ইরান যুদ্ধের এক মাস পেরিয়ে গেলেও কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েল। বরং যুদ্ধের ব্যর্থতায় হাতাশা বাড়ছে মার্কিন শিবিরে। যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমের খবর, ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন কোনোরকম চুক্তি ছাড়াই ইরান যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে যেতে চাচ্ছেন। একই সঙ্গে এ যুদ্ধে ন্যাটো মিত্রদের পাশে না পাওয়ায় বিশ্বের শক্তিশালী এ সামরিক জোট ত্যাগের বিষয়টিও ভাবছেন তিনি।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অব্যাহত বোমা হামলায় বিপুল ক্ষয় ক্ষতি হলেও পিছু হটছে না ইরান। উল্টো তেহরান বলছে, তারা আরও অন্তত ছয় মাস এই যুদ্ধ চালাতে প্রস্তুত আছে। এ ছাড়া বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে ইরান সরকার।
ইরান যুদ্ধে যোগ না দেওয়া প্রসঙ্গে ফ্রান্সের কনিষ্ঠ প্রতিরক্ষামন্ত্রী অ্যালিস রুফো বলেন, ‘ন্যাটো আসলে কী, তা আমি আপনাদের মনে করিয়ে দিতে চাই। এটি এমন একটি সামরিক জোট, যা ইউরো-আটলান্টিক অঞ্চলের নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। এটি হরমুজ প্রণালিতে অভিযান পরিচালনার জন্য তৈরি করা হয়নি। সেখানে এমন কিছু করা হবে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।’
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলা শুরু করে। তখন থেকে ইরান বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি প্রায় বন্ধ করে দেয়। তা খুলতে মিত্রদেশগুলোকে সেখানে যুদ্ধজাহাজ পাঠাতে আহ্বান জানিয়েছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু তারা সেই আহ্বানে সাড়া দেয়নি। ফলে ইউরোপকে আর নির্ভরযোগ্য প্রতিরক্ষা অংশীদার মনে করছে না যুক্তরাষ্ট্র।
সাড়া না দেওয়ায় ন্যাটো নিয়ে নানা কটাক্ষ করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ দেশটির অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তারা। গতকাল বুধবার যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় সামরিক জোটটি থেকে বের হয়ে যাওয়ার কথা তিনি গুরুত্ব দিয়ে ভাবছেন। এর আগে ন্যাটো মিত্রদের ‘ভীরু’ বলে বিদ্রুপ করেছিলেন তিনি।
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ন্যাটোকে ‘কাগুজে বাঘ’ বলে মন্তব্য করে বলেন, এই সামরিক প্রতিরক্ষা জোট থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে একবার প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর ইরান যুদ্ধ শেষে সেটাতে যোগদানের কথা ‘পুনর্বিবেচনা’ করার প্রশ্নই আসে না।
এই সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোর সদস্যপদ পুনর্বিবেচনা করবে কি না এ প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘ওহ হ্যাঁ, আমি বলব এটি পুনর্বিবেচনার ঊর্ধ্বে। আমি কখনো ন্যাটো দ্বারা প্রভাবিত হইনি। আমি সব সময় জানতাম ওরা একটা কাগুজে বাঘ। আর পুতিনও সেটা জানেন।’
এদিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, ইরান ও তার মিত্র ‘প্রতিরোধ ফ্রন্ট’ শেষ দফার হামলায় ১০০টিরও বেশি ভারী ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করেছে। পাশাপাশি অন্তত ২০০টি রকেট ছুড়েছে।
আইআরজিসির তথ্যমতে, এসব হামলায় ইসরায়েলের বিভিন্ন স্থান এবং পারস্য উপসাগরে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এর মধ্যে বাহরাইনে মার্কিন বাহিনীর একটি ঘাঁটি এবং কুয়েতের আল-আদিরি ঘাঁটিতে একটি মার্কিন হেলিকপ্টার ইউনিট রয়েছে। তাদের দাবি, সেখানে একটি হেলিকপ্টার ধ্বংস হয়েছে।
ইরানের সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবিতে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসি জানায়, এ ধরনের হামলা অব্যাহত থাকবে।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ পেন্টাগনে সংবাদ সম্মেলনে স্বীকার করেছেন, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডের জন্য কোনো হুমকি নয়।
যদি হুমকি না হয়, তবে কেন ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণ ব্যাখ্যায় হেগসেথ বলেন, ‘ওই অঞ্চলে নিজেদের সম্পদ ও মিত্রদের রক্ষা করতে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে ঝুঁকিতে ফেলেছে। এ কারণে প্রেসিডেন্ট এখন আশা করছেন, ইউরোপীয় মিত্ররাও পাল্টা পদক্ষেপ নেবে।’ হেগসেথ সাংবাদিকদের আরও বলেন, ‘(ইরানের) এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ড পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। এগুলো শুধু মিত্র দেশ ও অন্যান্য অঞ্চলে পৌঁছাতে সক্ষম। তবু, যখন একটু বাড়তি সহায়তা চাই, জবাবে আমরা পাই শুধু প্রশ্ন, বাধা আর দ্বিধা।’
ইসরায়েলের মধ্যাঞ্চলে ১১টি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান : ইসরায়েলের মধ্যাঞ্চল লক্ষ্য করে অন্তত ১১টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান, যা যুদ্ধের শুরুর দিকের দিনগুলোর পর থেকে চালানো বৃহত্তম হামলা। ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী এ তথ্য জানিয়েছে। ইসরায়েলের সেনাবাহিনীর তথ্যমতে, অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিহত করা হয়েছে। তবে ‘প্রোটোকল অনুযায়ী’ কিছু ক্ষেপণাস্ত্রকে জনশূন্য বা খোলা জায়গায় আঘাত হানতে দেওয়া হয়েছে। সেনাবাহিনী আরও জানায়, দুই দফায় এসব ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। প্রথম দফায় ছোড়া হয়েছে ১০টি। পরের দফায় একটি।
ইসরায়েলের জরুরি উদ্ধারকারী দলগুলো জানিয়েছে, তারা ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতের খবর খতিয়ে দেখছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
কেকে/ এমএস