দেশে কাগজে-কলমে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত থাকার দাবি করা হলেও বাস্তবে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের তেলের পাম্পগুলোতে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। পাম্পগুলোতে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোলের সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
তেলের অভাবে বাস, ট্রাক ও রাইডশেয়ারিং চালকরা নিয়মিত ট্রিপ চালাতে পারছেন না। এর প্রভাব পরছে পণ্য পরিবহনে, বেড়ে যাচ্ছে নিত্যপণ্যের দাম। সেচের জন্য অতিরিক্ত খরচ করতে হচ্ছে কৃষকদের। জ্বালানি সংকটে সমুদ্রে ট্রলার নিয়ে মাছ ধরতে যেতে পারছেন না জেলেরা, ফলে কমে যাচ্ছে মাছ আহরণ। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এর প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
জ্বালানি সংকটে পরিবহন খাতে দেখা দিয়েছে অস্থিরতা। বাস-ট্রাক চালক ও মালিকরা বলছেন, জ্বালানি না পেলে নিয়মিত ট্রিপ পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে পণ্য পরিবহনে বিলম্ব হচ্ছে এবং খরচ বাড়ছে। কিছু ক্ষেত্রে ভাড়া বাড়ানোর চাপও তৈরি হচ্ছে।
এছাড়া কৃষি খাতেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। সেচ মৌসুমে ডিজেলের চাহিদা বাড়লেও সরবরাহ সংকটের কারণে কৃষকদের অতিরিক্ত খরচ গুনতে হচ্ছে। অনেক এলাকায় কৃষকরা নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে ডিজেল কিনতে বাধ্য হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, যা শেষ পর্যন্ত খাদ্যদ্রব্যের দামে প্রভাব ফেলতে পারে।
জ্বালানি সংকটে ঢাকায় রাইডশেয়ারিং খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মোটরসাইকেল চালকদের তেল নিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে, ফলে তাদের কর্মঘণ্টা কমে যাচ্ছে এবং আয় অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। আগে যেখানে দিনে গড়ে ১,৫০০ টাকা আয় হতো, এখন অনেকেই ৭০০-৮০০ টাকাও আয় করতে পারছেন না।
চালকেরা জানান, ট্রিপ কমে যাওয়া, তেল সংগ্রহে দীর্ঘ সময় ব্যয় এবং ভাড়া অপরিবর্তিত থাকায় তাদের আয় কমছে। অনেকেই পেশা পরিবর্তনের কথা ভাবছেন। প্রতিদিন ২-৩ ঘণ্টা তেলের লাইনে দাঁড়ানোর কারণে কাজের গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট হচ্ছে, কখনো তেল না পেয়েও ফিরতে হচ্ছে।
অন্যদিকে, যাত্রীসংখ্যা তুলনামূলক কম এবং প্রতিযোগিতা বেশি থাকায় চালকেরা ভাড়া বাড়াতে পারছেন না। অ্যাপভিত্তিক ভাড়াও আগের মতোই রয়েছে। ফলে খরচ বাড়লেও আয় বাড়ছে না।
জ্বালানি তেলের সংকটে দেশের সমুদ্রাঞ্চলে মাছ আহরণে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। ডিজেলের অভাবে অনেক ট্রলার ও বাণিজ্যিক জাহাজ নিয়মিত সাগরে যেতে পারছে না, ফলে মাছ ধরা ১০-১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে বলে জানিয়েছে সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তর।
দেশে প্রায় ৩০ হাজার নৌযান ও ২৬৮টি বাণিজ্যিক জাহাজ সাগরে মাছ ধরে। আগে মাসে গড়ে ১০ হাজার টন মাছ আহরণ হলেও বর্তমানে তা কমে গেছে। অনেক নৌযান জ্বালানি না পেয়ে একেবারেই সাগরে যেতে পারছে না, আর যেগুলো যাচ্ছে, সেগুলোরও সাগরে থাকার সময় কমে গেছে।
কক্সবাজারে অন্তত ৪ হাজার ট্রলার এবং চট্টগ্রামে ৫-৬ হাজার নৌযান কার্যত বন্ধ রয়েছে। প্রয়োজনীয় ডিজেলের তুলনায় অল্প জ্বালানি পাওয়ায় গভীর সাগরে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে মাছ ধরার পরিমাণ আরও কমে যাচ্ছে। বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতেও একই সমস্যা। জ্বালানি সংকটের কারণে ২৪-২৬ দিনের ফিশিং ট্রিপ কমিয়ে ১৮-২০ দিনে নামিয়ে আনা হয়েছে। এতে মোট আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
সম্প্রতি পঞ্চগড় থেকে ঝিনাইদহ পর্যন্ত বালি পরিবহন করা একটি ট্রাক চালকের সঙ্গে আলাপ করতে গিয়ে জানা যায়, দেশের জ্বালানি সংকট কেবল সাধারণ মানুষকে নয়, পেশাজীবী ও ব্যবসায়িক পরিবহনকেও উল্লেখযোগ্যভাবে ঝুঁকিতে ফেলেছে। তিনি জানান, পঞ্চগড় থেকে রওনা দেওয়ার পরেও পথে অন্তত ৭-৮টি পাম্পে গিয়ে তেল সংগ্রহের চেষ্টা করেছেন, কিন্তু তেল পাননি। নীলফামারীর ডোমারের একটি পাম্পে মাত্র ৩০ লিটার তেল পাওয়া গেছে, তাও সাধারণ দামের চেয়ে ৩০০ টাকা বেশি পরিশোধ করতে হয়েছে। এরপর পাশের জেলায় আরেকটি পাম্প থেকে মাত্র ৫০ লিটার তেল সংগ্রহ করতে পারেন, যেখানে অতিরিক্ত ৫০০ টাকা দিতে হয়।
এইভাবে পথে পথে তেলের দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়েই ট্রাকটি অবশেষে ঝিনাইদহ পৌঁছায়। যেখানে সাধারণ সময় ১১-১২ ঘণ্টার মধ্যে যাত্রা শেষ হতো, সেই একই দূরত্ব পাড়ি দিতে এদিন ১৮ ঘণ্টা সময় লেগেছে। ফলে পরিবহনের খরচও বৃদ্ধি পেয়েছে। পূর্বে ৪২-৪৪ হাজার টাকার মধ্যে ভাড়া ঠিক করা হতো। জ্বালানি সংকট ও অতিরিক্ত খরচের কারণে ৫২ হাজার টাকায় চুক্তি করা হয়।
