ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট। দেড় যুগের আন্দোলন-সংগ্রামের ফল হিসেবে পাওয়া এ সাফল্যকে ঘিরে দলটির তৃণমূলে স্বস্তির পাশাপাশি নতুন করে দেখা দিয়েছে অস্বস্তি ও অসন্তোষ।
অভিযোগ উঠেছে, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বিএনপি সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের ঘনিষ্ঠ বলয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীরা ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন। এতে তৃণমূল পর্যায়ে ক্ষোভ বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে দলের সাংগঠনিক শক্তির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা।
স্থানীয় নেতাকর্মীরা বলছেন, বিএনপি সরকারের মন্ত্রী ও এমপির সঙ্গে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা যোগাযোগ বাড়াচ্ছে। তাদের উদ্দেশ্য—প্রশাসনিক সুবিধা নেওয়া, মামলা-মোকদ্দমা থেকে রেহাই পাওয়া কিংবা ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা করা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিএনপি নেতা বলেন, ‘রাজনীতিতে এখন বাস্তবতা বড় বিষয়। অনেকেই নিজেদের অবস্থান সুরক্ষিত রাখতে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।’
দলের ভেতরে এ ধরনের প্রবণতা বিএনপির সাংগঠনিক ঐক্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন তৃণমূলের নেতারা। তারা বলছেন, ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের অবমূল্যায়ন করলে সংগঠনের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়বে। তাদের দাবি, ‘যারা দুঃসময়ে পাশে ছিল, তাদের যদি মূল্য না দেওয়া হয়, তাহলে সংগঠন টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।’
মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত কয়েক মাসে বিভিন্ন এলাকায় বিএনপির রাজনীতিতে নতুন করে সক্রিয় হয়েছেন এমন কিছু ব্যক্তি, যাদের অতীত রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ছিল আওয়ামী লীগের সঙ্গে। স্থানীয়ভাবে তারা প্রভাবশালী বিএনপি নেতা বা সরকারঘনিষ্ঠ মন্ত্রী-এমপিদের আশ্রয়ে সংগঠনের ভেতরে জায়গা করে নিচ্ছেন।
সিলেট বিভাগের বেশ কয়েকজন ছাত্রদল ও যুবদল নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকা নেতাকর্মীরা এখন মূল্যায়ন পাচ্ছেন না। বরং যারা বিগত সময়ে মাঠে সক্রিয় ছিলেন না, কিংবা সুযোগ বুঝে দল পরিবর্তন করেছেন—তাদেরই গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর পাঁয়তারা করা হচ্ছে।
একজন ছাত্রদল নেতা বলেন, ‘আমরা যখন রাজপথে ছিলাম, তখন অনেকেই ছিল না। এখন তারাই এসে বড় বড় পদ দখল করার চেষ্টা করছে। এতে ত্যাগীদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।’
একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে রংপুর বিভাগ থেকেও। সেখানকার একাধিক নেতাকর্মী জানান, স্থানীয় পর্যায়ে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকেও এখন বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হচ্ছেন।
অভিযোগ উঠেছে, আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় না থাকা সুবিধাবাদী ও ‘হাইব্রিড’ নেতারাই এখন দলীয় পদ-পদবি দখল করে নিচ্ছেন। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের একাংশ সুযোগ বুঝে বিএনপিতে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছে। এসব অনুপ্রবেশকারীদের দলে জায়গা করে দিতে বিএনপির ভেতরের কিছু সুবিধাভোগী নেতা সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন এবং নিজেদের শক্ত বলয় তৈরি করতেই তারা এমন সুযোগ দিচ্ছেন।