প্রযুক্তিনির্ভর এই ব্যস্ত সময়ে যখন শিশুরা ক্রমেই পর্দাবন্দি জীবনে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে, ঠিক তখনই প্রকৃতি আর ঐতিহ্যের কাছে ফেরার এক নির্মল আয়োজন—চড়ুইভাতি। বই-খাতা আর নিয়মমাফিক ক্লাসরুমের গণ্ডি পেরিয়ে খোলা আকাশের নিচে এমন দিন যেন শিশুদের জন্য এক অন্যরকম মুক্তির স্বাদ।
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার শতবর্ষী বিদ্যাপীঠ আজিমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত চড়ুইভাতি অনুষ্ঠানটি তাই হয়ে ওঠে এক আনন্দঘন অভিজ্ঞতা।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) দুপুরে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণজুড়ে দেখা যায় উৎসবের আমেজ—রঙিন পোশাকে সেজে ওঠা শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাস, হাসি আর কোলাহলে মুখর পুরো পরিবেশ।
দিনের শুরুতেই শিক্ষার্থীরা দলবেঁধে নেমে পড়ে নানা প্রস্তুতিতে। কেউ রান্নার উপকরণ গোছাচ্ছে, কেউ সবজি কাটছে, আবার কেউ চুলা জ্বালিয়ে রান্নায় ব্যস্ত। বড়দের তত্ত্বাবধানে নিজেরা রান্না করে খাওয়ার এই অভিজ্ঞতা তাদের কাছে যেমন নতুন, তেমনি রোমাঞ্চকর।
খাওয়া-দাওয়ার পাশাপাশি দিনভর চলে নানা ধরনের খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক আয়োজন। দৌড়ঝাঁপ, লুকোচুরি, দড়ি লাফ, ফুটবল থেকে শুরু করে বেলুন পাসিং, ঝুড়িতে বল নিক্ষেপ, কুইজ, ছড়া-কবিতা আর কৌতুক- সব মিলিয়ে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে পুরো আয়োজন। গানের তালে তালে শিক্ষার্থীরা মেতে ওঠে আনন্দে, তৈরি হয় এক আন্তরিক মিলনমেলা।
শুধু শিশুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি এই আনন্দ। শিক্ষকরাও যেন ফিরে যান তাদের শৈশবের দিনগুলোতে। অভিভাবক ও এলাকার সুধীজনদের উপস্থিতি পুরো আয়োজনকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
অনুষ্ঠানের অতিথি নুরুল আমীন সোহেল ও হোসাইন বাবু বলেন, ‘এ ধরনের আয়োজন আমাদের জন্য সত্যিই আনন্দদায়ক। ব্যস্ত জীবনের মাঝে এমন মুহূর্ত খুব কমই পাওয়া যায়। আজকের আয়োজন প্রত্যাশার চেয়েও বেশি সুন্দর হয়েছে।’
শিক্ষার্থী হুমায়রা জান্নাত ও অপরাজিতা জানায়, এই দিনটির জন্য আমরা সারা বছর অপেক্ষা করি। খেলাধুলা, খাওয়া-দাওয়া আর গান-বাজনায় দিনটা কেটে যায় খুব আনন্দে। আমরা চাই, এমন আয়োজন সবসময় থাকুক।
এই আয়োজনের আরেকটি বিশেষ দিক ছিল প্রবাসীদের অংশগ্রহণ। সুন্দরপুর প্রবাসী পরিষদের নেতৃবৃন্দ এতে যোগ দিয়ে জানান, প্রবাসে বসে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন আয়োজন দেখলে তারা শৈশবের স্মৃতি ভীষণভাবে অনুভব করেন। তাঁরা বলেন, প্রবাস জীবনে আমরা এসব মুহূর্ত খুব মিস করি। এই চড়ুইভাতিতে অংশ নিতে পেরে মনে হয়েছে যেন শেকড়ে ফিরে এসেছি। এটি আমাদের জন্য গর্বের এবং আবেগের।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. জিয়াউদ্দিন চৌধুরী জানান, গ্রামবাংলার ঐতিহ্য শিক্ষার্থীদের মাঝে তুলে ধরতেই প্রতিবছর এই চড়ুইভাতির আয়োজন করা হয়।
গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে জীবন্ত করে তোলার এই আয়োজন তাই শুধুই একটি অনুষ্ঠান নয়- এটি আনন্দ, শিক্ষা ও সংস্কৃতির এক অনন্য সম্মিলন।
প্রধান শিক্ষক মো. সলিমুল্লাহ বলেন, ‘চড়ুইভাতি আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ২০০৮ সাল থেকে আমরা এই আয়োজন করে আসছি। এতে শিশুদের মানবিক, সামাজিক ও নান্দনিক বিকাশ ঘটে।’
কেকে/এমএ