মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলাকাগজ স্পেশাল
দেশে উৎপাদন হয় পেট্রোল-অকটেন
যুদ্ধের অজুহাতে সংকট তৈরি করছে অসাধুরা
সফিকুল ইসলাম সবুজ
প্রকাশ: শনিবার, ৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৯:৩৭ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মধ্যে বাইরের দেশ থেকে আমদানি করা হয় শুধু ডিজেল। আর পেট্রোল-অকটেন চাহিদার পুরোটাই উৎপাদন করা হয় দেশে। শুধু তাই নয়, দেশে জ্বালানি তেলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাহিদা ডিজেলের। কিন্তু অনেক পাম্পে ডিজেল থাকলেও এখন সারা দেশে যে হাহাকার এবং দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে তা পেট্রোল ও অকটেনের জন্য। ফলে চাহিদা পূরণ করতে হিমশিম অবস্থা তৈরি হয়েছে সিংহভাগ পেট্রোল পাম্পে। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বরাদ্দকৃত তেল ফুরিয়ে অনেক ফিলিং স্টেশন দীর্ঘসময় ধরে বন্ধ থাকতেও দেখা যাচ্ছে।

দেশে ডিজেলের চাহিদার প্রায় পুরোটাই আমদানি করা। অন্যদিকে দেশের নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া কনডেনসেট থেকে দৈনিক প্রায় সাড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার ব্যারেল পেট্রোল ও অকটেন উৎপাদন করছে। ফলে তেলের মজুত এবং উৎপাদন সক্ষমতা মিলিয়ে পেট্রোল-অকটেনের এমন সংকট হওয়ার কথা নয়। 

সিলেটের গ্যাসক্ষেত্রগুলোয় গ্যাসের সঙ্গে যে কনডেনসেট (গ্যাস উৎপাদনের সময় উপজাত হিসেবে পাওয়া তরল হাইড্রোকার্বন) পাওয়া যায়, সেটি প্রক্রিয়াজাত করে বাংলাদেশ পেট্রোল ও অকটেনের চাহিদার একটা বড় অংশ উৎপাদন করে। বছরে পেট্রোলের চাহিদা চার লাখ ৬২ হাজার টন ও অকটেনের চাহিদা চার লাখ ১৫ হাজার টন। বাংলাদেশে নিজস্ব উৎপাদন ও ক্রুড অয়েল থেকে ইস্টার্ন রিফাইনারি পরিশোধন করে পেট্রোল-অকটেন আমদানির প্রয়োজন হয় না।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে উৎপাদিত কনডেনসেট থেকে দুই লাখ টনেরও বেশি, অর্থাৎ মোট চাহিদার প্রায় অর্ধেক পেট্রোল উৎপাদন হয়েছে। এ ছাড়া অকটেনও হয়েছে মোট চাহিদার প্রায় চারভাগের একভাগ। এ বিবেচনায় বিশ্ববাজার থেকে তেল আমদানি পুরো বন্ধ হয়ে গেলেও বাংলাদেশে এ মুহূর্তে পেট্রোল-অকটেনের দিক থেকে একেবারে জ্বালানিশূন্য হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা নেই।

এরমধ্যে পেট্রোবাংলার কোম্পানি সিলেট গ্যাস ফিল্ডের দুটি প্ল্যান্টে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশীয় কনডেনসেট প্রক্রিয়াকরণ করে প্রায় এক লাখ ১৬ হাজার ৬৬২ টন পেট্রোল এবং ৫৫ হাজার ৩৩৯ টন অকটেন উৎপাদন করেছে।

বাংলাদেশের নিজস্ব কনডেনসেট থেকে পেট্রোল ও অকটেন উৎপাদন করে সরকারি কোম্পানি সিলেট গ্যাস ফিল্ডের দুটি প্ল্যান্ট এবং চারটি বেসরকারি রিফাইনারি। নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্র থেকে আসা কনডেনসেট থেকে সবচেয়ে বেশি পেট্রোল ও অকটেন, কেরোসিন ও ডিজেল এবং অল্প পরিমাণ এলপিজি উৎপাদন করে হবিগঞ্জ অবস্থিত সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের (এসজিএফএল) ফ্র্যাকশনেশন প্ল্যান্ট ও ক্যাটালাইটিক রিফর্মিং ইউনিট বা সিআরইউ।

