মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      চীন পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
দেশজুড়ে
খোলা কাগজের মৌলভীবাজার জেলার স্টাফ রিপোর্টারের বিরুদ্ধে বিএনপি নেতার মামলা
নিজস্ব প্রতিবেদক, মৌলভীবাজার
প্রকাশ: বুধবার, ৮ এপ্রিল, ২০২৬, ৮:১৫ এএম
ছবি: প্রতিনিধি

ছবি: প্রতিনিধি

সংবাদ প্রকাশের জেরে ক্ষুব্ধ হয়ে দৈনিক খোলা কাগজের মৌলভীবাজার জেলার নিজস্ব প্রতিবেদক মো. এহসানুল হকের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন শ্রীমঙ্গল পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির ৫ নম্বর সদস্য আলতাফুর রহমান ওরফে নাজমুল হাসান। বিষয়টি ঘিরে সাংবাদিক মহলে ব্যাপক উদ্বেগ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

গত সোমবার (৬ এপ্রিল) বিজ্ঞ যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ (চিফ লিগ্যাল এইড অফিসার)-এর মৌলভীবাজার আদালতে এ মামলা করেন তিনি। আগামী ১৪ মে তাঁকে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

জানা গেছে, গত বছরের ২৬ অক্টোবর খোলা কাগজে “আলতাফুরের কাছে জিম্মি এলাকাবাসী” শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ হয়। ২০২৫ সালের ২৫ অক্টোবর রাতে আশিদ্রোন আইযুব আলী মার্কেটের সামনে সড়কে আলতাফুর রহমানের বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে উপজেলার আশিদ্রোন ইউনিয়নের চারটি গ্রামের বাসিন্দাদের উদ্যোগে বিশাল প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

এ সভায় আলতাফুরের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, প্রতারণা, নানাভাবে জিম্মি করা ও হয়রানির শিকারের বিষয়গুলো ভুক্তভোগীরা তুলে ধরেন। প্রকাশিত সংবাদে প্রতিবাদ সভায় প্রাপ্ত ভুক্তভোগীদের নানা অভিযোগ বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষভাবে তুলে ধরা হয়। প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রতিবেদকের ব্যক্তিগত কোনো মতামত বা পক্ষপাতিত্ব ছিল না; বরং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যই যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

প্রতিবেদক জানিয়েছেন, এ সংবাদ প্রকাশের পর ওই প্রতিবেদকসহ আরেক গণমাধ্যমকর্মীকে টাকার বিনিময়ে তার পক্ষে একটি সংবাদ প্রকাশের অনুরোধ করেন আলতাফুর রহমান। কিন্তু সাংবাদিক এহসান তার এমন অন্যায়-অনৈতিক অনুরোধ না রাখায় ক্ষুব্ধ হয়ে গত ৪ মার্চ ফেসবুকে আলতাফুর রহমান খোলা কাগজের প্রতিবেদকের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা, ভিত্তিহীন এবং মানহানিকর পোস্ট করেন। সর্বশেষ গত ৪ এপ্রিল শহরের ব্যবসায়ী আশরাফুল ইসলাম লিয়াকতকে প্রধান আসামি করে এবং খোলা কাগজের প্রতিবেদককে ২ নম্বর আসামি করে, সরকারি কর্মকর্তা, কর্মচারী, কৃষকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার স্থানীয় আরও ১৫ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা দায়ের করা হয়।

এদিকে একজন পেশাদার, বস্তুনিষ্ঠ, নির্ভীক সংবাদকর্মী, লেখক, কলামিস্ট, শিক্ষক ও সংগঠক এহসান বিন মুজাহিরের বিরুদ্ধে মামলার ঘটনাকে সাংবাদিক মহল গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর চরম হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ স্বাধীন সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে এবং ভবিষ্যতে সাংবাদিকদের মধ্যে ভীতি তৈরি করতে পারে।

সাংবাদিক সমাজের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, একজন পেশাদার গণমাধ্যমকর্মীর বিরুদ্ধে এ ধরনের মামলা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং অগ্রহণযোগ্য। এটি কেবল একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, বরং সমগ্র সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর আঘাত। তারা অবিলম্বে এ মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন এবং ভবিষ্যতে সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের হয়রানি না করার আহ্বান জানিয়েছেন।

সচেতন মহল মনে করে, একটি গণতান্ত্রিক সমাজে মুক্ত ও স্বাধীন সাংবাদিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই গণমাধ্যমকর্মীদের বিরুদ্ধে অযৌক্তিক পদক্ষেপ পরিহার করে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।

এ বিষয়ে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। সাংবাদিকবৃন্দ ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তীব্র নিন্দা ও মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে পোস্ট করছেন। একই সঙ্গে বাদীর উপযুক্ত বিচার চেয়েছেন।

বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশের জেরে একজন সাংবাদিকের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হওয়া স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর সরাসরি আঘাত বলে মনে করছেন অনেকে।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার ঘটনাকে সংশ্লিষ্ট মহল গভীর উদ্বেগের সঙ্গে দেখছেন। জেলায় কর্মরত সাংবাদিকরা বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন।

