মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাব সম্ভবত সবচেয়ে বেশি পড়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালিতে। ইরানের বিধিনিষেধের কারণে গুরুত্বপূর্ণ এ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এ ছাড়া জাহাজ চলাচলে শর্ত বা টোল আরোপের ইঙ্গিত দিয়ে ইরান এমন এক পদক্ষেপের পথে হাঁটছে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্য ও সামুদ্রিক আইনের ভিত্তিকেই নাড়িয়ে দিতে পারে।
এ পরিস্থিতি এখন শুধু আঞ্চলিক নয়, বরং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। এমন অবস্থায় বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নির্বিঘ্ন করতে বিকল্প বিভিন্ন পথ নিয়ে আলোচনায় বসেছে ওমান ও ইরান।
সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড বলছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিকে নতুনভাবে গড়ে তুলছে। এ সংঘাত এখন নতুন এক ফ্রন্টে পৌঁছেছে। আর সেটি স্থল বা আকাশে নয়, বরং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে।
ইরান গত বৃহস্পতিবার আবারও বলেছে যে, তারা ওমানের সঙ্গে যৌথভাবে একটি প্রটোকল তৈরি করছে, যার মাধ্যমে এ সংকীর্ণ সমুদ্রপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল তদারকি করা হবে। একইসঙ্গে তেহরান থেকে এমন ইঙ্গিতও এসেছে যে প্রণালিটি ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর ওপর শর্ত আরোপ বা এমনকি টোল নেওয়া হতে পারে। এতে জরুরি প্রশ্ন উঠেছে যে, এ গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক বাণিজ্যপথের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ কার হাতে?
গত শনিবার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। উভয় দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী পর্যায়ে এ বৈঠকে দুপক্ষের বিশেষজ্ঞরাও উপস্থিত ছিলেন বলে রোববার এক্সে এক পোস্টে জানিয়েছে ওমানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পোস্টে বলা হয়, ‘অঞ্চলটিতে বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে সম্ভাব্য বিকল্পগুলো নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে এবং দুই দেশের বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছু পরিকল্পনা ও প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন। সেগুলো পর্যালোচনা করে দেখা হবে।’
গত ফেব্রুয়ারি মাসে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে তেহরান কার্যত এ জলপথটি বন্ধ করে রেখেছে। রোববার ওমানের তিনটি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তেলবাহী দুটি বড় সুপারট্যাংকার এবং তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ওমানের উপকূলের দিকে যেতে দেখা গেছে।
ইরান ও ওমান হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে এবং এ প্রণালি ‘পর্যবেক্ষণ’ বা তত্ত্বাবধানের জন্য একটি প্রটোকল তৈরি করছে এক ইরানি কর্মকর্তা বৃহস্পতিবার একথা জানানোর পর ওমানের জাহাজগুলো এ পথ অতিক্রম করার এই খবর এলো। হরমুজ প্রণালির উত্তর অংশ ইরান এবং দক্ষিণ অংশ ওমানের নিয়ন্ত্রণে অবস্থিত, যা এ অঞ্চলটিকে ভূ-রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল করেছে।
চুক্তি না করলে সব উড়িয়ে দিয়ে ইরানের তেল দখল করব :
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার গতকাল ছিল ৩৭তম দিন। হামলার প্রথম দিন গত ২৮ ফেব্রুয়ারিতেই দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ অন্তত ৪০ জন শীর্ষ নেতা নিহত হন। এর জবাবে প্রতিশোধমূলক হামলা শুরু করেছে ইরান। দেশটি ইরাক, কুয়েত, বাহরাইন ও সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলের যেসব দেশে মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে, সেগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। একইসঙ্গে ইসরায়েলের বিভিন্ন শহরেও হামলা হচ্ছে। এতে সংঘাত ধীরে ধীরে পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রে সামাজিক কর্মসূচির জন্য তহবিলের অভাব নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছেন ইরানের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরেফ। মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো এ সপ্তাহে জানিয়েছে, ট্রাম্প বলেছেন, তার সরকারের পক্ষে চিকিৎসা ও শিশু পরিচর্যা খাতে অর্থায়ন করা সম্ভব নয়। কারণ, সরকার সামরিক ব্যয়ের দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ রেজা আরেফ লিখেছেন, ট্রাম্প গত রাতে যুদ্ধকে অজুহাত হিসেবে দেখিয়ে মার্কিন জনগণের জন্য ‘শিশু পরিচর্যা ও স্বাস্থ্যসেবা’ প্রদানে তার অক্ষমতার কথা বলেছেন এবং আজ তিনি ইরানের ‘বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতু’ ধ্বংস করার হুমকি দিয়েছেন।
