মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বাঁশ-বেতের তৈরি হস্তশিল্প ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। পরিবেশ বান্ধব হওয়ায় দিন দিন এর চাহিদা বাড়ছে। কুটির শিল্পের উদ্যোক্তা কমলগঞ্জ উপজেলার বড়চেগ গ্রামের মো. আমির হোসেন সিরাজ পরিবেশবান্ধব বাঁশ-বেতের হস্তশিল্পকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন। প্রায় দুই দশকের নিরলস প্রচেষ্টায় তার প্রতিষ্ঠিত ‘সিরাজ কুটির শিল্প’ এখন দেশিয় বাজার ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও পরিচিতি পেয়েছে।
১৯৯৮ সালে পরিবারের ব্যবহারের জন্য নিজের হাতে বাঁশ-বেত দিয়ে কিছু আসবাব তৈরি করেন আমির হোসেন। স্থানীয়ভাবে সেগুলো প্রশংসা পেলে মানুষ তার কাছে আসবাব বানানোর অনুরোধ করতে শুরু করেন। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই নিজের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তিনি শিল্পটি আয়ত্ত করেন। পরবর্তী ২০০৩ সালে মাত্র ২০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে নিজ বাড়ির পাশে ছোট পরিসরে ‘সিরাজ কুটির শিল্প’ প্রতিষ্ঠা করেন।
শুরুর দিনগুলো ছিল চ্যালেঞ্জপূর্ণ। অনেকেই বাঁশের আসবাবের স্থায়িত্ব নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। ক্রেতারা দোকানে এসে দেখলেও কিনতে আগ্রহী হতেন না। তবে যেসব ক্রেতা পণ্য কিনেছিলেন, তাদের সন্তুষ্টিই ধীরে ধীরে নতুন বাজার তৈরি করে দেয়।
ছবি : প্রতিনিধি
২০১০ সালের পর ব্যবসায়ের বিস্তার দ্রুত বাড়তে শুরু করে। বর্তমানে খাট, আলমারি, সোফা, চেয়ার-টেবিল, আলনা, ড্রেসিং টেবিল, ল্যাম্পস্ট্যান্ড, ডাইনিং টেবিল, শোপিসসহ অর্ধশতাধিক ডিজাইনের পণ্য তৈরি হচ্ছে। শ্রীমঙ্গলসহ বিভিন্ন রিসোর্ট ও হোটেল সাজাতে তার তৈরি বাঁশের আসবাব ব্যবহৃত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে উদ্যোক্তা নিজেই গিয়ে সাজানোর কাজ সম্পন্ন করেন।
দেশের চট্টগ্রাম, মোংলা, শরীয়তপুর, বগুড়া, মেহেরপুর, পঞ্চগড় ও নীলফামারীসহ বিভিন্ন জেলায় নিয়মিত পণ্য সরবরাহ হচ্ছে। পাশাপাশি অনলাইনের মাধ্যমে প্রবাসীরাও অর্ডার দিচ্ছেন। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের কাতারে নিয়মিতভাবে তার তৈরি পণ্য রপ্তানি হচ্ছে।
শুধু আসবাব নয়, আধুনিক নকশার বাঁশের ঘর নির্মাণেও কাজ করছে তার প্রতিষ্ঠান। নিজের জন্য নির্মিত দৃষ্টিনন্দন দুইতলা বাঁশের বাড়িটি ইতোমধ্যে দর্শনার্থীদের আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
বর্তমানে তাঁর প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ও অনিয়মিত মিলিয়ে প্রায় ১৫ জন কারিগর কাজ করেন। স্থানীয় যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। একটি খাট তৈরিতে খরচ হয় ১৪-১৫ হাজার টাকা এবং একটি সোফায় প্রায় ১৩-১৪ হাজার টাকা ব্যয় হয়।
ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বরুয়া, মাকাল ও বেতুয়াসহ বিভিন্ন জাতের বাঁশ সংগ্রহ করা হয়। বাঁশ প্রথমে শুকানো, পরে ৭২ ঘণ্টা ওষুধমিশ্রিত পানিতে ভিজিয়ে রাখা এবং পুনরায় ১৫ দিন শুকানোর মাধ্যমে ব্যবহারযোগ্য করা হয়। প্রতিটি পণ্যের জন্য ১২ বছরের ওয়ারেন্টিও দেওয়া হয়।
প্রতিষ্ঠানটি থেকে বছরে গড়ে ৫০-৬০ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি হচ্ছে। মাসিক বিক্রি দেড় থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত পৌঁছায়।
আমির হোসেন সিরাজ বলেন, ‘সরকারি ও বেসরকারি সহায়তা পেলে এই শিল্প আরও সম্প্রসারণ সম্ভব এবং বেকারত্ব কমবে।’
মৌলভীবাজার জেলা ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) উপ-ব্যবস্থাপক মো. মাহামাদুল হাসান বলেন, ‘কমলগঞ্জের আমির হোসেন সিরাজের প্রতিষ্ঠানকে কুটির শিল্প হিসেবে বিসিক থেকে আমরা নিবন্ধন দিয়ে এবং তাকে নিবন্ধিত কুটির শিল্প উদ্যোক্তা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রয়োজন হলে সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা দেওয়া হবে।’