ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট। এ নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের গ্রেপ্তার হওয়া নেতাকর্মীদের মধ্যে জামিনের আশা জেগেছে। অনেকেই ইতোমধ্যে আদালতে জামিনের আবেদন করেছেন, কেউ কেউ জামিনও পেয়েছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলটির শীর্ষ নেতা, সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যসহ হাজার হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগে মামলা হয়। এসব মামলায় অনেকে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন, আবার অনেকে আত্মগোপনে রয়েছেন।
দলের সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতা বিদেশে অবস্থান করে সেখান থেকে দলকে সংগঠিত করার চেষ্টা করছেন।
নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর কারাগারে থাকা নেতাকর্মীদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে। ইতোমধ্যে অনেকে জামিনে মুক্ত হয়েছেন। তবে একাধিক মামলায় আসামি হওয়ায় অনেকেই একটি মামলায় জামিন পেলেও অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোয় মুক্তি পাচ্ছেন না।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী জামিনের আবেদন করেছেন। কারাগারের বাইরেও এমন অনেক নেতা রয়েছেন, যাদের নামে মামলা থাকায় তারাও জামিনের জন্য আইনি প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকায় জামিন প্রক্রিয়া জটিল হয়ে পড়েছে।
সূত্রগুলো জানায়, নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক সহিংসতা, হামলা, ভাঙচুর ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগই বেশি।
অনেক ক্ষেত্রে একই ঘটনায় একাধিক মামলা হয়েছে, যেখানে একই ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। ফলে একজন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ৫ থেকে ১০টি, এমনকি ২০টির বেশি মামলাও রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, ‘অনেকে জামিনের আবেদন করেছেন, কেউ কেউ জামিনও পেয়েছেন। কিন্তু একটি মামলায় জামিন পাওয়ার পরই অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হচ্ছে। ফলে মুক্তি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।’
জেলা পর্যায়েও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। স্থানীয় আদালতগুলোতে নিয়মিত জামিন আবেদন জমা পড়ছে। তবে মামলার সংখ্যা বেশি এবং অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় আদালত সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন, ফলে অনেক ক্ষেত্রে সময় লাগছে।
সম্প্রতি বেশ কয়েকজন আলোচিত আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতা জামিন পেয়েছেন।
গতকাল সোমবার নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ইডেন মহিলা কলেজ শাখার সভাপতি তামান্না জেসমিন রিভাকে এক মামলায় জামিন দিয়েছেন হাইকোর্ট। বিচারপতি মো. আতোয়ার রহমান ও বিচারপতি মো. সগীর হোসেনের হাইকোর্ট বেঞ্চ তাকে জামিন দিয়ে রুল জারি করেন। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল। জুলাইয়ের ছাত্র আন্দোলনের সময় ক্যাম্পাস ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যান রিভা। এরপর তাকে জনসম্মুখে আর দেখা যায়নি। পরে ২০২৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর রাতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর অভিযোগে তাকে আটক করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
আগের দিন খালাস পান শরীয়তপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক। ২৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে করা মামলায় বেকসুর খালাস দিয়েছেন আদালত। রোববার ঢাকার ১৪তম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মাহমুদা আক্তার এ রায় ঘোষণা করেন। তবে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকায় খালাস পেলেও তার মুক্তি মিলছে না। আসামিপক্ষের আইনজীবী মো. লিটন মিয়া এ তথ্য জানান।
এ ছাড়া বরিশাল-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য জেবুন্নেছা আফরোজ, বরিশাল মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি জসিম উদ্দিন এবং যুবলীগ নেতা মাহমুদুল হক খান মামুন জামিন পেয়েছেন। এ ছাড়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তালুকদার মোহাম্মদ ইউনুসও জামিন পেয়েছেন।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াত আইভীকেও পাঁচটি মামলায় ছয় মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দিয়েছেন হাইকোর্ট। এ ছাড়া রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু এবং সাবেক বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক জামিন পেলেও অন্যান্য মামলায় আটক থাকায় তারা এখনো মুক্ত হতে পারেননি।
গত ১৯ ফেব্রুয়ারি জামিনে কারামুক্ত হয়েছেন ঠাকুরগাঁও-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা দবিরুল ইসলাম। দিনাজপুর জেলা কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি। গ্রেপ্তারের দেড় বছর পর জামিন পান দবিরুল।
দলীয় সূত্র বলছে, আটক নেতাকর্মীদের মুক্তি আওয়ামী লীগের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এজন্য বিভিন্ন জেলায় আইনজীবীদের সমন্বয়ে প্যানেল গঠন করা হয়েছে, যারা মামলাগুলো পরিচালনা করছেন।
তবে দলটির নেতারা মনে করছেন, জামিন প্রক্রিয়া অনেকটাই বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ক্ষমতাসীন বিএনপির অবস্থানের ওপর নির্ভর করছে। যদিও নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় কিছুটা স্বস্তি এসেছে, তবুও দলটি এখনো স্বাভাবিক রাজনীতিতে পুরোপুরি ফিরতে পারেনি। নিরাপত্তা শঙ্কাও রয়ে গেছে।
এ পরিস্থিতিতে আটক নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশ এখন আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় দিন গুনছেন। আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়েই মুক্তি মিলবে এমন আশায় রয়েছেন তারা।
এদিকে আওয়ামী লীগের নেতাদের জামিন পাওয়া এবং নতুন মামলায় গ্রেপ্তারের ঘটনাকে বিশেষজ্ঞরা বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি জটিল রূপ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, একেকটি মামলায় জামিন মিললেও পুরোনো বা নতুন মামলায় আবার গ্রেপ্তার দেখানোর কারণে কারামুক্তি বিলম্বিত হচ্ছে। এ ছাড়া কিছু ক্ষেত্রে নিম্ন আদালতে বিগত সরকারের অনুসারী বিচারকরা জামিন দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে আইনজীবীদের মধ্যে অসন্তোষ ও আদালত বর্জনের ঘটনাও ঘটছে।
অবশ্য বিশিষ্ট রাজনীতি বিশ্লেষক ইকতেদার আহমেদ একটি রিফাইন্ড আওয়ামী লীগের কথা বলছেন। তার মতে, দল হিসেবে আওয়ামী লীগতো অপরাধ করেনি। দলের সবাই তো অপরাধী না। জুলাই আন্দোলনে গণহত্যার সঙ্গে জড়িত দলের প্রধান হিসেবে শেখ হাসিনাও যদি থাকে তাহলে তার অবশ্যই বিচার করতে হবে। তবে যারা অপরাধ করেনি তাদের আওয়ামী লীগের রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়া উচিত।
এ প্রসঙ্গে রাজনীতি বিশ্লেষক গোলাম মওলা রনি মনে করেন, আওয়ামী লীগের যেসব নেতার প্রতি জন-অসন্তোষ তৈরি হয়ে আছে, যারা অন্যায় করেছে তাদের বিচার হওয়া উচিত, তাদের শাস্তির আওতায় আনা উচিত। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে দেশে যে রাজনৈতিক দলগুলো আছে তাদের কর্মকাণ্ড, তাদের মধ্যে বিভক্তিসহ সবকিছু মিলিয়ে আওয়ামী লীগ ফেরার প্রাসঙ্গিকতা দেখা যাচ্ছে।
কেকে/ এমএস