মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      চীন পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, তেল রপ্তানিতে সুখবর      এবার পাঁচ জেলায় বিজিবি মোতায়েন      
খোলাকাগজ স্পেশাল
বিআইবিএম-এর গবেষণা
ইসলামি ব্যাংকিংয়ে বাড়ছে ঝুঁকি
আলতাফ হোসেন
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ, ২০২৬, ১০:৩৭ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

দেশে ইসলামি ব্যাংকিং খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও সেই অনুপাতে শরিয়াহ গভর্নেন্স কাঠামোর উন্নতি হয়নি। কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা এবং স্বচ্ছতার অভাবের কারণে খাতটিতে নানা ধরনের ঝুঁকি ও অনিয়ম বাড়ছে। দেশে ইসলামি ব্যাংকিং খাতের টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে শক্তিশালী শরিয়াহ গভর্নেন্স কাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম), মালয়েশিয়ার ইনসাইফ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতায়, গতকাল সোমবার ঢাকার বিআইবিএম অডিটোরিয়ামে ‘বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংকগুলোতে শরিয়াহ গভর্নেন্স: একটি মূল্যায়ন’ শীর্ষক সেমিনারের বক্তারা এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইবিএম-এর সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. মহাব্বত হোসেন।

গবেষণা দলে অন্যদের মধ্যে ছিলেন মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ, রিসার্চ ফেলো, আইএসআরএ ইনস্টিটিউট, ইনসাইফ বিশ্ববিদ্যালয়; মো. আলমগীর, প্রফেসর ও পরিচালক (সার্টিফিকেশন), বিআইবিএম; এবং মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও হেড অব ইন্টারনাল শরিয়াহ অডিট, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড। তারা বর্তমান গভর্ন্যান্স প্র্যাকটিস মূল্যায়ন, চ্যালেঞ্জ শনাক্তকরণ এবং ইসলামী ব্যাংকগুলোর মান উন্নয়নের জন্য নীতি প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন।

গবেষণা বলা হয়, বৈশ্বিক ইসলামি অর্থনীতি খাতে ২০১৫ সালে যেখানে মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ২.১৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার, তা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫.৯৯ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৯ সালের মধ্যে এই পরিমাণ প্রায় ৯.৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাবে। এই খাতে ইসলামি ব্যাংকিংই প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে, যা মোট সম্পদের ৭২ শতাংশেরও বেশি দখল করে আছে।

এ ধরনের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ইসলামি ব্যাংকিং খাতের বিপুল সম্ভাবনা নির্দেশ করছে। ফলে বাংলাদেশকেও আন্তর্জাতিক অগ্রগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এগিয়ে যেতে হবে। বিশেষ করে শক্তিশালী শরিয়াহ গভর্নেন্স কাঠামো গড়ে তোলা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি।

গবেষণায় দেখা যায়, ইসলামী ব্যাংকগুলোর আনুষ্ঠানিক শরিয়াহ গভর্নেন্স কাঠামো থাকলেও তা অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর নয়। বিশেষ করে শরিয়াহ সুপারভাইজারি কমিটি (এসএসসি) অধিকাংশ সময় পরামর্শমূলক বা প্রশংসাপত্র প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। ব্যাংকের মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় তাদের কার্যকর প্রভাব খুবই সীমিত।

এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি ইসলামী ব্যাংকের তারল্য সংকট ও খেলাপি বিনিয়োগ (এনপিএল) বৃদ্ধির পেছনে দুর্বল শরিয়াহ গভর্নেন্স, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং পরিচালনা পর্ষদের অনিয়মকে দায়ী করা হয়েছে। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, সাতটি ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করতে হয়েছে। বিশেষ করে একটি প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠীর প্রভাব ও উচ্চ খেলাপি বিনিয়োগের কারণে এসব ব্যাংক তীব্র আর্থিক সংকটে পড়ে।

গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে শরিয়াহ সুপারভাইজারি কমিটি (এসএসসি) সদস্যদের ব্যাংকিং কার্যক্রম বা আধুনিক অর্থনীতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত কারিগরি জ্ঞান নেই। পাশাপাশি তারা প্রায়ই ব্যাংক ব্যবস্থাপনার প্রভাবমুক্ত থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন না, যা কার্যকর তদারকির পথে বড় বাধা।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন নির্দেশনা জারি করলেও, তার বাস্তবায়ন প্রায়ই কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে। শরিয়াহ পরিপালন যাচাইয়ের ক্ষেত্রে প্রকৃত লেনদেনের পরিবর্তে নথিপত্র যাচাইয়ের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, যা বাস্তব চিত্র প্রতিফলিত করে না।

এদিকে স্বচ্ছতা ও তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। অনেক ইসলামী ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদনে শরিয়াহ গভর্নেন্স সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় না। এসএসসি বৈঠক বা শরিয়াহ সচেতনতামূলক কার্যক্রম সম্পর্কেও অনেক ব্যাংক কোনো তথ্য প্রকাশ করে না।

গবেষণায় খাতটির উন্নয়নে কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে: রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও দক্ষ ব্যক্তিদের মাধ্যমে পরিচালনা পর্ষদ ও শরিয়াহ কমিটি গঠন, শরিয়াহ পরিপালনকে ব্যাংকের ‘থ্রি লাইনস অব ডিফেন্স’ মডেলে অন্তর্ভুক্ত করা, অভ্যন্তরীণ অডিটের পাশাপাশি নিরপেক্ষ তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে বহিরাগত শরিয়াহ অডিট চালু করা এবং ফিডুশিয়ারি রেটিং প্রবর্তন।

এছাড়া ব্যাংক কর্মকর্তা, গ্রাহক, পরিচালনা পর্ষদ ও এসএসসি সদস্যদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করে মালয়েশিয়া বা বাহরাইনের মতো দেশের আদলে শক্তিশালী ও কার্যকর শরিয়াহ গভর্নেন্স কাঠামো গড়ে তোলারও সুপারিশ করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানের শুরুতে বিআইবিএম-এর প্রফেসর ও পরিচালক (গবেষণা, উন্নয়ন ও পরামর্শ) ড. মো. শিহাব উদ্দিন খান বলেন, দেশে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে স্বচ্ছতা, বিশ্বাসযোগ্যতা ও জনগণের আস্থা ধরে রাখতে শক্তিশালী শরিয়াহ গভর্নেন্স অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

বিআইবিএম নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর নুরুন্নাহার বলেন, ইসলামি ব্যাংকিংয়ে শরিয়াহ গভর্নেন্স শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং প্রকৃত শরিয়াহ নীতি অনুসরণের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মালয়েশিয়ার ইনসাইফ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইএসআরএ ইনস্টিটিউটের পরিচালক প্রফেসর ড. সৈয়দ বুহেরাউয়া আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন এবং বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুসরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বিআইবিএম-এর মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, শরিয়াহ গভর্নেন্স কেবল প্রযুক্তিগত বিষয় নয়; এটি প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতি, পেশাদার দক্ষতা, আমানতকারীর সুরক্ষা, স্বচ্ছতা এবং নৈতিক জবাবদিহিতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দেশে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের ব্যাপক সম্প্রসারণের প্রেক্ষাপটে এ খাতে শক্তিশালী গভর্নেন্স নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

অনুষ্ঠানে প্যানেল আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন জনতা ব্যাংকের পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক আবদুল আওয়াল সরকার, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ, ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর নাবিল আহমাদ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ইসলামি ব্যাংকিং রেগুলেশনস অ্যান্ড পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ আনিসুর রহমান। তারা নিয়ন্ত্রক তদারকি, অভ্যন্তরীণ শরিয়াহ সম্মতি এবং কার্যকর গভর্নেন্স নিশ্চিত করার কৌশল নিয়ে মতামত দেন।

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  ইসলামি ব্যাংক   বাড়ছে ঝুঁকি  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close