মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলাকাগজ স্পেশাল
মৃতদের নামে কৃষিঋণ, বাড়িতে লাল নোটিস
মো. মোকাররম হোসাইন, কালাই (জয়পুরহাট)
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল, ২০২৬, ১০:৫৬ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

জয়পুরহাটের অগ্রণী ব্যাংকের কালাই শাখা থেকে কোনো ঋণ না নিয়েও শতাধিক কৃষক ঋণখেলাপির লাল নোটিস পেয়েছেন। হঠাৎ করেই ঋণখেলাপির এমন নোটিস পেয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা।

কালাই পৌরশহরের আঁওড়া মহল্লার মৃত আহাদ আলীর ছেলে নুর আলম মন্ডল বলেন- ব্যাংকেই যাইনি, অথচ ঋণখেলাপির লাল নোটিস এসেছে বাড়িতে। কোথায় ব্যাংক আছে তাও জানি না। মাঠে এক শতক জমিও নেই আমার, নাম-ঠিকানা ধরে জমির ভুয়া কাগজপত্র প্রস্তুত করে ব্যাংক থেকে ৯-১০ বছর আগে আমার নামে কৃষিঋণ তুলে নেওয়া হয়েছে। ২০১৬-২০১৭ সালে অনুমোদন করা হয়েছে সেই ঋণ। এখন পরিশোধের জন্য ব্যাংক থেকে লাল নোটিস পাঠিয়েছে। নোটিস পেয়ে হতভম্ব হয়ে পড়েছি। 

২০ বছর আগে মারা যাওয়া একাধীক ব্যক্তিসহ প্রায় অর্ধশতাধীক পরিবারকে এমন নোটিস দেওয়া হয়েছে। তাদের নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে ২০১৬-২০১৭ সালে বিভিন্ন পরিমাণে ব্যাংক থেকে ঋণ উত্তোলন করা হয়েছে। ভুক্তভোগী ব্যক্তিদের মধ্যে অধিকাংশের বাড়ি কালাই পৌরসভার আঁওড়া মহল্লা ও উপজেলার আহম্মেদাবাদ ইউনিয়নের হারুঞ্জা ও ঝামুটপুর গ্রামে।

ঋণবিধি অনুযায়ী ঋণ অনুমোদনের আগে ব্যাংকের একজন মাঠ কর্মকর্তা ঋণগ্রহীতা ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে তার কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করেন। সবকিছু ঠিক থাকলে তিনি শাখা ব্যবস্থাপকের কাছে ঋণের ব্যাপারে সুপারিশ করবেন। ব্যবস্থাপক আবার যাচাই-বাছাই করে ঋণগ্রহীতার উপস্থিতিতে স্বাক্ষর বা টিপসই নিয়ে ঋণ অনুমোদন করেন। কিন্তু এসবের কিছুই না করে ব্যবস্থাপক নিজে এলাকায় দালালদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এসব ভুক্তভোগীদের আইডি কার্ড ও ছবি সংগ্রহের পর জমির ভুয়া কাগজপত্র প্রস্তুত করে তাদের নামে প্রায় কোটি টাকারও বেশি ঋণ নিয়ে আত্মসাত করেছেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

ঋণ তুলে নেওয়ার ৮-৯ বছর পর ব্যাংক থেকে ঋণ পরিশোধের জন্য ভুক্তভোগীদের নামে লাল নোটিস দেওয়া হয়েছে। নোটিস পাওয়ার পর ভুক্তভোগী ও তাদের স্বজনরা অগ্রণী ব্যাংক কালাই শাখায় যোগাযোগ করেন। তারা এটিকে ‘লুটপাটের মহোৎসব’ উল্লেখ করে ব্যাপারটি দ্রুত সুরাহা করার দাবি জানিয়েছেন। 