হবিগঞ্জের প্ল্যান্টে বর্তমানে প্রতিদিন সাড়ে চার হাজার ব্যারেল কনডেনসেট বিভাজন করে ৬০০ ব্যারেলের (৭৪ টন) মতো অকটেন, তিন হাজার ৪৫০ ব্যারেল বা ৪২০ টন পেট্রোল, ১৫০ ব্যারেল বা ২০ টন ডিজেল ও ১০০ ব্যারেল বা ১৩ টন কেরোসিন এবং ১৭ ব্যারেল বা ১.৫ টন এলপিজি উৎপাদন হচ্ছে।

এসজিএফএল এর লিকুইড পেট্রোলিয়াম মার্কেটিং বিভাগের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী জীবন শান্তি সরকার জানান, এসজিএফএল এর প্ল্যান্ট দেশীয় কনডেনসেট থেকে দৈনিক চার হাজার ব্যারেলের বেশি পেট্রোল এবং অকটেন উৎপাদন করছে। এই তেল দেশের মোট পেট্রোলের চাহিদার ৩৩-৩৫ শতাংশ এবং অকটেনের চাহিদার ৭-৮ শতাংশ, কেরোসিনের চাহিদার ৭ শতাংশ এবং ডিজেলের চাহিদার ০.২ শতাংশ পূরণ করতে পারে।

সিলেট গ্যাসফিল্ডসের কনডেনসেট ফ্র্যাকশনেশন প্ল্যান্ট ছাড়াও চারটি বেসরকারি রিফাইনারি দেশীয় কনডেনসেট থেকে প্রক্রিয়াজাত করে পেট্রোল অকটেন, কেরোসিন ও ডিজেল উৎপাদন করে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে ফিনিশড প্রোডাক্ট হিসেবে পেট্রোলের আমদানি করা প্রয়োজন হয় না। দেশীয় যে উৎপাদিত কনডেনসেট সেটি থেকে দেশের মোট পেট্রোলের চাহিদার প্রায় ৪০-৪৫ শতাংশ পূরণ হচ্ছে। আর বাকিটা ইআরএল (ইস্টার্ন রিফাইনারি লি.) তারা ক্রুড অয়েল থেকে এবং প্রাইভেট যারা আছে তারা ইমপোর্টেড কনডেনসেট থেকে পেট্রোলের চাহিদা পূরণ করছে।’

অকটেনের চাহিদা কতটা পূরণ হয় সে হিসেব দিয়ে জীবন শান্তি সরকার সরকার জানান, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিপিসি প্রায় ৬২ শতাংশ অকটেন উৎপাদন করেছে, বাকি চাহিদা দেশীয়ভাবে পূরণ করা সম্ভব হয়েছে। নিজস্ব কনডেনসেট থেকে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি তেল উৎপাদন করে সিলেট গ্যাস ফিল্ড। সিলেটের দুটি প্ল্যান্টে দৈনিক সাড়ে সাত হাজার ব্যারেল কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা রয়েছে। তবে গ্যাসের উৎপাদন ও কনডেনসেট উৎপাদন কমে গিয়ে এখন প্রতিদিন সাড়ে চার হাজার ব্যারেল কনডেনসেট বরাদ্দ পায় সিলেট গ্যাসফিল্ডের কনডেনসেট ফ্র্যাকশনেশন প্ল্যান্ট।

ইরান যুদ্ধের কারণে তেল সংকট সৃষ্টির পর পেট্রোবাংলার নির্দেশনা অনুযায়ী হবিগঞ্জ সিআরইউতে দৈনিক অকটেন উৎপাদন ১০০ ব্যারেল বৃদ্ধি করে ৭০০ ব্যারেল উৎপাদন করা হচ্ছে এবং সপ্তাহে পাঁচ দিনের পরিবর্তে সাত দিন লরিতে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। হবিগঞ্জে উৎপাদিত পেট্রোল-অকটেন সিলেট অঞ্চল এবং রংপুর, পার্বতীপুর ও বাঘাবাড়ি এলাকায় সরবরাহ করা হয়।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে চাহিদার পুরোটাই দেশে উৎপাদিত হলেও যুদ্ধের অজুহাতে এ সংকট কেনো? দেশের জনগণকে বোকা বানিয়ে কারাই বা তৈরি করছে এই সংকট। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান যুদ্ধ এবং তেলের মজুত নিয়ে নানা খবরে আতঙ্ক থেকেই পেট্রোল ও অকটেনের অস্বাভাবিক চাহিদা তৈরি করেছে। সেই সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা অধিক মুনাফা লাভের আশায় পেট্রোল-অকটেন মজুত করছে এবং পাশাপাশি কালোবাজারে বেশি দামে বিক্রি করছে। ফলে পাম্পে চাহিদা অনুযায়ী পেট্রোল-অকটেন পাওয়া না গেলেও বাইরের বিভিন্ন দোকানে বেশি দামে পাওয়া যাচ্ছে। তারা আরও বলছেন, যুদ্ধের প্রভাবে আমদানিকৃত ডিজেলে সংকট তৈরি হওয়ার কথা থাকলেও সেখানে উল্লেখযোগ্য কোনো সংকট দৃশ্যমান নয়।