ট্রাকচালকের কথায়, তেলের এই অনিশ্চয়তা শুধু সময়ের ক্ষতি করছে না, বরং ব্যবসায়িক পরিকল্পনাকেও বিপর্যস্ত করছে। প্রতিদিনের যাত্রা এমন অনিশ্চয়তায় পূর্ণ থাকলে পরিবহন খাতের ওপর চাপ বৃদ্ধি পাবে, যার প্রভাব সরাসরি অর্থনীতিতে পড়বে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, অনেক পাম্পে ডিজেল ও অকটেনের সরবরাহ সীমিত করে দেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না। আবার কিছু পাম্পে সরবরাহ না থাকায় ‘তেল নেই’ লেখা নোটিস টাঙিয়ে রাখা হয়েছে। এতে পরিবহন চালক ও সাধারণ গ্রাহকদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে খালি হাতেই ফিরতে হচ্ছে।
মিরপুরের এক পাম্পে কথা হয় ট্রাকচালক আব্দুল কাদেরের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সকাল থেকে তিনটি পাম্প ঘুরেছি, কোথাও ঠিকমতো ডিজেল পাচ্ছি না। যেটুকু আছে, সেটাও সীমিত করে দিচ্ছে। এতে করে আমাদের ট্রিপ কমে যাচ্ছে, আয়ও কমে গেছে।’ একই ধরনের অভিযোগ করেছেন ব্যক্তিগত গাড়িচালকরাও।
পাম্প মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকারি ডিপো থেকে আগের মতো নিয়মিত সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে চাহিদার তুলনায় অর্ধেক বা তারও কম তেল দেওয়া হচ্ছে। এতে তারা বাধ্য হয়ে গ্রাহকদের মধ্যে সীমিতভাবে তেল বিক্রি করছেন। এক পাম্প মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমাদের কাছে যে পরিমাণ তেল আসে, তা দিয়ে পুরো দিনের চাহিদা মেটানো সম্ভব হয় না। তাই রেশনিং করতে হচ্ছে।’
বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান সরকারের জ্বালানি নীতি ও বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘সরকারি দলের মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের কথা শুনলে মনে হয় বাংলাদেশ যেন তেলের ওপর ভাসছে।’ মন্ত্রীদের বক্তব্যে মনে হয় দেশে জ্বালানির কোনো সংকট নেই, অথচ বাস্তবে মানুষ তেলের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে কষ্ট পাচ্ছে।
তিনি অভিযোগ করেন, সরকার প্রকৃত পরিস্থিতি আড়াল করছে এবং সংসদে জ্বালানি সংকট নিয়ে আলোচনা করার সুযোগও দেওয়া হচ্ছে না।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের যুগ্মসচিব (অপারেশন অনুবিভাগ) মনির হোসেন চৌধুরী জানিয়েছেন, দেশে জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে কাজ চলমান। তিনি বলেন, ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনে কোনো ঘাটতি নেই এবং চলতি এপ্রিল ও আগামী মে মাসেও সরবরাহে কোনো সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, পাম্পে দীর্ঘ লাইনের দৃশ্যটি মূলত পেনিক বায়িংয়ের কারণে তৈরি হচ্ছে। তবে, জ্বালানি সরবরাহ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে।
পেট্রোল ও অকটেন বিষয়ে তিনি জানান, পেট্রোল শতভাগ দেশেই উৎপাদিত হলেও তার ৬০ শতাংশ কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। অকটেনের ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ সরাসরি আমদানি করতে হয় এবং বাকি ৬০ শতাংশ দেশে উৎপাদন হলেও এর ২০ শতাংশ কাঁচামাল আমদানি করা হয়।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় জানায়, জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুতদারি রোধ এবং সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে সারা দেশে অভিযান চালিয়ে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে। ৬ এপ্রিল পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ৬ হাজার ২৪২টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। এসময় ৪ লাখ ৪৮ হাজার ৪৫৬ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ৩৩ হাজার ১৫৭ লিটার ডিজেল, ৩৬ হাজার ৪০৫ লিটার অকটেন এবং ৭৮ হাজার ৮৯৪ লিটার পেট্রোল রয়েছে।
এছাড়া অভিযানে ২ হাজার ৪৫৬ টি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং ৩১ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের পরিচালিত অভিযানে ১ কোটি ২৫ লাখ ৩৯ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ জানায়, জ্বালানি তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং অনিয়ম প্রতিরোধে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে। বিভাগের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছেন বলেও মন্ত্রণালয়ের পক্ষে থেকে জানানো হয়। কোথাও অনিয়ম লক্ষ করা গেলে বা সন্দেহজনক কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য পেলে, ভিজিলেন্স টিমের নির্ধারিত নম্বরে যোগাযোগ করার জন্য সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
কেকে/ এমএস