মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলাকাগজ স্পেশাল
পাল্টাপাল্টি হামলায় যুদ্ধ বন্ধের আশা ক্ষীণ
খোলা কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩ এপ্রিল, ২০২৬, ৯:১২ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাষণের পর ইরান যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা ফিকে হয়ে এসেছে। জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প ইরানকে ‘পাথর যুগে’ পাঠিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। ট্রাম্পের ভাষণের আগে ধারণা করা হয়েছিল, চলমান বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় তিনি হয়তো ইতিবাচক কিছু বলবেন। যুদ্ধ বন্ধ না হোক, অন্তত তিনি এমন কিছু বলবেন, যা মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফেরাবে এবং সংকট নিরসনে উভয় পক্ষকে নমনীয় করবে। কিন্তু এমন কিছুই হয়নি। উল্টো তার ভাষণের পর দুই পক্ষেই উত্তেজনা বেড়েছে। 

ট্রাম্পের হুমকি ইরানের হুঁশিয়ারি : ভাষণে ট্রাম্প যুদ্ধের কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা না দিয়ে বরং হামলা আরও জোরদার করার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহ আমরা তাদের ওপর অত্যন্ত ভয়াবহ আঘাত হানব। আমরা তাদের পাথর যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাব, যেখানে তাদের থাকা উচিত।’ ট্রাম্প আরও বলেন, ইরানি নেতারা যদি ওয়াশিংটনের শর্তে রাজি না হন, তবে ইরানের জ্বালানি ও তেল অবকাঠামোতেও হামলা চালানো হতে পারে।
 
ট্রাম্পের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ইরানের সশস্ত্র বাহিনী যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে আরও ‘বিধ্বংসী ও ভয়াবহ’ হামলার সতর্কবার্তা দিয়েছে। ইরানের খাতাম আল-আম্বিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের মুখপাত্র ইব্রাহিম জুলফিকারি এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, শত্রুদের ‘অনুশোচনা ও আত্মসমর্পণ’ না হওয়া পর্যন্ত এই যুদ্ধ অব্যাহত থাকবে। 

দুই পক্ষের এমন বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, আপাতত যুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণ নেই। বরং যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হচ্ছে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে। 

হরমুজ প্রণালি নিয়ে অস্থিরতা, ৩৫ দেশের বৈঠক : ইরানে হামলার পর থেকে হরমুজ প্রণালি বন্ধ। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহের ওপর তেহরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। ট্রাম্প বলেছেন, যেসব দেশ এই জলপথের ওপর নির্ভরশীল, তারা যেন নিজেরাই এটি ‘দখল’ করে নেয় এবং পুনরায় চালুর ব্যবস্থা করে। তবে ইউরোপীয় দেশগুলো জানিয়েছে, কেবল যুদ্ধবিরতি হলেই তারা এই অঞ্চলে নিরাপত্তা দিতে এগিয়ে আসবে। 

এ সংকট নিরসনে গতকাল বৃহস্পতিবার ব্রিটেনের উদ্যোগে ৩৫টি দেশের একটি ভার্চুয়াল বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, ট্রাম্পের মন্তব্যের পর এখন নিজেরাই হরমুজ প্রণালির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। 

এদিকে ইরানের পার্লামেন্টে একটি বিল পর্যালোচনার কাজ চলছে। এর মাধ্যমে শত্রুভাবাপন্ন দেশের জাহাজ চলাচল বন্ধ এবং অন্যদের কাছ থেকে টোল আদায়ের বিষয়টি আইনি রূপ পাবে বলে জানিয়েছেন মুখপাত্র আব্বাস গুদারজি। এই বিল পাস হলে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হবে। 

জ্বালানি সংকট বৈশ্বিক অর্থনীতি : গত সপ্তাহে যখন ট্রাম্প ঘোষণা দিলেন, কয়েকটি দেশের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির আলোচনা শুরু হয়েছে, তখন তেলের দাম কমতে শুরু করেছিল, শেয়ারবাজার চাঙা হচ্ছিল। কিন্তু তিনি আবার যখন হামলার হুমকি দিলেন, তখন বিশ্ববাজারে বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রায় ৮ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৯ ডলারে পৌঁছে গেছে। আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক এবং আইইএ সতর্ক করে বলেছে, এই যুদ্ধের প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর অত্যন্ত ক্ষতিকর ও ‘অপ্রতিসম’ হবে। 

সমাধান এখনো অনিশ্চিত : রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেছেন, মার্কিন হামলায় ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ক্ষমতা ধ্বংস করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, বর্তমান ইরানি নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তবে তেহরানের একটি উচ্চপদস্থ সূত্র জানিয়েছে, তারা কোনো অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চায় না এবং কোনো মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমেও আলোচনা হচ্ছে না। 

অন্যদিকে, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স গত মঙ্গলবার পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন এবং জানিয়েছেন, ট্রাম্প নির্দিষ্ট কিছু শর্তে যুদ্ধবিরতিতে রাজি হতে পারেন। পাকিস্তান সরাসরি আলোচনার প্রস্তাব দিলেও এখন পর্যন্ত ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে সেখানে যোগ দেওয়ার কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি। 

এ থেকে বোঝা যায়, যুদ্ধবিরতি বা শান্তি আলোচনার বিষয়টি নিয়ে এখনো দুই পক্ষের মধ্যে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। কোনো পক্ষের বক্তব্যে কোনো মিল পাওয়া যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা ক্রমেই কমছে আর এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে বৈশ্বিক অর্থনীতি থেকে শুরু করে রাজনৈতিক অঙ্গন পর্যন্ত। 

