নগরায়নের প্রভাবে রাজশাহীতে শব্দ দূষণ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। সাম্প্রতিক এক পরিমাপে দেখা গেছে, নগরীর ব্যস্ত এলাকায় শব্দের মাত্রা সরকারি সহনীয় সীমা ছাড়িয়ে মারাত্মক অবস্থায় পৌঁছেছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
শনিবার (৪ এপ্রিল) নগরীর ব্যস্ততম রেইলগেট এলাকায় পরিচালিত এক পরিমাপে দেখা গেছে, শব্দের মাত্রা সরকারি সহনীয় সীমা ছাড়িয়ে গেছে বহুগুণ।
বরেন্দ্র পরিবেশ উন্নয়ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার উদ্যোগে এবং বারিন্দ এনভায়রনমেন্টের সহযোগিতায় পরিচালিত এই পরীক্ষায় সকাল ১১টা থেকে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত গড় সর্বোচ্চো শব্দমাত্রা পাওয়া যায় ১০০ দশমিক ৫ ডেসিবেল এবং বিকাল তিনটা থেকে সাড়ে তিনটায় তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০৩ দশমিক ৭ ডেসিবেলে। যেখানে বাংলাদেশের শব্দ দূষণ বিধিমালা ২০২৫ অনুযায়ী বাণিজ্যিক এলাকায় দিনের বেলায় সহনীয় মাত্রা ৭০ ডেসিবেল।
সংস্থাটির তথ্যানুযায়ী, একই স্থানে ২০২২ সালে শব্দের গড় মাত্রা ছিল ৯০ ডেসিবেল, ২০২৩ সালেও ছিল ৯০ ডেসিবেল, ২০২৪ সালে ৯৬ ডেসিবেল এবং ২০২৫ সালে সর্বোচ্চো গড় ছিল ৯৭ ডেসিবেল।
ধারাবাহিকভাবে শব্দ দূষণ বৃদ্ধির এই প্রবণতা নগরবাসীর জন্য উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পরিমাপ কার্যক্রমে নেতৃত্ব দেন প্রকৌশলী ড. মো. জাকির হোসেন খান। তাকে সহযোগিতা করেন ড. অলি আহমেদসহ অন্য গবেষক ও স্বেচ্ছাসেবীরা।
গবেষণায় দেখা গেছে, শব্দ দূষণের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা ও যানবাহনের অতিরিক্ত হর্ন ব্যবহারের প্রবণতা দায়ী। বিশেষ করে টিটি হর্নের ব্যবহার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। এছাড়া বাসগুলোকে যত্রতত্র দাঁড়িয়ে হর্ন বাজাতেও দেখা গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘অটোরিকশায় ভেপু হর্ন বাধ্যতামূলক করা, যানবাহনের জন্য নির্দিষ্ট লেন চালু করা এবং বাস স্টপেজ নির্ধারণ করলে অপ্রয়োজনীয় হর্ন ব্যবহার কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে শহরে নির্দিষ্ট গতি সীমা নির্ধারণ করলে শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।’
এদিকে, জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির ২০২২ সালের এক প্রতিবেদনে ঢাকাকে বিশ্বের সবচেয়ে শব্দ দূষণকারী শহর এবং রাজশাহীকে চতুর্থ স্থানে উল্লেখ করা হয়। ওই প্রতিবেদনে রাজশাহীতে শব্দের মাত্রা ১০৩ ডেসিবেল হিসেবে দেখানো হয়।
চিকিৎসকরা সতর্ক করে বলছেন, ‘অতিরিক্ত শব্দের কারণে মানুষের শ্রবণশক্তি হ্রাস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, অনিদ্রা, মানসিক অস্থিরতা এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যেতে পারে।’
বিশেষজ্ঞরা জানান, শব্দ দূষণের প্রভাব শুধু মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; পশু-পাখি ও পরিবেশের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এ ক্ষেত্রে গাছপালা শব্দ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। রাজশাহীতে আম, জাম, নিম ও সজনে গাছের মতো পরিবেশবান্ধব বৃক্ষ রোপণের মাধ্যমে শব্দ ও বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে।
বরেন্দ্র পরিবেশ উন্নয়ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা জানায়, তারা অতীতেও শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণে লিফলেট বিতরণ ও মানববন্ধনের মতো কর্মসূচি পরিচালনা করেছে এবং ভবিষ্যতেও জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ অব্যাহত রাখবে।
কেকে/এমএ