এ বিষয়ে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, দেশে অভিযান পরিচালনা করে তেল অবৈধ মজুত উদ্ধার করা হচ্ছে। সব পেট্রোল পাম্পে জ্বালানি ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম তদারকি ও সমন্বয় করতে ‘ট্যাগ অফিসার’ নিয়োগ করা হয়েছে। আমাদের মজুতের কোনো অসুবিধা নেই। আমাদের তেলের সাপ্লাই হচ্ছে। এখন আমার সারা বছরের যে প্ল্যানিং থাকে কোন পাম্পে কোন তেল দেব প্রতিদিন, সেই তেল সাপ্লাই করছি। এখন ডিমান্ড হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়ায় সেই তেল যদি শেষ হয়ে যায় সেটা তো কিছু করার নাই আমার। আমার সাপ্লাই লাইন ও ঠিক আছে।

তবে পেট্রোল পাম্প মালিকরা পেট্রোল-অকটেন দায় চাপাচ্ছেন ক্রেতাদের ঘাড়ে। বৃহত্তর ময়মনসিংহ পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান বলেন, মানুষ অতিরিক্ত তেল কিনে মজুত করার কারণে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিদিন আমি ৫-৬ হাজার লিটার তেল বিক্রি করতাম। পেট্রোল দুই হাজার লিটার আর ডিজেল তিন হাজার লিটার। এখন আমার সেই ডিমান্ড হয়ে গেছে ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার লিটার। সবাই তার গাড়ির তেলের ট্যাংক ফুল করতে চাচ্ছে। আগে যেখানে দুই লিটার তিন লিটার তেল নিত, এখন ৫-১০ লিটার কিনছে। এ কারণে একটা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হয়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে পেট্রোল অকটেনের এই চাহিদা অস্বাভাবিক। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশে আইইউবির উপাচার্য অধাপক ম তামিম বলেন, ‘বাংলাদেশে কনডেনসেটের উৎপাদনও কমেছে। রশিদপুর হবিগঞ্জ, বিবিয়ানা সিলেটের কয়েকটি ফিল্ড থেকে কনডেনসেট আসে। বিবিয়ানার উৎপাদন ১২০০ ১৩০০ মিলিয়ন থেকে ৮০০-৯০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে গেছে। সুতরাং আমাদের নিজস্ব সরবরাহ থেকে পেট্রোলটা মোটামুটি মেটানো যাবে। তবে অকটেন ডেফিনেটলি আমদানি করতে হবে।’ 

তিনি বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে আমরা জানলাম আগামী মাসের জন্য অকটেন যা প্রয়োজন তার দ্বিগুণ আসছে। সুতরাং গাড়ির লাইন আমরা যেটা দেখছি এটা ডেফেনেটলি প্যানিক পারচেজ।’

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দেশে জ্বালানি তেলের যথেষ্ট মজুত রয়েছে। চাহিদা পূরণে আরও কেনা হচ্ছে। মে মাস পর্যন্ত তেলের চাহিদা পূরণ করতে বেশি দামে তেল আমদানি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জ্বালানিবিষয়ক মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।

মন্ত্রী বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী প্রবলেম হয়েছে দেখেই তো বেশি দাম দিয়ে সিঙ্গাপুর থেকে তেল এনে স্টক করছি। আপাতত মে মাস পর্যন্ত চলার মতো জ্বালানি তেলের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আরও জাহাজ আসবে, আরও তেল আসবে।’ তিনি বলেন, ‘সরকারি কোষাগারের ওপর চাপ পড়লেও তেলের সরবরাহ ঠিক রাখা হচ্ছে। আর সেই সাপ্লাইকে ডিসরাপ্ট করতেছে কালোবাজারিরা।’

ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, সরকার এ মুহূর্তে দৈনিক ১৬০ কোটি টাকা জ্বালানি তেলে ভর্তুকি দিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা তেলের দাম এ মাসেও বাড়ালাম না। জনগণ যদি একটু সাশ্রয়ী হয়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত যদি তেল না কেনে তাহলে পরে এসব ভিড়-টিড় কিছুই থাকবে না এবং সাপ্লাইও স্বাভাবিক হয়ে যাবে।’

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  উৎপাদন   পেট্রোল-অকটেন   যুদ্ধের অজুহাত   সংকট  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close