তেলের দাম আকাশচুম্বী, স্বর্ণের বড় দরপতন : ইরানের বিরুদ্ধে হামলা অব্যাহত রাখার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনড় অবস্থানের পর বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে বড় ধরনের ধস নেমেছে। গত দুই সপ্তাহের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার স্বর্ণের দামে ব্যাপক দরপতন ঘটেছে। যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে তেলের দাম বৃদ্ধি ঘিরে মুদ্রাস্ফীতির উদ্বেগ এবং যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার কমার সম্ভাবনা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মাঝে সংশয় তৈরি হয়েছে।
 
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় বিকাল ৩টা ২৬ মিনিট পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট গোল্ডের দাম ২.৭ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৬২২ দশমিক ৫৯ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের গোল্ড ফিউচার ৩ দশমিক ৪ শতাংশ কমে ৪ হাজার ৬৪৯ ডলারে নেমেছে। দিনের শুরুতে ১৯ মার্চের পর সর্বোচ্চ দামে পৌঁছালেও ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যের পর ৪ শতাংশেরও বেশি দরপতন ঘটেছে মূল্যবান এই ধাতুর। তবে সব মিলিয়ে চলতি সপ্তাহে স্বর্ণের দাম প্রায় ৩ শতাংশ বৃদ্ধির পথে আছে। 

ট্রাম্পের ওপর ক্ষুব্ধ সৌদি, বন্ধুত্বে ফাটল : ইরান যুদ্ধ নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের খামখেয়ালি আচরণে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ক্রমশ বিরক্ত হয়ে উঠছে সৌদি আরব। বিশেষ করে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার হুমকি, এই যুদ্ধের খরচ উপসাগরীয় দেশগুলোকে বহন করতে হবে এমন ইঙ্গিত এবং সৌদি যুবরাজকে নিয়ে অশালীন মন্তব্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে রিয়াদে। 

থিংক-ট্যাংক চ্যাথাম হাউসের সৌদি বিশেষজ্ঞ এবং সহযোগী ফেলো নিল কুইলিয়ামের মতে, সৌদি আরব এখন হোয়াইট হাউজের ওপর ‘চরম হতাশ’। অথচ গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক জোরদার করতে প্রচুর বিনিয়োগ করেছিল রিয়াদ। 

সৌদি আরবের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে ট্রাম্পের কিছু পরামর্শ। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানের হাতে অবরুদ্ধ হরমুজ প্রণালি ফের উন্মুক্ত করার দায়িত্ব অন্য দেশগুলোর ওপর বর্তাবে এবং তিনি হয়তো কোনো চুক্তি ছাড়াই যুদ্ধ শেষ করে দিতে পারেন। 

কুইলিয়াম বলেন, ‘ট্রাম্পের একতরফা পদক্ষেপ এবং পরিণতির কথা চিন্তা না করার অনিচ্ছায় তারা ব্যাপক হতাশ। আর এই সবকিছুর ওপর বড় আঘাত ছিল এমবিএস (যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান) সম্পর্কে করা তার মন্তব্যগুলো।’ 

অপমানে বিদ্ধ সৌদি যুবরাজ : গত শুক্রবার মিয়ামিতে সৌদি আরব আয়োজিত এক বিনিয়োগ সম্মেলনে ভাষণ দেওয়ার সময় ট্রাম্প যুবরাজ সালমানকে নিয়ে কথা বলেন। শুরুতে তিনি সৌদি রাজপরিবারের এই সদস্যসহ অন্যান্য উপসাগরীয় নেতাদের প্রশংসা করেন এবং তাকে একজন ‘মহান বন্ধু,’ ‘বিজয়ী’ এবং ‘যোদ্ধা’ হিসেবে অভিহিত করেন। 

কিন্তু ২০ মিনিট পরেই ট্রাম্প বলেন, ‘তিনি (যুবরাজ সালমান) হয়তো ভাবেননি যে, তাকে আমার পশ্চাদ্দেশে চুমু খেতে হবে।’ ট্রাম্প যুবরাজের শীর্ষ সহযোগীদের সামনেই বলেন, ‘তিনি ভেবেছিলেন আমি হয়তো অন্য কোনো পরাজিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট হব, যার দেশ ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে। কিন্তু এখন তাকে আমার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতে হবে। তাকে বলে দেবেন, তিনি যেন আমার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেন।’ 

যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জাতিসংঘের : যুদ্ধ অবিলম্বে বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। তিনি নিউইয়র্কে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় এই আহ্বান জানান। 

তিনি বলেন, আমরা একটি বড় পরিসরের যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি, যে যুদ্ধ গোটা মধ্যপ্রাচ্যকেই গ্রাস করবে এবং বিশ্বজুড়ে নাটকীয় প্রভাব ফেলবে। 

গুতেরেস তেল এবং খাবারে বাড়তে থাকা দামের কথা উল্লেখ করে বলেন, মানুষ এরই মধ্যে বাড়তি দামের সঙ্গে সংগ্রাম করছে। হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ থাকলে বিশ্বের গরিব এবং ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের হাঁসফাস অবস্থা হবে। 

তিনি বিরোধ শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধানের আহ্বান জানিয়ে বলেন, বেসামরিক অবকাঠামো, পারমাণবিক স্থাপনাকে সম্মান দেখানো এবং সুরক্ষিত রাখা উচিত। 

গুতেরেস বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের কাছে আমার বার্তা স্পষ্ট : পরিস্থিতি এরই মধ্যে মানুষের দুর্ভোগ এবং বিপর্যয়কর অর্থনৈতিক পরিণতি দিকে যেতে বসেছে। যুদ্ধ বন্ধ করার এখনই সময়।

ইরানকেও প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর হামলা বন্ধের আহ্বান জানান তিনি।

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  পাল্টাপাল্টি হামলা   যুদ্ধ বন্ধ  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close