ইরান যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে সারা বিশ্বে তৈরি হয়েছে নজিরবিহীন জ্বালানি সংকট। তার আঁচ এসে পড়েছে বাংলাদেশেও। দেশজুড়ে তীব্র জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। পাম্পগুলোতে বাড়ছে মোটরসাইকেলসহ যানবাহনের লাইন। যদিও সরকার বলছে, দেশে জ্বালানি মজুত সন্তোষজনক। যে সংকট তা কৃত্রিম। বাজারের অস্থিরতা কাটাতে সরকার এরই মধ্যে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু শত চেষ্টায়ও নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না জ্বালানি সংকট।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার জবাবে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। এর জলপথ দিয়ে বিশ্বের বেশিরভাগ জ্বালানি পরিবহন হয়। এ পথ বন্ধ হওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ ডিজেল মূলত আমদানি করে সিঙ্গাপুর, ভারত থেকে। এ ছাড়া পেট্রোল ও অকটনে আমাদের দেশেই উৎপাদন হয়। তবু সংকট দেখা দিয়েছে।
এর কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করছেন, আতঙ্কে ব্যবহারকারীরা অতিরিক্ত জ্বালানি কিনছেন। এতে চাহিদা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে। আর এর সুযোগ নিচ্ছে কিছু অসাধু ব্যবসয়ী। তারা তেলের কালোবাজারি শুরু করে দিয়েছেন। এটাই প্রধান সংকট।
অন্যদিকে সরকার ঈদের আগে পেট্রোল পাম্পে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করে। পরে অবশ্য তা প্রত্যার করা হয়। তাতেও সংকট কাটেনি। সরকার একাধিক উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। এ ছাড়া জ্বালানি সাশ্রয়ের পথেও যাচ্ছে। সে লক্ষ্যে কমিয়ে আনা হয়েছে সরকারি-বেসরকারি অফিসের কর্মঘণ্টা। দোকান ও শপিংমলগুলো সন্ধ্যায় ৬টায় বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে সরকারের এত সব উদ্যোগেও সংকট কাটছে না। বরং জ্বালানি সংকটের কারণে এরই মধ্যে লোডশেডিংয়ের কবলে পড়েছে দেশ। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। আর পাম্পে যানবাহনের লাইন আরও দীর্ঘ হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাস্তবে সাশ্রয়নির্ভর করে মানুষের আচরণগত পরিবর্তনের ওপর। কারণ অফিসের সময় কমলেও বাসাবাড়িতে বিদ্যুৎ ব্যবহার বাড়তে পারে, আবার প্রতিষ্ঠানগুলো কম সময়ে বেশি চাপ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার নাও কমাতে পারে।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম মনে করেন, ‘এটি যথাযথভাবে পালিত হলে স্বল্পমেয়াদে কিছুটা লাভ হবে। কিন্তু এগুলো সাধারণত সুফল আনতে পারে না। এসব ক্ষেত্রে সরকারের সফলতার হার খুব বেশি না।’
বিশ্বে তেলের দাম বাড়লেও বাংলাদেশে এখনো তেলের দাম সেভাবে বাড়ানো হয়নি উল্লেখ করে চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম বলেছেন, দেশে জ্বালানির দাম যেন না বাড়ানো হয় সে জন্য প্রধানমন্ত্রী আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। জ্বালানি তেল ও
বৈশ্বিক সংকট প্রসঙ্গে চিফ হুইপ বলেন, বিশ্বে তেলের দাম বাড়লেও বাংলাদেশে এখনো তেলের দাম সেভাবে বাড়ানো হয়নি। প্রধানমন্ত্রী আপ্রাণ চেষ্টা করছেন যেন জ্বালানির দাম না বাড়ানো হয়। প্রধানমন্ত্রী বাহুল্য খরচ কমাতে নিজের বহর নিয়ে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন।
সংসদে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে এসির টেম্পারেচার ২৫-এর নিচে না নামানো হয়। তিনি নিজের রুমেও অধিক আলো বা এসি ব্যবহার করেন না শুধুমাত্র বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য। এসব ভালো কাজের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে আমাদের ধন্যবাদ জানানো উচিত।
এদিকে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির জন্য এক শ্রেণির মানুষ চেষ্টা করছে। তারা একই মোটরসাইকেল নিয়ে একই দিন একাধিক জায়গা থেকে জ্বালানি নিচ্ছে। সেই তেল বাসায় নিয়ে বোতলে, ড্রামে ভরে আবার নিতে আসছে। আমরা এতদিন সফট (নমনীয়) ছিলাম। প্রয়োজনবোধে তেলের কালোবাজারি ও মজুতদারদের বিরুদ্ধে বিশেষ আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রয়োগ করব। এবং তার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।
মন্ত্রী বলেন, ১৯৭৪ সালের ‘বিশেষ ক্ষমতা আইনে’ কালোবাজারি এবং মজুতদারির বিরুদ্ধে সেকশন ২৫-এর যে শাস্তির বিধান করা হয়েছে, প্রয়োজনবোধে সেই শাস্তি প্রয়োগ করা হবে। তার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। আইনমন্ত্রী বলেন, ‘প্রশাসনকে বলছি, আপনারা কঠোর হোন। আপনাদের সঙ্গে অতন্দ্র প্রহরীর মতো সংগঠনের নেতাকর্মীরা থাকবে।’
ভিড় কমেনি তেল পাম্পে : পেট্রোল পাম্পগুলোতে তেলের সরবরাহ ঠিক না থাকায় বিভিন্ন পাম্পে বন্ধ রয়েছে যানবাহনে তেল দেওয়া কার্যক্রম। যেসব পাম্পে তেল বিক্রি কার্যক্রম চলমান সেগুলোতেও টানা বেশ কিছুদিন ধরে তেল সংগ্রহে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন লেগে থাকছে। কোনোভাবে ভিড় কমছে না পাম্পগুলোতে।
গতকাল সকাল থেকে রাজধানীর জ্বালানি তেল পাম্পগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। এদিন রাজধানীর বিজয় সরণির ট্রাস্ট ফুয়েল স্টেশন, আসাদগেটের তালুকদার ফিলিং স্টেশন ও সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশন ঘুরে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে।
ট্রাস্ট ফুয়েল স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, পাম্পটির সামনে থেকে শুরু করে মহাখালীমুখী সড়কে তেল নিতে আসা যানবাহনের দীর্ঘ লাইন। যানবাহন চালকদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। এ ছাড়া তীব্র রোদে মোটরসাইকেল চালকরা লাইনে সারিবদ্ধভাবে গাড়ি রেখে ফুটপাতের ওপর ছায়াযুক্ত স্থানে তেলের অপেক্ষা করছেন।
আসাদগেটের তালুকদার ফিলিং স্টেশনের সামনে থেকে শুরু হয়ে জিয়া উদ্যান ঘুরে বিজয় সরণির মেট্রোরেল স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছেছে অপেক্ষারত যানবাহনের লাইন। সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনের সামনে থেকে শুরু হওয়া মোহাম্মদপুর টাউন হলের দিকের সড়কে লম্বা লাইন দেখা গেছে।
সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনের সামনে অপেক্ষারত মোটরসাইকেলচালক সাগর বলেন, কি আর বলব ভাই। প্রতিদিন একই পরিস্থিতির মধ্যে পার করতে হচ্ছে। তেল দিচ্ছে অল্প। যে কারণে দুদিন, তিনদিন পরপরই তেল নিতে লাইনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় পার করতে হচ্ছে।
কেকে/ এমএস