মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      চীন পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, তেল রপ্তানিতে সুখবর      এবার পাঁচ জেলায় বিজিবি মোতায়েন      
দেশজুড়ে
সেন্টমার্টিনে সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে হাজারো কর্মহীন মানুষের কান্না
আবদুল্লাহ আল সম্রাট, টেকনাফ (কক্সবাজার)
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:৫৮ পিএম
ছবি: প্রতিনিধি

ছবি: প্রতিনিধি

বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে পর্যটন কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়ায় স্থানীয় মানুষের জীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ। একসময় পর্যটকদের পদচারণায় মুখর থাকা দ্বীপটি এখন অনেকটাই নীরব, আর সেই নীরবতার সবচেয়ে বেকারত্ব বড় বোঝা বহন করছেন এখানকার সাধারণ মানুষ। 

সেন্টমার্টিনের বর্তমান সমস্যার মধ্যে রয়েছে- দিন দিন বেকারত্ব বাড়ছে, পর্যটক সীমিত, হোটেল রেস্তোরাঁ বন্ধ, পর্যটন ব্যবসায়ীরা ঋণগ্রস্ত, বিদ্যুতের চরম সংকট, চিকিৎসা সেবার বেহাল দশা, জেলেদের নিরব কান্না, মাছ ধরতে গেলে আরাকান আর্মির নির্যাতন, কর্মহীন শ্রমজীবী মানুষ, যাতায়াত ব্যবস্থা চরম ঝুঁকি, অভাব অনটনে রয়েছে দ্বীপবাসী- এই যেন দ্বীপবাসীর নিরব কান্না।

সরকারের পরিবেশ সুরক্ষামূলক পদক্ষেপের অংশ হিসেবে বছরের দীর্ঘ সময় পর্যটন বন্ধ বা সীমিত রাখার সিদ্ধান্তে দ্বীপের অর্থনীতি বড় ধাক্কা খেয়েছে। বিশেষ করে হোটেল-রিসোর্ট, রেস্টুরেন্ট, নৌযান শ্রমিক, গাইড, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও জেলেরা এখন কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।  

স্থানীয়দের অভিযোগ, পর্যটন মৌসুমে আগে ৬ মাস পর্যটক আসায় যে আয় হতো তা দিয়ে বছরের বাকি সময় সংসার চলত, এখন তা প্রায় বন্ধ। বর্তমান ২ মাস পর্যটক আসায় পর্যটন ব্যবসায়ীরা চরম সংকটে রয়েছে। পাশাপাশি, সব শ্রেণির শ্রমজীবীরাও কষ্টে দিন যাপন করছে। কেউ ধার-দেনা করে দিন পার করছেন, আবার কেউ বাধ্য হয়ে বিকল্প কাজের সন্ধানে মূল ভূখণ্ডে পাড়ি জমাচ্ছেন। এককথায় কর্মহীনতায় সেন্টমার্টিন দ্বীপে বর্তমান বেকারত্ব দিন দিন বাড়ছে। 

দ্বীপের এক বাসিন্দা জানান, আগে প্রতিদিন পর্যটক আসত, দোকান ভালো চলত। এখন দিন শেষে বিক্রি বলতে কিছুই নেই। সংসার চালানো খুব কষ্ট হয়ে গেছে।

শুধু ব্যবসায়ী নয়, পর্যটননির্ভর শ্রমজীবী মানুষেরাও সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন। পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় নৌকার মাঝি ও শ্রমিকদের আয় প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। বহু হোটেল ও কটেজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কর্মচারীরাও বেকার হয়ে পড়েছেন।  

পরিবেশবিদরা বলছেন, ‘দ্বীপের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় নিয়ন্ত্রণ জরুরি হলেও স্থানীয় মানুষের জীবিকার বিষয়টিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। বিকল্প কর্মসংস্থান, ক্ষুদ্র ঋণ সহায়তা ও মৎস্যজীবীদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা ছাড়া এই সংকট আরও গভীর হতে পারে।’

সেন্টমার্টিন আজ যেন প্রকৃতি রক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও মানুষের জীবিকার টানাপোড়েনের এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি-যেখানে নীল সমুদ্রের সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে হাজারো কর্মহীন মানুষের নীরব কান্না।

এদিকে, সেন্টমার্টিনে হাসপাতাল ও চিকিৎসা সেবার সংকট দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। প্রায় ১০ হাজার বাসিন্দা ও পর্যটকদের জন্য একমাত্র ভরসা ২০ শয্যার হাসপাতালটি দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসক সংকট, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাব ও ওষুধের স্বল্পতায় কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।  

সেন্টমার্টিন দ্বীপের স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি হাসপাতাল থাকলেও সেখানে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও আধুনিক সেবার অভাবে রোগীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বর্তমানে হাসপাতালের কার্যক্রম অনেকটাই এনজিও নির্ভরভাবে কোনোরকম চলছে। প্রাথমিক কিছু সেবা মিললেও জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের দ্রুত টেকনাফ বা কক্সবাজারে পাঠাতে হয়।

বিশেষ করে রাতের বেলা, খারাপ আবহাওয়া কিংবা জরুরি মুহূর্তে অসুস্থ রোগীদের জন্য পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। অনেক সময় রোগীকে সাগরপথে মূল ভূখণ্ডে নিতে গিয়ে দেরি হওয়ায় জীবনঝুঁকি তৈরি হয়।

