আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট প্রণয়নে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি সরকার। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, রাজস্ব ঘাটতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাব এসে পড়েছে দেশের অর্থনীতিতে। এর মধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় ও এনবিআর বাজেট প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ইতোমধ্যে আসন্ন বাজেট প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তুত করছে সরকার।
বাজেটে সাধারণ মানুষের স্বস্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে নতুন সরকার। বিশেষ করে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম মানুষের নাগালের মধ্যে রাখা যায়। একইসঙ্গে বিনিয়োগবান্ধব করনীতি প্রণয়নের দিকেও বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে কর কাঠামো সহজ ও সহায়ক করার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ে।
বাজেটে নতুন সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোকেও অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলা এবং ফ্যামিলি কার্ড, হেলথ কার্ড ও কৃষক কার্ডসহ বিভিন্ন জনবান্ধব কর্মসূচি বাস্তবায়ন। সব মিলিয়ে, জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ বাজেট প্রণয়নের চেষ্টা চলছে।
আসন্ন বাজেট প্রণয়নকে কেন্দ্র করে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক, সাশ্রয়ী এবং জনবান্ধব পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর জোর দিয়েছেন। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ বিবেচনায় তারা একটি বাস্তবসম্মত ও রক্ষণশীল বাজেট কাঠামো প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এবারের বাজেটে ব্যয় সংকোচন এবং সতর্ক পরিকল্পনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি প্রকল্পে অতিমূল্যায়ন রোধ এবং অপ্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে একটি বাস্তবসম্মত কাঠামো তৈরির মাধ্যমে সম্পদের অপচয় রোধ সম্ভব। পাশাপাশি, রাজস্ব ঘাটতি মোকাবিলায় করের আওতা বাড়ানো এবং এনবিআরের আধুনিকায়নের মাধ্যমে সংস্কার কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।
বাজেটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক সুরক্ষা। সাধারণ মানুষের স্বস্তি নিশ্চিত করতে সুদের হার স্থিতিশীল রাখা এবং ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষি সহায়তার মতো কর্মসূচিগুলো আরও বিস্তৃত করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। ৯ লাখ কোটি টাকার এই বিশাল বাজেটে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং ব্যয়ের ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে আগামী অর্থবছরের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, অত্যন্ত দুর্বল অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যে দায়িত্ব গ্রহণ করতে হয়েছে বর্তমান সরকারকে। তিনি একদিকে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে হবে, অন্যদিকে জনগণের কাছে দেওয়া নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের চাপও রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি নতুন করে অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করেছে। এর ফলে জ্বালানি আমদানি ব্যয় বেড়েছে এবং অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রীর মতে, অর্থনীতি চাঙ্গা করা না গেলে কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি করাও কঠিন হয়ে পড়বে। তাই রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হলে আগে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফিরিয়ে আনা জরুরি।
তিনি স্পষ্ট করেছেন, সরকার ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এসে বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধির দিকে এগোতে চায়। অর্থনীতিতে চাপ মোকাবিলায় টাকা ছাপানোর মতো স্বল্পমেয়াদি সমাধানের পথে সরকার হাঁটতে চায় না। বর্তমান পরিস্থিতিতে অর্থনীতিকে টেকসই পথে ফেরানোই সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবারের বাজেট হতে হবে বাস্তবমুখী, সময়োপযোগী এবং সংস্কারভিত্তিক। শুধু বড় আকারের বাজেট নয়, বরং কার্যকর বাস্তবায়নই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিতকরণ এবং সুশাসন জোরদার ছাড়া এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা কঠিন হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, এনবিআর রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রা ধারাবাহিকভাবে পূরণ না হওয়ায় বাজেট ঘাটতি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ঋণ ও বৈদেশিক সহায়তার ওপর আরও নির্ভরশীল হতে পারে।
অন্যদিকে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখাও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। খাদ্যপণ্যের দাম এখনো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও পণ্যমূল্যের ওঠানামা দেশের বাজারেও প্রভাব ফেলছে। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতেও রয়েছে বড় চাপ। জ্বালানি আমদানি ব্যাহত হওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। এ অবস্থায় সরকারকে ভর্তুকি বাড়ানো, বকেয়া পরিশোধ এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের মধ্যে সমন্বয় করতে হবে। এতে বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণের উচ্চহার অর্থনীতির জন্য আরেকটি ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সহায়তা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাও জোরালো হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি বলেছেন, দেশে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন ধরে উচ্চপর্যায়ে অবস্থান করছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় গুরুতর প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে স্বল্প আয়ের মানুষ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠী এ চাপের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকায় তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে, ফলে জীবনধারণই হয়ে উঠছে কঠিন।
তিনি আরও বলেন, এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কেবল মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই যথেষ্ট নয়; একইসঙ্গে অর্থনীতিতে বিনিয়োগের গতি বাড়ানো জরুরি। দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা না গেলে উৎপাদন খাত প্রসারিত হবে না। উৎপাদন বাড়াতে না পারলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও কাক্সিক্ষত হারে অর্জন সম্ভব হবে না।
মুজেরি মনে করেন, বিনিয়োগ ও উৎপাদনের এ স্থবিরতা সরাসরি কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলে বেকারত্ব বাড়বে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য বিঘ্নিত হবে। তাই বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি, নীতি সহায়তা বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়িক আস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি। আর্থিক খাত যদি সক্ষম না হয়, তাহলে বিনিয়োগ বা ঋণ প্রবাহ, বেসরকারি খাতে উৎপাদন, কোনোটিই সফলতা আসবে না।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস)-এর গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবীর বলেছেন, সরকার আগামী ১৮ মাসে নতুন করে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে তিনি মনে করেন, এ লক্ষ্যের অর্ধেক অর্জন করতেও বিনিয়োগের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে। শুধু বিনিয়োগ বাড়ালেই হবে না, তা হতে হবে কর্মসংস্থানবান্ধব যেখানে শিল্প ও সেবা খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে হলে টেকসইভাবে উচ্চ প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৮ শতাংশ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ৩ দশমিক ৬৯ শতাংশে অবস্থান করছে, যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক কম এবং উদ্বেগজনক।
রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন ড. কবীর। তিনি বলেন, কার্যকর রাজস্ব আহরণের জন্য যে ধরনের শক্তিশালী ও আধুনিক রাজস্ব বোর্ড প্রয়োজন, বাস্তবে তা এখনো গড়ে ওঠেনি। বরং রাজস্ব বোর্ডকে বিভক্ত করার পর প্রশাসনিক অস্থিরতা দেখা গেছে, কিন্তু এখনো পর্যন্ত পুনর্গঠন কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
ড. মাহফুজ কবীরের মতে, এ পরিস্থিতিতে একটি কার্যকর ও বাস্তবভিত্তিক বাজেট প্রণয়ন এবং তা সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সরকারের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
কেকে/ এমএস