মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলাকাগজ স্পেশাল
মহামারিতে রূপ নিচ্ছে হাম
প্রণব আচার্য্য
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল, ২০২৬, ৮:৪৪ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

দেশে হামে শিশু মৃত্যুর হার বেড়েই চলছে। এ ছাড়া হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালগুলোতে ভর্তি শিশুর সংখ্যাও বাড়ছে। শুধু মার্চ মাসে সারা দেশে হামে ৫৬টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর কারণ বা কেন হাম ছড়িয়ে পড়েছে, তা নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, দেশে হামের টিকার বাইরে থাকা শিশুর সংখ্যা অনেক। মৃত্যু ও সংক্রমণ যে হারে বাড়ছে, তাতে হাম মহামারিতে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, যেসব শিশু এখনো টিকার আওতায় আসেনি বা নির্ধারিত ডোজ সম্পন্ন করেনি, তাদের মধ্যেই সংক্রমণ ও জটিলতার ঝুঁকি বেশি দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হচ্ছে।

জনস্বাস্থ্যবিদ ও সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, জনস্বাস্থ্যবিদেরা ঝুঁকির কথা আগেই বলে আসছিলেন। কর্তৃপক্ষ কথা কানে নেয়নি, গাফিলতি দেখিয়েছে। তিনি আরও বলেন, যারা আক্রান্ত হয়েছে, যাদের অবস্থা জটিল, তাদের সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। দ্রুত টিকার ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে সংক্রমণ বাড়তে পারে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন বিলম্ব না করে সরকারের ত্বরিত কর্মসূচি হাতে নেওয়া উচিত। গুরুত্ব না দিলে হাম ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি আছে। একজন রোগী ১৬ থেকে ১৮ জনের মধ্যে হাম ছড়াতে পারে।

দেশে হামের টিকা শিশুদের সাধারণত দুইভাবে দেওয়া হয়। দেশের প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টিকাকেন্দ্রে নিয়মিত এই টিকা দেওয়া হয়। গ্রামাঞ্চলে সরকারের মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীরা এ টিকা দেন। সিটি করপোরেশন ও অন্যান্য শহর এলাকায় এ টিকা দেন সিটি করপোরেশনের টিকা কর্মীরা (ভ্যাকসিনেটর) এবং এনজিও কর্মীরা। 

এর বাইরে কয়েক বছর পরপর জাতীয় ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে দেশব্যাপী কয়েক দিনের মধ্যে সব শিশুকে টিকা দেওয়া হয়। নিয়মিত কর্মসূচিতে ৯ মাস বয়সি শিশুকে হামের টিকার প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সি শিশুকে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়। জাতীয় ক্যাম্পেইনের সময় ৯ মাস বয়স থেকে শুরু করে ১০ বছর বয়স পর্যন্ত সব শিশুকে টিকা দেওয়া হয়। দেশে সর্বশেষ জাতীয় ক্যাম্পেইন হয়েছিল ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে।

এদিকে আগামী রোববার থেকে হামের জরুরি টিকাদান (ইমার্জেন্সি ভ্যাকসিনেশন) কার্যক্রম শুরু করছে সরকার। দেশের যেসব উপজেলায় শিশুরা হামে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে, প্রথমে ওইসব উপজেলা থেকে এ টিকা কার্যক্রম শুরু করা হবে। 
বুধবার মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এ ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেন, টিকা ও সিরিঞ্জ সংগ্রহ করে আজ বৃহস্পতিবার এবং শুক্রবারের মধ্যে উপজেলা পর্যায়ে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। বিশেষভাবে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত (হামে) উপজেলায় আগামী দুই দিনের ভেতরে ভ্যাকসিন এবং সিরিঞ্জ গ্রাম অঞ্চলে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। আর রোববার সকাল থেকে টিকাদান শুরু করা হবে। 

সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আমরা ইমার্জেন্সি ভ্যাকসিনেশনের কাজ রোববার থেকে শুরু করব। আমরা ফিল্ড লেভেল স্টাফদের সব ছুটি বৃহস্পতিবার থেকে প্রত্যাহার করে নিলাম। কোনো ছুটি থাকবে না। ভ্যাকসিন যারা দেবে, তারা সবাই আন্ডার সুপারভিশন অব লোকাল অফিসার থাকবে এবং কাজ করবে।’

দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘যতটা ভয়াবহভাবে মিজেলস আমাদের আক্রমণ করেছে, আমরা তার চেয়ে দ্রুতগতিতে প্রতিহত করার চেষ্টা করেছি। কিছু ক্যাজুয়ালটি হয়েছে। বাট অবশ্যই বলব, এটা আমাদের অনেকটা সার্থকতা, আমরা এটা ম্যানেজ করেছি প্রপারলি। ওয়ার্ড ম্যানেজ করেছি বিভিন্ন জায়গায়। আমরা ত্বরিত গতিতে বেসরকারি খাত থেকে ভেন্টিলেটর কালেক্ট করেছি, যেটা খুবই দরকার ছিল। ভেন্টিলেটর কালেক্ট করে আমরা সব জায়গায় ভেন্টিলেটরের ব্যবস্থা করেছি, যাতে ভেন্টিলেশন দেওয়া যায়। বাচ্চারা যাতে অক্সিজেনের অভাবে মারা না যায়।’

টিকা সংগ্রহ ও বিতরণের আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গ্যাভির কাছে ২১ দশমিক ৯ মিলিয়ন হামের টিকার মজুত রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, এ টিকা সংগ্রহ করা হচ্ছে। এ ছাড়া টিকা কেনার জন্য ৬০১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। টিকা কেনা হলে গ্যাভির কাছ থেকে নেওয়া টিকা রিপ্লেস (প্রতিস্থাপন) করা হবে। আগে ৯ থেকে ১৫ মাস বয়সি শিশুরা এই টিকা পেলেও বিশেষ কর্মসূচির আওতায় ৬ মাস থেকে ১০ বছর পর্যন্ত শিশু-কিশোররা এ টিকা নিতে পারবে বলেও জানান মন্ত্রী।

এ সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ জিয়াউদ্দীন হায়দার। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সম্প্রতি হামের সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা ধীরে ধীরে একটি প্রাদুর্ভাবে রূপ নিচ্ছে। সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং হাম সদৃশ উপসর্গে শিশুমৃত্যুর খবর জনস্বাস্থ্য খাতে তাৎক্ষণিক ও সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।

এ পরিস্থিতি হঠাৎই তৈরি হয়নি উল্লেখ করে সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, বরং এটি গত কয়েক বছরের নীতি-ঘাটতি, বিলম্বিত সিদ্ধান্ত এবং দুর্বল বাস্তবায়নের একটি ফলাফল। বিশেষ করে টিকা সংগ্রহে ধীরগতি, সময়মতো ইমিউনাইজেশন ক্যাম্পেইন না করা এবং পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাব দেশের সামগ্রিক প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিয়েছে। পূর্ববর্তী সরকারের অদক্ষতা, অভিজ্ঞতার অভাব এবং পরিস্থিতির প্রয়োজনীতা উপলব্ধি করতে ব্যর্থতা এই সংকট তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

এক শয্যায় চিকিৎসা চলছে ৪ জনের : কক্সবাজার সদর হাসপাতালের হাম কর্নারের এক শয্যায় চিকিৎসা নিচ্ছে ৪ শিশু। প্রায় ৩০০ বর্গফুট আয়তনের ছোট্ট একটি ওয়ার্ডে দুই সারিতে গাদাগাদি করে বসানো আছে আটটি শয্যা। প্রতিটি শয্যায় তিন থেকে চারজন করে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া শিশুর চিকিৎসা চলছে। প্রত্যেক শিশুর সঙ্গে কয়েকজন করে পরিবারের সদস্যও থাকছেন। চিকিৎসক-নার্স এবং দর্শনার্থীর ভিড়ে ছোট শিশু ওয়ার্ডের হাম কর্নারের পরিস্থিতি নাজুক হয়ে উঠেছে।

গতকাল সকাল সাড়ে নয়টার দিকে হাম কর্নারে হামের লক্ষণ নিয়ে মারা গেছে মহেশখালীর সাত মাস বয়সী শিশু হিরামণি। আগের দিন মঙ্গলবার রাতে মারা যায় বেবী নামে ৯ মাস বয়সী রামুর দক্ষিণ মিঠাছড়ির আরেক শিশু। ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে দুই শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় ভর্তি থাকা রোগীদের স্বজনেরা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন।

রামেক হাসপাতালে হামের উপসর্গে শিশুর মৃত্যু : রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে হামের উপসর্গে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালটিতে এখন হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১১৭ শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে।
 
হাসপাতালের মুখপাত্র ও জরুরি বিভাগের ইনচার্জ ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস এ তথ্য জানিয়েছেন। 

তিনি জানান, মঙ্গলবার দুপুর থেকে বুধবার দুপুর পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই শিশুর সংক্রামক হাম রোগের উপসর্গ ছিল। এই সময়ের মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ২২ জন ভর্তি হয়েছে। আর সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে ১৪ শিশু। হাসপাতালটিতে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  মহামারি   রূপ   হাম  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close