দ্বীপের বাসিন্দা মামুনুর রশীদ বলেন, ‘হাসপাতাল আছে, কিন্তু ভালো ডাক্তার নেই। সামান্য অসুখেও টেকনাফ যেতে হয়। ৫০ শয্যার হাসপাতাল ও এমবিবিএস ডাক্তার নিয়োগ হলে দ্বীপবাসীর অনেক কষ্ট কমবে। সেন্টমার্টিনের মতো দ্বীপে উন্নত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা শুধু একটি দাবি নয়, বরং এটি স্থানীয় মানুষের মৌলিক অধিকার। সরকারি ও এনজিওর মাধ্যমে হলেও দ্বীপ বাসীর জন্য উন্নত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত জরুরি মনে করছি।’

‘দ্বীপের প্রায় হাজারো মানুষের চিকিৎসা নিশ্চিতে বর্তমান ২০ শয্যার হাসপাতালকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা এবং সেখানে স্থায়ী এমবিবিএস ডাক্তার নিয়োগ এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি জরুরি বিভাগ, প্রসূতি সেবা, শিশু চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে সেন্টমার্টিনের চিকিৎসা সেবার মান উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।’

সেন্টমার্টিন বিচ ইকো রিসোর্টের মালিক মো. জসিম উদ্দিন শুভ বলেন, ‘বর্তমানে সেন্টমার্টিনে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জীবনে চরম দুর্ভিক্ষ ও মানবিক সংকট নেমে এসেছে। দ্বীপবাসীর এই দুরবস্থার বর্ণনা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।পর্যটন নির্ভর এ জনপদে দীর্ঘদিন ধরে পর্যটক আগমন কমে যাওয়ায় স্থানীয় ব্যবসায়-বাণিজ্য প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। এর ফলে হোটেল-রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দিনমজুর, চায়ের দোকানি, জেলে ও সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ- সবাই আজ গভীর অর্থনৈতিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন।’

তিনি আরও বলেন, সেন্টমার্টিনের পর্যটননির্ভর অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো হোটেল ও রিসোর্ট ব্যবসায়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্বীপের হোটেল মালিকরা চরম দুর্দশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। একসময় পর্যটকদের কোলাহলে মুখর থাকা হোটেলগুলো এখন প্রায় ফাঁকা পড়ে আছে। কক্ষগুলোতে নেই বুকিং, নেই আগের মতো অতিথিদের আনাগোনা। ফলে আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মালিকদের মাথায় যেন নেমে এসেছে এক অদৃশ্য বোঝা। অনেক হোটেল মালিক ব্যাংক ঋণ, এনজিও ঋণ কিংবা ব্যক্তিগত ধার-দেনা করে ব্যবসায় গড়ে তুলেছিলেন। পর্যটক না থাকায় সেই ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা- এখন তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। মাসের পর মাস বিদ্যুৎ বিল, কর্মচারীদের বেতন, রক্ষণাবেক্ষণ খরচ এবং অন্যান্য ব্যয় বহন করতে গিয়ে তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।’

হোটেল মালিকরা জানান, বছরের এই সময়টাতে সাধারণত যে আয় হয়, তা দিয়েই পুরো বছরের অনেকটা ব্যয় সামাল দেওয়া সম্ভব হতো। কিন্তু এবার পর্যটক সংকটের কারণে তাদের স্বপ্ন ও পরিকল্পনা ভেঙে পড়েছে। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে কর্মচারী ছাঁটাই করেছেন, আবার কেউ হোটেল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন। হোটেল আছে, রুম আছে, কিন্তু অতিথি নেই,ব্যবসা আছে, কিন্তু আয় নেই।সেন্টমার্টিনের এই পর্যটন খাতের স্থবিরতা শুধু হোটেল মালিকদের নয়, বরং দ্বীপের সামগ্রিক অর্থনীতিকেও ভয়াবহ সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

এই সংকটময় ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও দ্বীপের জেলেদের জীবনে নেই কোনো স্বস্তি বা শান্তি। জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগরে মাছ ধরতে যেতে হচ্ছে তাদের। কিন্তু সাগরে গেলেই নতুন করে নেমে আসে আতঙ্কের ছায়া। অভিযোগ রয়েছে, মাছ ধরতে গিয়ে অনেক জেলে আরাকান আর্মির হাতে নির্যাতন, ভয়ভীতি ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

স্থানীয় জেলেদের ভাষ্যমতে, সাগরে মাছ ধরতে গেলে প্রায়ই তাদের নৌকা থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ, মারধর, এমনকি নৌকাসহ আটক করে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে। এতে করে পরিবার-পরিজনের মুখে আহার তুলে দেওয়ার সংগ্রাম আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। 

একদিকে সেন্টমার্টিনে পর্যটন খাতের স্থবিরতা, অন্যদিকে জেলেদের ওপর এমন নির্যাতন- সব মিলিয়ে দ্বীপবাসীর জীবন যেন চরম অনিশ্চয়তা ও দুর্ভোগের মধ্যে নিমজ্জিত।

জেলেরা বলেন, ‘পেটের দায়ে সাগরে যেতে হয়। কিন্তু কখন ফিরে আসতে পারবো তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। আমাদের এই আতঙ্ক ও অসহায়ত্ব শুধু একটি পেশাজীবী শ্রেণির দুর্দশা নয়, বরং পুরো দ্বীপের মানবিক সংকটের দৃশ্যপট।’ 

কেকে/এমএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  সেন্টমার্টিন   সৌন্দর্যের আড়াল   লুকিয়ে আছে   কর্মহীন মানুষের কান্না  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

দেশজুড়ে- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close