রিফিংয়ে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মনির চৌধুরী জানিয়েছেন, এপ্রিল থেকে জ্বালানি তেলের সরবরাহ সংকট কেটে যাবে। মার্চ থেকে কোনো ফিলিং স্টেশনের সরবরাহ কমানো হয়নি এবং বর্তমানে ১ লাখ ৩৩ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি মজুত আছে। এপ্রিলে আরও ১ লাখ ৫৪ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি আসবে।
তিনি বলেন, দেশে মোট চাহিদার ৬৩ শতাংশ ডিজেল চালিত পরিবহন, যেখানে কোনো সংকট নেই; পেট্রোল ও অকটেন চালিত পরিবহনে যে তীব্রতা দেখা যাচ্ছে, তা মূলত মনস্তাত্ত্বিক। দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ২ লাখ ৮ হাজার ৬৫০ মেট্রিক টন তেল উদ্ধার করা হয়েছে। মূল সরবরাহ ঠিক আছে, তবে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে।
সরকার পাম্পে তেল বিতরণ সহজ করার জন্য ফুয়েল পাসের উদ্যোগ নিচ্ছে। আন্তর্জাতিক স্তরে রাশিয়া ও ভারতের সঙ্গে সরবরাহ চুক্তি রয়েছে, পাশাপাশি ইন্দোনেশিয়া থেকে দুইটি কার্গো আসবে।
এ ছাড়া সোমবার জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানান, ইতোমধ্যে ৩ হাজার ১৬৮টি অভিযান পরিচালনা করে ১,০৫৩টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এতে ৭৫ লাখ টাকার অর্থদণ্ডসহ ১৬ জনকে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। অভিযানের মাধ্যমে ১ লাখ ৪০ হাজার লিটার ডিজেল, ২২ হাজার লিটার অকটেন, ৪৬ হাজার লিটার পেট্রোলসহ মোট ২ লাখ ৮ হাজার লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে।
ঢাকার তেজগাঁওয়ের ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ২০২৫ সালের মার্চ মাসে সেখানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫,৪০০ লিটার অকটেন বিক্রি হতো। অথচ ২০২৬ সালের মার্চে প্রতিদিন গড় বিক্রির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০,৬২০ লিটার, অর্থাৎ বিক্রি প্রায় ৯৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
তিনি জানান, ঢাকার আসাদ গেটে অবস্থিত সোনার বাংলা সার্ভিস স্টেশন, মহাখালীর গুলশান সার্ভিস স্টেশন, শাহবাগের মেঘনা মডেল পাম্প, নিকুঞ্জ মডেল সার্ভিস, নিকুঞ্জ ও মিরপুরের খালেক সার্ভিস স্টেশনের ২০২৫ এবং ২০২৬ সালে সরবরাহকৃত জ্বালানি তেলের তুলনামূলক পর্যালোচনায় একই চিত্র।
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, বাজারে জ্বালানির ঘাটতির চেয়ে জ্বালানি মজুতের মানসিকতাই এখন বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের সরবরাহ ও প্রস্তুতি পর্যাপ্ত থাকা সত্ত্বেও মানুষ যদি প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ক্রয় করে, কিংবা ড্রাম ও জারে ভরে অবৈধ মজুত শুরু করে, তবে স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হতে বাধ্য। সুতরাং আজকের এই পরিস্থিতিতে আমাদের প্রধান দায়িত্ব হলো জনগণের মধ্যে আস্থা ও সচেতনতা তৈরি করা।
তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই; বরং আমরা গত বছরের তুলনায় সরবরাহ আরও বৃদ্ধি করেছি। গত বছর এই সময়ে আমাদের যে পরিমাণ জ্বালানি তেল বিক্রি হয়েছিল, এ বছর আমরা তার চেয়েও বেশি সরবরাহ নিশ্চিত করেছি। তিনি জানান, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে ১৭ ফেব্রুয়ারি। সেদিন দেশে জ্বালানি তেলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ডিজেলের মজুদ ছিল ২ লাখ ৬ হাজার মেট্রিক টন। আজ ৩০ মার্চ দেশে ডিজেলের মোট মজুদ ২ লাখ ১৮ হাজার মেট্রিক টন। ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত ৪১ দিনে ডিজেল বিক্রি হয়েছে ৪ লাখ ৮২ হাজার মেট্রিক টন।
মন্ত্রী বলেন, এত বিপুল বিক্রয়ের পরও মজুত বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকার আগাম প্রস্তুতি, ধারাবাহিক আমদানি এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সরবরাহ ব্যবস্থাকে দৃঢ়ভাবে অব্যাহত রেখেছে। আমরা ২০২৫ সালের মার্চ মাসের চাহিদাকে ভিত্তি ধরে ২০২৬ সালের মার্চে জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে ১০–২৫ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত সরবরাহের ব্যবস্থা করেছি।
তিনি বলেন, জনমনের মধ্যে প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত ক্রয়ের প্রবণতা বিদ্যমান এবং ‘প্যানিক বাইয়িং’ পরিস্থিতিকে অনর্থকভাবে জটিল করে তুলতে পারে। দেখা গেছে, গত বছরের মার্চ মাসে ডিজেলের দৈনিক চাহিদা ছিল প্রায় ১২,০০০ মেট্রিক টন এবং অকটেন-পেট্রোলের চাহিদা ছিল ১,২০০–১,৪০০ মেট্রিক টনের মধ্যে। অথচ চলতি বছরের মার্চের ১–২৩ তারিখ পর্যন্ত অকটেন বিক্রয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৮,৯৩৯ মেট্রিক টন, অর্থাৎ গড়ে প্রায় ১,২৫৮ মেট্রিক টন প্রতিদিন।
মন্ত্রী আরও বলেন, সীমান্তবর্তী এলাকায় অসৎ ব্যবসায়ীদের পাচারে জড়িত থাকার খবর পাওয়া গেছে। সরকার ইতোমধ্যে তেলের অবৈধ মজুত ও সীমান্ত এলাকায় তেল পাচারের তথ্যদাতাকে উপযুক্ত পুরস্কার প্রদানের ঘোষণা দিয়েছে।
কেকে/এলএ