মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন তৈরি হওয়ায় বাংলাদেশের শিল্প ও রপ্তানি খাতে একযোগে চাপ বেড়েছে। জ্বালানি তেলের ঘাটতির কারণে দেশের শিল্পকারখানাগুলোর উৎপাদন গড়ে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়ায় নতুন রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ার প্রবণতাও স্পষ্ট হচ্ছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি সংকট এখন উৎপাদন থেকে সরবরাহ পুরো চেইনেই প্রভাব ফেলছে। চাহিদা অনুযায়ী তেল না পাওয়ায় অনেক ট্রাক চলাচল বন্ধ বা সীমিত হয়ে পড়েছে, ফলে পণ্য পরিবহনে বিলম্ব হচ্ছে। বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে জেনারেটরের ওপর নির্ভরতা বাড়লেও পর্যাপ্ত জ্বালানি না থাকায় উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এতে শিল্পকারখানাগুলোর সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, মাসিক চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি বরাদ্দ নিশ্চিত না হলে উৎপাদন আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাদের মতে, পরিকল্পনাহীনভাবে রেশনিং চালু করা হলে শিল্প খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং তার নেতিবাচক প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়বে।
যদিও বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুতের কোনো ঘাটতি নেই।
তিনি বলেন, গ্রীষ্মকালে সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে প্রাথমিক জ্বালানির ঘাটতি, সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, বিদ্যুৎকেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম এবং ঝড়-বৃষ্টির কারণে মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিতে পারে। এ সময় চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সবসময় সম্ভব নাও হতে পারে।
বৃহস্পতিবার সংসদে ঢাকা-১৮ আসনের সরকারি দলের সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এসব তথ্য জানান।
এ ছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রাথমিক জ্বালানির চাহিদা মোকাবিলায় জ্বালানি বহুমুখীকরণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান।
মন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ ব্যবহারে দক্ষতা বাড়াতে মনোনীত ভোক্তাদের স্থাপনায় জ্বালানি নিরীক্ষা কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। প্রথম ধাপে ময়মনসিংহ, ঘোড়াশাল ও নারায়ণগঞ্জে ৭৪টি প্রতিষ্ঠানে এ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে জ্বালানি নিরীক্ষা জোরদারের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ৪২ জন সনদপ্রাপ্ত জ্বালানি নিরীক্ষক এবং ১৭৮ জন সনদপ্রাপ্ত জ্বালানি ব্যবস্থাপক তৈরি করা হয়েছে। এ ধরনের দক্ষ জনবল তৈরির কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিমুখী শিল্পগুলোতেও সংকটের প্রভাব ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, বৈশ্বিক বাজারে অনিশ্চয়তার কারণে বিদেশি ক্রেতারা নতুন অর্ডার দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। অনেক ক্রেতা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং যুদ্ধ পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত বড় অর্ডার দিচ্ছেন না।
গতকাল বৃহস্পতিবার রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুয়ায়ী, দেশের রপ্তানি আয়ে ক্রমাবনতি মার্চ মাসেও অব্যাহত আছে। গত মাসে ১৮ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ কমে ৩ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৪ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছর ২০২৫-২৬ এর জুলাই থেকে মার্চ সময়ে মোট রপ্তানি আয় ৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ কমে ৩৫ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, যেখানে গত অর্থবছরের একই সময়ে এ আয় ছিল ৩৭ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার। এ নিয়ে টানা আট মাস রপ্তানি আয় নিম্নমুখী।
এদিকে দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাকশিল্পেও নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। এ খাতে রপ্তানি আয় ৫ দশমিক ৫১ শতাংশ কমে ২৮ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা গত বছর একই সময়ে ছিল ৩০ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার।
ইপিবি জানায়, চলতি অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় দেশের অধিকাংশ প্রধান রপ্তানি খাতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি লক্ষ করা গেছে। তবে হিমায়িত ও জীবিত মাছ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য এবং প্রকৌশল পণ্য খাত ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, যা সামগ্রিক রপ্তানি খাতে কিছুটা ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করেছে।
ইপিবি আরও উল্লেখ করেছে, সামগ্রিক রপ্তানি পরিস্থিতি বিভিন্ন বৈশ্বিক বাহ্যিক প্রভাবের কারণে চাপে রয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান সংশ্লিষ্ট ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি বাড়িয়ে দিয়েছে, যার ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মতো প্রধান রপ্তানি গন্তব্যগুলোতে ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে।
এ পরিস্থিতির ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে রপ্তানি আদেশ স্থগিত বা বাতিল করা হয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে জানায় সংস্থাটি।
বিজিএমইএর জনসংযোগ ও প্রচার কমিটির চেয়ারম্যান মাসুদ কবির বলেন, বর্তমান জ্বালানি সংকট দেশের সামগ্রিক উৎপাদন ও রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। যদিও এখনো পরিস্থিতি সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে, তবে প্রতিদিন সংকট যেভাবে গভীর হচ্ছে, তাতে শিগগিরই রপ্তানিতে বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
অন্যদিকে, জ্বালানি সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হলে রপ্তানি খাতের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থাও বড় চাপের মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, পরিস্থিতি সামাল দিতে জরুরি ভিত্তিতে জ্বালানি রেশনিং চালু করে শিল্প ও সেবা খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বর্তমানে যে পরিমাণ জ্বালানি মজুত রয়েছে এবং ভবিষ্যতে যা আসবে, তা পরিকল্পিতভাবে দীর্ঘসময় ধরে ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য অর্থনীতির প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতে যেসব খাতে জ্বালানির চাহিদা বেশি ও গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে অগ্রাধিকার দিয়ে সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
কেকে/ এমএস