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যশোর জেলা যুবদলের এক নেতা বলেন, প্রত্যেক জায়গায় হাইব্রিড ও গ্রুপিং রয়েছে। দলের ভেতরে এখন বিশৃঙ্খলা দেখতে পাচ্ছি। কিছু সুবিধাবাদী দেখতে পাচ্ছি। এসব সুবিধাবাদীরা ত্যাগীদের বিতাড়িত করতে চায়। দলের অনেক নেতা ত্যাগ স্বীকার করেছেন। কুষ্টিয়া উপজেলা ছাত্রদলের এক নেতা বলেন, আমরা অনেক মামলা-হামলার শিকার হয়েছি। দলের দুঃসময়ে যারা ছিলেন না, সেসব সুবিধাবাদীরা এখন বিএনপিতে ভালো জায়গায় আছে। তবে বিএনপি শীর্ষ নেতারা দাবি করেছেন যে, পুনর্গঠন প্রক্রিয়াতে পরীক্ষিত ও ত্যাগী কর্মীরা বাদ পড়বেন না। কিন্তু বাস্তব চিত্র অনুযায়ী, অনেক ত্যাগী নেতা এখনো যথাযথ মূল্যায়ন থেকে বঞ্চিত।
স্থানীয় নেতাকর্মীরা বলেন, দীর্ঘ দেড় যুগ আন্দোলনের ময়দানে ছিলেন না, কোনো মামলা-হামলা বা নির্যাতনের মুখেও পড়েননি, ঘরছাড়াও হতে হয়নি। অতীত দিনে ব্যবসা-বাণিজ্যে যুক্ত ছিলেন, সরকারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলেছেন। এখন তারা বিএনপির তৃণমূল দলে দাপুটে ‘হর্তাকর্তা’ হিসেবে স্থান করে নিয়েছেন। এদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন নব্য বিএনপি নামধারী কিছু নেতা। আবার কিছু অভিজ্ঞ নেতা দলকে ভারী করতে আওয়ামী লীগের পক্ষপাতদুষ্ট ও নিষ্ক্রিয় ব্যক্তিদেরও দলে ভিড়াচ্ছেন। তারা এখন ত্যাগী নেতাকর্মীদের ওপর প্রভাব দেখাচ্ছেন।
বিএনপি নেতাকর্মীরা জানান, দলীয় কার্যালয় ছাড়াও সর্বত্র তাদের ব্যানার ও পোস্টার শোভা পাচ্ছে। বিভিন্ন নেতার বাসা ও অফিসে পদচারণা বেড়েছে, সঙ্গে ভিড় করছেন বিভিন্ন লবিং ও তদবিরকারীরা। অন্যদিকে, দীর্ঘ ১৭ বছর রাজপথে থাকা, মামলা-হামলায় সর্বস্বান্ত হওয়া, পঙ্গুত্ব ভোগ করা, ঘরছাড়া নেতাকর্মীরা এখন ‘অসহায়’। হাইব্রিড নেতাদের চাপের কারণে তারা দলীয় কার্যালয় ও নেতাদের বাসায় যাওয়া এড়িয়ে চলছেন। অনেকেই অহেতুক মিথ্যা অভিযোগে বহিষ্কারের ভয় দেখিয়ে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছেন।
নেতারা জানান, বিএনপির পক্ষ থেকে কঠোর নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও কিছু নেতা কায়দা-কানুনে দলের দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে আখের গোছানোর চেষ্টা করছেন। এসব নেতাকর্মী দেশের বিভিন্ন এলাকায় অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছেন। চতুর প্রকৃতির হাইব্রিড নেতারা সুযোগ বুঝে সটকে গেলেও বিএনপির কিছু নেতাকর্মী ধরা পড়ছেন এবং তাদের অপকর্মের দায়ে বহিষ্কৃত হতে হচ্ছে। এদিকে ছাত্রলীগের কিছু নেতা আত্মগোপনে থেকেও দখলদারত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করছেন। বহিষ্কারের আতঙ্কে বিএনপির নেতাকর্মীরা নিষ্ক্রিয় থাকলেও দখলবাজ ছাত্রলীগের নেতারা পুনরায় সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। অনেক এলাকায় তারা নতুনভাবে পুনর্বাসিত হচ্ছেন।
বরিশাল জেলা বিএনপির নেতাকর্মীরা জানাচ্ছেন, ৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের পর মহানগর বিএনপির কয়েকজন নেতার নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে নথুল্লাবাদ বাসস্ট্যান্ড, রূপাতলী বাসস্ট্যান্ড, লঞ্চঘাট ও চৌমাথা বাজার। এর মধ্যে নথুল্লাবাদ বাসস্ট্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন মোশারফ হোসেন। তিনি একসময় মহানগর বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও গত সময়ে মাঠে দেখা যায়নি।
শুধু বরিশাল নয়, দলের বিভিন্ন ইউনিটে অনেক নেতা আছেন, যাদের অতীতে কারাগারে যেতে হয়নি বা কোনো নির্যাতন সইতে হয়নি; তারাই এখন দাপুটে হর্তাকর্তা। ব্যবসা-বাণিজ্যসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তারা নিয়ন্ত্রণ করছেন। অন্যদিকে, যারা মামলা-হামলায় ধ্বংসের কিনারায় ছিলেন, তারা এখন পদ-পদবি হারানোর আশঙ্কায় রয়েছেন।