ব্যাংকটির বর্তমান শাখা ব্যবস্থাপক সাব্বির আহমেদ গত ২০১৬-২০১৭ সালে কর্মরত শাখা ব্যবস্থাপক নূরুল ইসলাম ও দুইজন ফিল্ড সুপারভাইজারকে এসব ভুয়া ঋণের বিষয়ে তলব করার কথা জানিয়েছেন। এসব ঘটনা সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তৎকালীন শাখা ব্যবস্থাপকের অবসরকালীন সকল সুযোগ-সুবিধা বন্ধ রাখা হয়েছে বলেও জানান বর্তমান শাখা ব্যবস্থাপক। 

তৎকালীন ফিল্ড সুপারভাইজার দুইজন অন্য শাখায় কর্মরত আছেন। তাদের মধ্যে ফিল্ড সুপারভাইজার আব্দুস ছালাম জানান, তৎকালীন শাখা ব্যবস্থাপক নূরুল ইসলাম অফিস সময়ের পর জোরপূর্বক চাকরির ভয় দেখিয়ে এসব কাগজপত্রে স্বাক্ষর নিয়েছেন। চাকরি হারানোর ভয়ে আমরা ওই সময় এসব ভুয়া ঋণের কাগজপত্রে স্বাক্ষর করেছি। তবে কার নামে কত ঋণ নিয়েছেন তা আমাদের জানা নেই।

ব্যাংকের খেলাপি ঋণের সিট অনুযায়ী, কালাই পৌরসভার আঁওড়া মহল্লার ১৬ জন, আহম্মেদাদ ইউনিয়নের ঝামুটপুর গ্রামে ৩৮ জন, হারুঞ্জা গ্রামে ৩৩ জনের নামে ওই শাখা থেকে বিভিন্ন পরিমাণে কৃষিঋণ উত্তোলণ দেখানো হয়েছে। যাদের নামে নোটিস দেওয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে কালাই পৌরসভার আঁওড়া মহল্লার মৃত জনাব আলী মোল্ল্যার ছেলে মৃত আব্দুর রাজ্জাক হোসেন মোল্ল্যা ১৫ বছর আগে মারা গেছেন। অথচ তার নামে ২০১৬ সালে ৫০ হাজার টাকা ঋণ উত্তোলন করা হয়েছে। বর্তমানে সুদ আসলে ৯৯ হাজার ২০০ টাকা পরিশোধের নোটিস দেওয়া হয়েছে ভুক্তভোগী পরিবারকে।

মৃত আব্দুর রাজ্জাক মোল্ল্যার ছেলে সোহেল মোল্ল্যা বলেন, আমার বাবা মারা গেছে ১৫ বছর আগে। জীবিত থাকা অবস্থায় বাবার নামে কৃষিঋণ ছিল, বাবা জীবিত থাকা অবস্থায় সেই ঋণ পরিশোধও করেছেন। হঠাৎ করে বাবার নামে ঋণ পরিশোধের লাল নোটিস এসেছে। এটা অসম্ভব, এভাবেই দেশে লুটপাটের মহোৎসব চলছে। 

একই ধরনের অভিযোগ উপজেলার আহম্মেদাবাদ ইউনিয়নের হারুঞ্জা বাহিরপাড়া গ্রামের মৃত খলিলুর রহমানের ছেলে ফজলুর রহমানের। তার বাবাও ১৮ বছর আগে মৃত্যুবরণ করেছেন। অথচ ২০১৬ সালে আমন চাষের ওপর ৫০ হাজার টাকা ঋণ তুলে নেওয়া হয়েছে। যা সুদ-আসলে ৯৯ হাজার টাকা পরিশোধের নোটিস দেওয়া হয়েছে। নোটি পেয়ে পুরো পরিবার হতভম্ব।  

