বাজারে খোলা সয়াবিন তেল নির্ধারিত দামের চেয়ে অন্তত ৩০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। বোতলজাত সয়াবিন তেলের দামও বেশি রাখা হচ্ছে। একই সঙ্গে বেড়েছে খোলা পাম তেলের দামও। ঈদের আগেই বাড়তে শুরু করা দাম ঈদের পর আরও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কতিপয় ব্যবসায়ী দীর্ঘদিন ধরে সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা করে আসছেন। বারবার উদ্যোগ নেওয়ার পরও সরকারি হস্তক্ষেপে দাম বাড়াতে পারেননি।
এবার নানা অজুহাতে সিন্ডিকেটের খপ্পরে পড়েছে সয়াবিনের বাজার। ফলে অতিরিক্ত চাপ পড়ছে ভোক্তার ওপর।
বিক্রেতাদের দাবি, মিলগেট পর্যায়ে দাম বাড়ার কারণেই খুচরা বাজারে এর প্রভাব পড়েছে।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অপরিশোধিত ভোজ্যতেল আমদানিতে বিঘ্ন ঘটছে। পাশাপাশি জ্বালানি তেলের সংকটের অজুহাতে পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে পাইকারি বাজারে দাম বাড়তেই খুচরা বাজারেও দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।
আর বাজার বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, সরবরাহে ঘাটতি, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সিন্ডিকেটের তৎপরতা সব মিলিয়েই ভোজ্যতেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
এদিকে প্রায় এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চাহিদা মতো সয়াবিন তেল পাচ্ছেন না খুচরা ব্যবসায়ীরা। কোনো কোনো কোম্পানির বোতলজাত সয়াবিন তেল নিতে মানতে হচ্ছে অন্য পণ্য নেওয়ার শর্ত। তেল নিয়ে এমন তেলেসমাতির সুযোগে ক্রেতা পড়েছেন বিপাকে। কেউ কিনছেন চাহিদার অতিরিক্ত তেল, কেউ আবার সয়াবিন তেলের জন্য দোকানে দোকানে ঘুরছেন।
অন্যদিকে বাজার বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, সরবরাহে প্রকৃত সংকটের চেয়ে সিন্ডিকেটের তৎপরতাই বেশি প্রভাব ফেলছে। তাদের মতে, বাজারে দাম বাড়লে দ্রুত তার প্রভাব পড়ে খুচরা পর্যায়ে, কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও দেশের বাজারে তার প্রতিফলন দেখা যায় না।
ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে যেন কেউ অযৌক্তিকভাবে দাম না বাড়াতে পারে, সে জন্য বাজার তদারকি আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
এদিকে বাজারে শুধু ভোজ্যতেল নয়, এলপি গ্যাসের দামও বেড়েছে। এলপিতে এক লাফে ১২ কেজি সিলিন্ডারে প্রায় ৪০০ টাকা দাম বেড়েছে। এ ছাড়া ব্রয়লার, সোনালি ও দেশি মুরগির দামও বেড়েছে। পাশাপাশি মাছ, চাল, ডালসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। এতে মধ্য ও নিম্নবিত্ত পরিবারের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।
যদিও গত মাসেই বাণিজ্যমন্ত্রী দাবি করেছিলেন, দেশে ভোজ্যতেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং দাম বাড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। কিন্তু বাস্তব বাজার পরিস্থিতি তার বিপরীত চিত্রই তুলে ধরছে। ফলে বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে ভোজ্যতেলের বাজারে অস্থিরতার বিষয়ে কথা বলেন ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা জাতীয় সংগঠন কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি এসএম নাজের হোসাইন।
তিনি জানিয়েছেন, ভোজ্যতেলের সরবরাহ ব্যবস্থায় বাস্তবে কোনো ঘাটতি নেই। দীর্ঘদিন ধরেই কিছু ব্যবসায়ী বিভিন্ন অজুহাতে দাম বাড়ানোর সুযোগ খুঁজছিলেন, আর বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিকে তারা সেই সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছেন।
