টানা তিন মাস খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের ‘পদ’ শূন্য থাকায় অধিদপ্তরের প্রশাসনিক কর্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে প্রশাসন বিভাগের পরিচালক মাহবুবুর রহমানের বেপরোয়া দুর্নীতি, চরম স্বেচ্ছাচারিতা ও চাকরিবিধির প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন এ স্থবিরতা আরও বাড়িয়েছে।
জানা গেছে দীর্ঘদিন খাদ্য অধিদপ্তরে নিয়মিত মহাপরিচালক নেই। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এক অতিরিক্ত সচিবকে এ পদের অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। খাদ্য অধিদপ্তরের মাঠ প্রশাসন সম্পর্কে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা না থাকায় অন্য কর্মকর্তাদের ওপর নির্ভরশীল হতে হয়। কিন্তু অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা এ কর্মকর্তা এ বিষয়ে আগ্রহী হচ্ছেন না।
এদিকে প্রায় তিন মাস ধরে অনুপস্থিত রয়েছেন খাদ্য অধিদপ্তরের অপর এক গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা পরিচালক প্রশাসন মো. মাহাবুবুর রহমান। ২০ দিনের বহির্বাংলাদেশ ছুটি নিয়ে তিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। সেখানে পরিবার নিয়ে বিভিন্ন রাজ্যে ভ্রমণ করতে দেখা যাচ্ছে। মাত্র ২০ দিনের বহির্বাংলাদেশ ছুটি নিয়ে তিনি কীভাবে তিন মাস অবস্থান করছেন এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাবেক এপিডি ও সাবেক এক সচিব বলেন, বিএসআরের বিধান মতে বহির্বাংলাদেশ ছুটির নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফিরে এসে কর্মস্থলে যোগদান করতে হবে। না হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে। এতে সর্বোচ্চ শাস্তি চাকরিচ্যুত হতে পারে।
বহির্বাংলাদেশ ছুটি বাড়ানোর কোনো সুযোগ আছে কি না এমন প্রশ্নের জাবাবে অপর এক কর্মকর্তা বলেন, তা নির্ভর করে বিদ্যমান পরিস্থিতি এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের ওপর। যদি এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয় যে, তিনি দেশে ফিরতে পারছেন না এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ যদি মনে করেন সে ক্ষেত্রে বহির্বাংলাদেশ ছুটির মেয়াদ বাড়ানো যেতে পারে, তা হলেই সেটি সম্ভব। অন্যথায় এটি শৃঙ্খলা ভঙ্গের অপরাধ হিসেবে পরিগণিত হবে।
একজন সরকারি কর্মকর্তার পুরো পরিবার বিদেশে থাকা কি বিধিসিদ্ধ কি না এমন প্রশ্নর জবাবে তিনি বলেন, সরকারি কোনো কর্মকর্তার পুরো পরিবার বিদেশে রাখতে চাইলে উপযুক্ত কারণ দেখিয়ে সরকারের অনুমোদন নিতে হয়।
জানা গেছে, সরকারি বিধিবিধানের তোয়াক্কা না করে এ কর্মকর্তা তার পরিবার যুক্তরাষ্ট্রে রেখেছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থপাচার করছেন। অভিযোগ রয়েছে, জানুয়ারিতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সময় শতকোটি টাকার বেশি পাচার করে নিয়ে গেছেন।
দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত এ টাকা হুন্ডির মাধ্যমে পাচার করেছেন। এর মধ্যে খাদ্য অধিদপ্তরের নিয়োগ দেওয়ার কথা বলে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রায় শতকোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। খাদ্য অধিদপ্তরের বিভন্ন বিভাগীয় ফুড কন্ট্রোলার অফিসে তিনি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। এদের কাজে লাগিয়ে বদলির মাধ্যমে হাতিয়ে নিয়েছেন প্রায় ২০ কোটি টাকা। বিগত সরকারের ডামাডোলে তিনি এসব কাজ করেছেন। এ কাজে তিনি কখনো উপদেষ্টা আবার কখনো সচিবের নামও ব্যবহার করেছেন।
এ ছাড়া বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে তৎকালীন প্রশাসনকে ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে দেশের ১৮টি খাদ্য গোডাউনকে প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত করার আদেশ জারি করান। এ ১৮টি গোডাউনে পদায়নের কথা বলে প্রায় ৭ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ আছে।
পাশাপাশি তার ক্ষমতা যাতে খর্ব না হয়, সে জন্য অন্যদের পদোন্নতি আটকাতে তিনি গোয়েন্দা সংস্থাকে মিথ্যা তথ্য দিয়েও বিভ্রান্ত করেছেন বলে জানাচ্ছে। ফলে তার এ স্বেচ্ছাচারিতা, নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করাসহ তার কর্মকাণ্ডে পুরো খাদ্য বিভাগে হতাশা তৈরি হয়েছে। নেমে এসেছে স্থবিরতাও।
খাদ্য অধিদপ্তরের এক পরিচালক বলেন, মাবুবুর রহমান ছয় মাসের আগে দেশে ফিরবেন না। টানা ছয় মাস থাকলে তিনি গ্রিন কার্ডের জন্য আবেদন করতে পারবেন।
অপর এক কর্মকর্তা বলেন, আওয়ামী আমল থেকে তিনি সমানে অবৈধভাবে বিপুল পরিমাণে টাকা কামিয়ে আসছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রে টাকা পাচার করছেন। অভ্যন্তরীণ সরকারের আমলে তিনি ছিলেন বেপরোয়া। মনে হতো তিনি খাদ্য বিভাগের মন্ত্রী। তার এ কথার প্রমাণ মেলে তৎকালীন মহাপরিচালকের কথায়। তিনি বলে কক্সবাজারে ওসিএলএলডি দেওয়ার ক্ষেত্রে কথা বলে নিতে। কিন্ত পরিচালক প্রশাসন ডিজির কথা পাত্তা না দিয়ে, মোটা অর্থের বিনিময়ে অন্য একজনকে নিয়োগ দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
কেকে/ এমএস