বরিশাল জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের এক শীর্ষ নেতা বলেন, দলের শেল্টারে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা আগের মতোই ব্যবসা-বাণিজ্য করছেন, আর বিএনপি নেতাকর্মীরা এখনো আর্থিক কষ্ট ও মানবেতর জীবনযাপন করছেন। নেতাকর্মীরা জানান, বিগত বছরগুলোতে যারা পরিবার, আত্মীয়স্বজন বা বন্ধু-বান্ধবের সহায়তায় কর্মসূচি চালাতেন, মামলা পরিচালনা করতেন, তারা এখন দলের সুদিন আসবে বলে ওই সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। ফলে তাদের কষ্ট আরও বেড়েছে।
এদিকে সুবিধাবাদীরা দাপুটে হয়ে উঠেছেন। আওয়ামী লীগ যখন পালিয়ে গেছে, তখন তারা বাসস্ট্যান্ড, বাজার ও বন্দর দখল করেছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা—যেমন এলজিইডি, সওজ, ওয়াসাসহ অন্যান্য স্থানে আওয়ামী লীগের শূন্যস্থান পূরণ করেছেন। এসব স্থানে বিএনপির ত্যাগী নেতারা নিয়মমাফিক ব্যবসা বা ঠিকাদারি করতে গেলেও তাদের ওপর দখলের অভিযোগ তোলা হচ্ছে, যার ফলে অনেকেই বিপদে পড়ছেন এবং বহিষ্কৃত হচ্ছেন। এ পরিস্থিতিতে ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীরা এসব প্রতিষ্ঠান এড়িয়ে চলছেন।
বগুড়ার ধুনট বিএনপির নেতাকর্মীরা জানাচ্ছেন, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকর্মী রং পাল্টে বিএনপি হয়ে এখন দাপট দেখাচ্ছেন।
কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির নেতাকর্মীরা বলেন, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয় থাকা শেখ সাদী গত নির্বাচনে কুষ্টিয়া-৪ আসনে সংসদ সদস্য হিসেবে এলাকায় শোডাউন করেছিলেন। স্থানীয় নেতাদের দাবি, শেখ সাদী এখন নব্য বিএনপি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন এবং পূর্বে স্থানীয় বিএনপির রাজনীতিতে তাকে দেখা যায়নি।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর বিএনপির নেতাকর্মীরা জানান, ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ফুলের তোড়া দিয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়া বিএনপি নেতা সাদেকুর রহমান সাদেম, আবদুর রাজ্জাক, মুজিবুর রহমান, আবদুল আলিমসহ অন্য নেতারা এখন আবার বিএনপির কর্মসূচিতে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন।
চট্টগ্রামের বন্দর নগরীতে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিএনপির দুঃসময়ে দল পরিচালনা করা ত্যাগী নেতারা এখন সরকার পরিবর্তনের পর অবহেলার শিকার হয়েছেন। চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বলছেন, কঠিন সময়ে যারা তৃণমূলের নেতাকর্মীদের পাশে ছিলেন এবং জেল, জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তারা এখন কোণঠাসা। অন্যদিকে, গত সময়ে আন্দোলনের ময়দানে না থেকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে ব্যবসা-বাণিজ্য চালিয়ে অনেক অর্থ-সম্পদ অর্জন করা ‘টাকাওয়ালা হাইব্রিড’ নেতারা এখন দলের মধ্যে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছেন। তাদের দাপটে ত্যাগী নেতারা দলীয় কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হতে পারছেন না।
তৃণমূলের নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেছেন, চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির গঠিত আহ্বায়ক কমিটিতে যেসব সদস্য স্থান পেয়েছেন, তাদের বেশির ভাগই বিগত সরকারের সময়ে দলের মিছিল-মিটিংয়ে কম উপস্থিত থাকতেন এবং তাদের নামে কোনো মামলা ছিল না।
কেকে/এজে