মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলাকাগজ স্পেশাল
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে থাকছে না দলীয় প্রতীক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৬, ৮:৩২ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও সময়োপযোগী করতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে থাকছে না দলীয় প্রতীক। 

জাতীয় সংসদে কণ্ঠভোটে পাস হওয়া স্থানীয় সরকার সংশোধন বিল ২০২৬-এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় নয়, সাধারণ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন প্রার্থীরা। বিশ্লেষকদের মতে, এ সিদ্ধান্ত স্থানীয় পর্যায়ে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি যোগ্য নেতৃত্ব বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। 

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) সংশোধন বিল-২০২৬, স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) সংশোধন বিল-২০২৬ এবং স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) সংশোধন বিল-২০২৬ পাস হয়। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রীর পক্ষে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বিলগুলো সংসদে উত্থাপন করেন। পরে কণ্ঠভোটে এগুলো পাস হয়। 

বিলটির ওপর ভোটাভুটির সময় বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা এর বিরোধিতা করে না ভোট দেন। এ সময় জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সংসদে দাঁড়িয়ে ওয়াকআউটের ঘোষণা দেন। তবে অধিবেশনে বিরতির পর তারা আবার সংসদে যোগ দেন। তারা অভিযোগ করেন, এ আইন স্থানীয় সরকারের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে দুর্বল করবে এবং নির্বাচিত প্রতিনিধির পরিবর্তে প্রশাসক নিয়োগের পথ প্রশস্ত করবে।

বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য হান্নান মাসুদ সংসদে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সমালোচনা করা হলেও ক্ষমতা ধরে রাখতে তাদের করা আইনই এখন গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে।’ বিশেষ পরিস্থিতির অজুহাতে জারি করা অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তর করায় তিনি সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন।

বিলটির বিরোধিতা করে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান একে ‘গণবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে সংসদ থেকে ওয়াকআউটের ঘোষণা দেন। তবে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তৃণমূল পর্যায়ে রাজনীতিকে প্রভাবমুক্ত রাখতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্বাচন দেওয়া হবে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। 

বিল পাসের প্রক্রিয়ায় মীর শাহে আলম বলেন, আইনটি আজকে পাস হয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুততম সময়ের মধ্যে স্থানীয় সরকারের এইসব প্রতিষ্ঠানে নির্বাচন দেওয়া হবে। তিনি বলেন, এ আইনের মধ্যে আরেকটি বিষয় রয়েছে, তা হলো দলীয় প্রতীকে যে নির্বাচন হতো, এ আইনের মাধ্যমে জাতীয় এবং দলীয় প্রতীক বাতিল করে সাধারণ প্রতীকে নির্বাচনের ব্যবস্থা এই আইনে করা আছে। এ কারণে আইনটি পাস করা অত্যন্ত জরুরি।
 
এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে রাজনৈতিক দলের ব্যানারে দলীয় মনোনয়ন নির্বাচন না করার স্বার্থে স্থানীয় সরকার পৌরসভা সংশোধন অধ্যাদেশ ২০২৫ জারি করা হয়। তিনি বলেন, বিলটি সংসদে পাস না হলে আসলে কারা আবার ক্ষমতায় ফিরে আসবে এটা কিন্তু বিবেচনার বিষয়। ওনারা কাদের আবার ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে চাচ্ছে? রক্তপিপাসু জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে যারা পুলিশের সঙ্গে আমাদের হামলা করেছে, অস্ত্র ব্যবহার করেছে, হামলায় যারা আমাদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল সেসব জনপ্রতিনিধি, এ আইনটি পাস না হলে আবার তারা পৌরসভার মেয়র এবং কাউন্সিলর পদে ফিরে আসবে। এ কারণেই এ অধ্যাদেশটি করে নির্বাচন বাতিল করা হয়েছে এবং এ জায়গাগুলোতে প্রশাসক নিয়োগ করা হয়েছে।
 
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, সরকারের সঙ্গে আলোচনার পর স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশনে (ইসি) শেরপুর ও বগুড়ার নির্বাচনি সেল পরিদর্শন শেষে তিনি এ কথা বলেন। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশন সরকারের ওপর নির্ভরশীল বলে জানান তিনি।