আঁওড়া মহল্লার ভ্যানচালক পুতুল চন্দ্র বলেন, বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের পুরো দায়িত্ব আমার কাঁধে পড়ে। সংসারে প্রচুর অভাব দেখা দেয়। একটি ভ্যান কিনতে টাকার জন্য কারও কাছে টাকা পাইনি। তখন ঋণের জন্য কালাই অগ্রণী ব্যাংকের দালাল একই গ্রামের বাসিন্দা আব্দুস সামাদের কাছে যাই। সে বলে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিলে ৫ হাজার টাকাসহ আইডি কার্ড ও ছবি দিতে হবে। তার কথাতে রাজি হয়ে ২ হাজার টাকা, আইডি কার্ডের ফটোকপি ও দুইকপি ছবি দেই তার কাছে। ১৫ দিন পর টাকা, আইডি কার্ড ও ছবি ফেরত দিয়ে বলে আপাতত ঋণ দেওয়া বন্ধ আছে। এখন দেখছি আমার নামে ২০১৭ সালে ৫০ হাজার টাকা ঋণ তোলা হয়েছে। সুদ-আসলে সেই টাকার পরিমাণ হয়েছে ৯৯ হাজার ২শ টাকা।  

আঁওড়া মহল্লার জাহানারা বেগম দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় বিভিন্ন রিকশা গ্যারেজে বুয়ার কাজ করেন। তার নামে কালাই শাখা থেকে ৩৫ হাজার ঋণ উত্তোলন করা হয়েছে। একই গ্রামের খাজাউল ইসলামের নামে ৪৫ হাজার টাকা, শরাফত আলীর নামে ৫০ হাজার টাকা ঋণ উত্তোলন দেখানো হয়েছে। এভাবে গ্রামের কমপক্ষে ১৬ জনের নামে বিভিন্ন পরিমাণে ঋণ উত্তোলন করা হয়েছে।

অগ্রণী ব্যাংক কালাই শাখার দালাল আঁওড়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুস সামাদ বলেন, এলাকার যে কোনো ব্যক্তির আইডি কার্ডের ফটোকপি ও ছবি দিলেই ম্যানেজার আমাকে দুই হাজার টাকা করে দিত। আইডি কার্ড ও ছবি নিয়ে তিনি কি করতেন তা আমার জানা নেই। আমি কমপক্ষে ৬০-৭০ জনের আইডি কার্ডের ফটোকপি ও ছবি দিয়েছি। এখন শুনছি তাদের নামে ঋণ তুলে নিয়েছে ম্যানেজার নূরুল ইসলাম। অভাবের কারণে আমি এই কাজ করেছি।

অগ্রণী ব্যাংকের কালাই শাখার বর্তমান ব্যবস্থাপক সাব্বির আহমেদ বলেন, ভুক্তভোগী পরিবারের বেশ কয়েকজন কার্যালয়ে এসে তাকে বিষয়টি অবগত করেছেন। এরপর খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, ঋণগুলো ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে অনুমোদন করা হয়েছে। সেই সময় যিনি ব্যবস্থাপক ছিলেন, তিনি অবসরে গেছেন। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তদন্ত করছেন। বেশ কয়েকজনের ঋণ জালিয়াতির বিষয় শনাক্তও করেছেন। 

তৎকালীন অগ্রণী ব্যাংক কালাই শাখার ব্যবস্থাপক নূরুল ইসলাম বলেন, চাকরি থেকে অবসরে আসছি, বয়স অনেক হয়েছে। এত আগের বিষয় কি আর আমার মনে আছে? বাদ দেন এসব কথা, নিউজটি বন্ধ রাখতে কি করতে হবে তাই বলেন। যা ঘটেছে তা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আর আমার বিষয়।  

অগ্রণী ব্যাংকের জয়পুরহাট আঞ্চলিক মহাব্যবস্থাপক মো. জুলফিকার আলী বলেন, বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি ইতোমধ্যে শনাক্ত করা হয়েছে। তদন্ত শেষ হলেই তার প্রাপ্ত পেনশনের অর্থ থেকে জালিয়াতি করে অন্যের নামে ঋণ নেওয়া অর্থ সমন্বয় করা হবে। মূলত এ কারণেই ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত সকল সুযোগ-সুবিধা বন্ধ রাখা হয়েছে।

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  কৃষিঋণ   লাল নোটিস  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close