এদিকে ইরানের অবকাঠামোর ওপর সম্ভাব্য হামলা নিয়ে আবারও হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, ‘তারা (ইরান) যদি দ্রুত কোনো চুক্তিতে না পৌঁছায়, তাহলে আমি সবকিছু উড়িয়ে দিয়ে তেলসম্পদ দখলে নেওয়ার কথা ভাবছি।’
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে টেলিফোনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি ইরানের উদ্দেশ্যে এ হুমকি দেন। ফোনে ট্রাম্প আরও বলেছেন, ‘তাদের (ইরান) পুরো দেশে সেতু আর বিদ্যুৎকেন্দ্র ধসে পড়তে দেখবেন।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেছেন, কিছু ইরানি কর্মকর্তা ‘এখন আলোচনা করছেন’ এবং তিনি মনে করেন, সোমবারের মধ্যে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর ‘ভালো সম্ভাবনা’ রয়েছে। তবে তেহরান কোনো চুক্তি করতে চাইছে ট্রাম্পের এমন দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন ইরানের কর্মকর্তারা।
ইরানের ড্রোন হামলার ফলে কুয়েতের বেশ কয়েকটি তেল স্থাপনায় ‘উল্লেখযোগ্য বস্তুগত ক্ষয়ক্ষতি’ হয়েছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা কুনা কুয়েত পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ড্রোন হামলার ফলে বেশ কয়েকটি স্থাপনায় আগুনের সূত্রপাত হয়। আগুন যাতে পার্শ্ববর্তী অন্যান্য স্থাপনায় ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সেজন্য দ্রুত দমকল বাহিনী মোতায়েন করা হয়। কুয়েত পেট্রোলিয়াম করপোরেশন জানিয়েছে, এ হামলায় এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। ইরানি কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশটির অভ্যন্তরে বেশ কয়েকটি বিদেশি বিমান ও ড্রোন ধ্বংস করা হয়েছে।
এর আগে, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) একজন মুখপাত্র জানিয়েছিলেন যে ইরানি বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের দুটি ‘সি-১৩০’ সামরিক পরিবহন বিমান এবং দুটি ‘ব্ল্যাক হক’ হেলিকপ্টার ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ সমাজমাধ্যম এক্স-এ ইরানি বাহিনীর হামলায় ভূপাতিত একটি মার্কিন বিমানের ধ্বংসাবশেষের ছবি প্রকাশ করেছেন।
ইরানের শেষ হাতিয়ার :
খানজাদেহ মনে করেন, ইরানের হাতে থাকা শেষ বড় কৌশলগত হাতিয়ারগুলোর একটি হচ্ছে হরমুজ প্রণালি। তিনি বলেন, ‘প্রক্সি দুর্বল, পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ক্ষতিগ্রস্ত, অভ্যন্তরীণ চাপ বাড়ছে, এ অবস্থায় ইরান তাদের শেষ দরকষাকষির অস্ত্র ধরে রাখতে চাইছে।’
এমন অবস্থায় আইন ও বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্যই এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। খানজাদেহ বলেন, টোল আরোপ আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ হলেও বাস্তবে অনেক কোম্পানি যুদ্ধের ঝুঁকি এড়াতে অর্থ দিতে পারে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক আইন কার্যকর করা অনেক সময় যে রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে, এ ঘটনা সেটাই প্রমাণ করে।
রুহালের মতে, ভারত, চীন, ইউরোপ ও উপসাগরীয় দেশগুলোর যারা এই প্রণালির ওপর নির্ভরশীল, তারা এটি খোলা রাখতে আগ্রহী। তারা কূটনৈতিক প্রতিবাদ, আন্তর্জাতিক আইনের আশ্রয় এবং যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে।
তবে এখনো কেউ সরাসরি সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেয়নি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা নাকচ করেছে, আর চীন ও ভারতও এ বিষয়ে নীরব। অবশ্য এই ইস্যুতে বিশ্ব শক্তিগুলোর মধ্যে বিভাজন আরও স্পষ্ট হচ্ছে। পশ্চিমা দেশগুলো নৌ চলাচলের স্বাধীনতা রক্ষার কথা বলছে, উপসাগরীয় দেশগুলো জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে নিরাপত্তা চায়, আর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলকে দায়ী করছে চীন।
ফলে হরমুজ প্রণালি বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। এমন অবস্থায় উপসাগরীয় দেশগুলো বিকল্প রপ্তানি পথ তৈরির চেষ্টা করছে ঠিকই, তবে স্বল্পমেয়াদে হরমুজের বিকল্প নেই। এটি এখনো বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অপরিহার্য পথ।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি বিভিন্ন দেশ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে টোল আরোপ শুরু করে, তাহলে বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থা মৌলিকভাবে বদলে যাবে। খরচ বাড়বে, অনিশ্চয়তা বাড়বে এবং রাজনৈতিক চাপ বৃদ্ধি পাবে।
সবশেষে প্রশ্নটি দাঁড়াচ্ছে আন্তর্জাতিক আইন কি আধুনিক যুদ্ধ ও শক্তির রাজনীতির চাপে টিকে থাকতে পারবে? হরমুজ প্রণালিতে যা ঘটবে, তা শুধু একটি আঞ্চলিক সংঘাতের ভবিষ্যৎ নয় বরং বৈশ্বিক সমুদ্রপথে আইন ও শক্তির ভারসাম্যও নির্ধারণ করতে পারে।
কেকে/ এমএস