সরকার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দলীয় প্রতীকের প্রভাব কমিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যক্তির যোগ্যতা, সততা ও জনসম্পৃক্ততাকে অগ্রাধিকার দেওয়াই এ সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য। এতদিন দলীয় পরিচয়ের কারণে অনেক ক্ষেত্রে যোগ্য প্রার্থীরা পিছিয়ে পড়তেন। নতুন ব্যবস্থায় সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে স্থানীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয় ব্যক্তিদের সামনে আসার সুযোগ তৈরি হবে।

নতুন আইনের আওতায় ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থীরা সাধারণ প্রতীক নিয়ে অংশ নেবেন। এতে নির্বাচনি প্রতিযোগিতা আরও উন্মুক্ত ও অংশগ্রহণমূলক হবে বলে আশা করা হচ্ছে। একইসঙ্গে দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা কমে আসায় নির্বাচনি সহিংসতা ও উত্তেজনাও হ্রাস পেতে পারে।

নতুন করে দলীয় প্রতীক বাতিলের সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ হিসেবে দেখছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও নির্বাচন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এতে স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনা, সহিংসতা কমানো এবং ব্যক্তিভিত্তিক নেতৃত্ব বিকাশের পথ আরও উন্মুক্ত হতে পারে। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং কার্যকারিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব হবে। 

নির্বাচন বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এ পরিবর্তনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ আরও জোরদার হবে। দলীয় নিয়ন্ত্রণ কমে গেলে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা জনগণের প্রতি সরাসরি জবাবদিহি হতে বাধ্য হবেন। এতে স্থানীয় উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও গতি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এ ছাড়া দলীয় প্রতীক না থাকায় মনোনয়ন নিয়ে দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব কমতে পারে, যা দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় রাজনীতিতে অস্থিরতার অন্যতম কারণ ছিল। নতুন ব্যবস্থায় ব্যক্তিভিত্তিক নেতৃত্ব গড়ে ওঠার সুযোগ বাড়বে, যা ভবিষ্যতে জাতীয় রাজনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয় সরকার বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হয়। ফলে তৃণমূল রাজনীতিতে বিশেষ করে গ্রাম ও স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক বিভাজন, সংঘাত এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীর আধিপত্য দৃশ্যমানভাবে বেড়ে যায়। 

স্থানীয় নেতাকর্মীরা বলছেন, দলীয় প্রতীকে নির্বাচন চালুর পর স্থানীয় সমাজে রাজনৈতিক বিভাজন তীব্র আকার ধারণ করে। আগে যেখানে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, সামাজিক বন্ধন ও স্থানীয় ঐক্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সেখানে দলীয় পরিচয় প্রধান হয়ে ওঠে। ফলে একই গ্রামের মানুষ ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে পড়েন, যা সামাজিক সম্প্রীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। 

এ ছাড়া নির্বাচনের সময় সহিংসতা ও সংঘর্ষের ঘটনাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। দলীয় প্রতীক ব্যবহারের ফলে নির্বাচন শুধু স্থানীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, বরং জাতীয় রাজনীতির প্রতিফলন হয়ে ওঠে। এতে কেন্দ্রীয় দলের প্রভাব, শক্তি প্রদর্শন এবং আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা তীব্র হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে সংঘর্ষের জন্ম দেয়।

তাদের মতে, প্রার্থী মনোনয়নকে কেন্দ্র করেও দলের ভেতরে বিরোধ বাড়ে। স্থানীয় পর্যায়ে একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী থাকলেও দলীয় মনোনয়ন একজনের হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ায় অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। অনেক ক্ষেত্রে বিদ্রোহী প্রার্থী দাঁড়ানো, দলীয় কোন্দল এবং পরবর্তী সময়ে সংগঠনের ভাঙনও দেখা গেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, দলীয় প্রতীক চালুর ফলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয় প্রভাব বেড়ে যায়। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা অনেক সময় জনগণের চেয়ে দলের প্রতি বেশি দায়বদ্ধ হয়ে পড়েন। এর ফলে সেবা প্রদান, উন্নয়ন কার্যক্রম ও সম্পদ বণ্টনে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ওঠে। কিছু ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ প্রার্থীরা প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়ার অভিযোগও সামনে আসে। 

স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দখলদারিত্বও একটি আলোচিত বিষয় হয়ে ওঠে। দলীয় প্রতীকের কারণে রাজনৈতিক পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে কিছু প্রার্থী দীর্ঘমেয়াদে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেন। এতে নতুন ও যোগ্য নেতৃত্বের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  স্থানীয় সরকার নির্বাচন   দলীয় প্রতীক  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close