তারা বলেন, এমন পরিস্থিতিতে একজন দায়িত্বশীল ও প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরকে অনেকেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর হুমকি হিসেবে দেখছেন। সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্ত করতে মামলা দায়ের একটি দুরভিসন্ধিমূলক কৌশল, যা মুক্ত গণমাধ্যমের পথ রুদ্ধ করতে পারে।

মৌলভীবাজার জেলার বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন এ বিষয়কে সাংবাদিক হয়রানি হিসেবে আখ্যায়িত করে নিন্দা জানিয়েছে। তারা মামলাটি প্রত্যাহারের দাবি জানান এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষায় একত্রিত থাকার আহ্বান জানান।

শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবুল ফজল আব্দুল হাই ডন ও সাধারণ সম্পাদক ইয়াছিন আরাফত রবিন বলেন, ‘হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে সংবাদ প্রকাশের ৬ মাস পর এই মামলা করেছেন আলতাফুর রহমান ওরফে নাজমুল হাসান। এটি বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা ও স্বাধীন গণমাধ্যমের প্রতি হুমকি। অবিলম্বে এই মামলা প্রত্যাহার করা না হলে কঠোর আন্দোলনে নামবেন সংবাদকর্মীরা।’

এ বিষয়ে সাংবাদিক মো. এহসানুল হক জানান, তথ্য-উপাত্ত নিয়েই সংবাদ প্রচার করা হয়েছে। প্রথম সারির গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের কোনো ডকুমেন্ট থাকবে না—এটা কীভাবে সম্ভব? সিরিজ আকারে অনুসন্ধানী রিপোর্টে আলতাফুর রহমানের সব অপকর্ম তুলে উপস্থাপন করা হবে।

তিনি আরও বলেন, ‘অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে আলতাফ একজন মামলাবাজ। তার অন্যায়, দুর্নীতি ও অপকর্ম নিয়ে কেউ প্রতিবাদ করলেই মামলা দিয়ে হয়রানি করে। এলাকাবাসী, স্থানীয় প্রশাসনসহ কেউই তার কাছে নিরাপদ নয়। বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে গিয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, হামলার চেষ্টা, অনৈতিক আবেদন—বিশেষ করে আশিদ্রোন ইউনিয়নের চার গ্রামের মানুষ নানাভাবে তার কাছে জিম্মি। সাবেক কৃষিমন্ত্রীর স্বাক্ষর জালিয়াতি করে সে দীর্ঘদিন জেলহাজতে ছিল। তার বিরুদ্ধে সরকারি বই বিক্রি, স্কুলের নামে প্রতারণা, কৃষি প্রণোদনা, বয়স্ক ভাতার নামে এনআইডি কার্ড নিয়ে প্রতারণাসহ নানা অনিয়মের অভিযোগের পাহাড়। এলাকাবাসী তার বিরুদ্ধে অতিষ্ঠ।’

মামলার একাধিক সাক্ষীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই মামলার বিষয়ে কেউই জানেন না। তারা কোন মামলার সাক্ষী—এটাও অনেকে বলতে পারেননি। এছাড়া মামলার সাক্ষী দেওয়া হয়েছে ১৪ বছরের স্কুলছাত্র, তার ভাই-ভাতিজা ও আত্মীয়স্বজনকে।

অপরদিকে আলতাফুর রহমান ওরফে নাজমুল হাসানকে মুঠোফোনে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে যে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং বানোয়াট। এলাকার কয়েকটি গ্রাম মিলে প্রতিবাদ সভা করে তারা আমার বিরুদ্ধে সাংবাদিক এহসানুল হককে দিয়ে মিথ্যা সংবাদ প্রকাশ করিয়েছে।’

অন্যদিকে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে তীব্র নিন্দা প্রকাশ করছেন। তারা এটিকে একটি মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা উল্লেখ করে অবিলম্বে তা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে শ্রীমঙ্গল উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক নুরুল আলম সিদ্দিকী বলেন, ‘আলতাফুর রহমান ওরফে নাজমুল হাসানের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ এসেছে। একসময় সে আওয়ামী লীগে ছিল। কোনো সময় বিএনপির কোনো কর্মকাণ্ডে তাকে দেখিনি। সে আমাদের পৌর আহ্বায়ক কমিটিতে কীভাবে স্থান পেল—বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ আসায় সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সাংবাদিকরা বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ লিখবে। সংবাদের জেরে অন্যায় মামলা কাম্য নয়। প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তর, দলীয় নেতাকর্মীসহ সবাই আমরা বলব তাকে বয়কট করতে।’

শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইসলাম উদ্দিন বলেন, ‘সাংবাদিকসহ কয়েকজন ব্যক্তির ওপর হয়রানিমূলক মামলার বিষয়টি শুনেছি। আলতাফ নামে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে আমাদের কাছে আরও অনেক অভিযোগ জমা হয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  খোলা কাগজ   মৌলভীবাজার   জেলা   বিএনপি   মামলা  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

দেশজুড়ে- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close