তার মতে, দেশে ভোজ্যতেলের দাম বাড়লে দ্রুতই তার প্রভাব সব পর্যায়ের বাজারে পড়ে, কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও সাধারণ ভোক্তা সেই সুফল খুব কমই পান।
খুচরা ব্যবসায়ীদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তারা বেশি দামে তেল কিনে থাকলে বেশি দামে বিক্রি করাটা স্বাভাবিক। তবে সে ক্ষেত্রে তাদের কাছে ক্রয়ের রশিদ বা ভাউচার থাকা জরুরি।
সোনালি মুরগির ‘রেকর্ড’ দামে দিশেহারা ক্রেতা: বাজারে হু-হু করে বাড়ছে সোনালি মুরগির দাম। গত এক মাসের ব্যবধানে এই জাতের মুরগির দাম কেজিতে বেড়েছে সর্বোচ্চ ১৩০ টাকা। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্য শ্রেণির ক্রেতারা।
ব্যবসায়ীদের দাবি, বিভিন্ন এলাকায় বার্ড ফ্লুর প্রকোপ বেড়েছে। এতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সোনালি মুরগি। যার প্রভাব পড়েছে বাজারে। তারা জানান, পাইকারি বাজারে মুরগির সরবরাহ কমে গেছে। এ ছাড়া পরিবহন ভাড়াও বেড়েছে। খুচরা ব্যবসায়ীদের বেশি দামে কিনে এনে বেশি দামেই বিক্রি করতে হচ্ছে। দাম বাড়ার কারণে অনেক দোকানে মুরগি বিক্রি আগের চেয়ে প্রায় অর্ধেক কমে গেছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর কাজিপাড়া, শেওরাপাড়া, আগারগাঁও ও কারওয়ান বাজার কাঁচা বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সোনালি মুরগির কেজি বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৪৩০ টাকা দরে। রোজার মাঝামাঝি সময়ে প্রতি কেজির দর ছিল ২৭০ থেকে ৩০০ টাকা। ঈদের সপ্তাহখানেক আগে কিছুটা বেড়ে প্রতি কেজির দর ওঠে ৩৪০ থেকে ৩৭০ টাকা।
সেই হিসাবে মাসখানেকের ব্যবধানে দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি ১৩০ টাকা। এ ছাড়া ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ১৯০ টাকায়, লেয়ার ৩৪০ থেকে ৩৫০ টাকা এবং দেশি মুরগি আকারভেদে ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সোনালি মুরগির দাম এভাবে বেড়ে যাওয়ায় গরুর মাংসের বাজারে প্রভাব পড়েছে। ঈদের আগে গরুর মাংসের কেজি ৭৫০ থেকে ৭৮০ টাকা ছিল। এখন বিক্রি হচ্ছে ৮০০ টাকা দরে।
কাজিপাড়া বাজারের মুরগি ব্যবসায়ী মো. রবিন হোসেন জানান, এক-দেড় মাস ধরে খামারগুলোতে বার্ড ফ্লুসহ নানা ভাইরাসের সংক্রমণ দেখা দিয়েছে। এতে অনেক খামারে মুরগি মারা যাচ্ছে, যা বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি করেছে। এ ছাড়া ঈদুল ফিতর-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান বাড়ার কারণে মুরগির চাহিদা বেড়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি তেলের সংকটে পরিবহন ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় তার প্রভাব খুচরা বাজারে পড়ছে।
অন্যদিকে প্রান্তিক খামারিরা জানান, পোলট্রি ফিড (খাবার) এবং ওষুধের দাম বৃদ্ধির কারণে অনেক প্রান্তিক খামারি লোকসান সইতে না পেরে খামার বন্ধ করে দিয়েছেন। ফলে উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। তাছাড়া বড় বড় কোম্পানিগুলো কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে বলেও অভিযোগ তাদের।
পহেলা বৈশাখ ঘিরে নাগালে নেই ইলিশ: পহেলা বৈশাখ আসতে এখনো বেশ কয়েকদিন বাকি। তবে এরইমধ্যে মাছের বাজারে শুরু হয়ে গেছে বৈশাখের আমেজ। আর সেই আমেজের বড় অংশজুড়ে আছে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী খাবার পান্তা ও ইলিশ। বৈশাখকে সামনে রেখে ইলিশের চাহিদা বেড়ে গেছে। কিন্তু চাহিদা বাড়লেও বাজারে সরবরাহ কম। ফলে স্বাভাবিকভাবেই দামে পড়েছে প্রভাব।
আকারভেদে কেজিপ্রতি ইলিশের দাম মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে বেড়েছে ৩০০-৪০০ টাকা পর্যন্ত। দাম বৃদ্ধিতে অনেকটাই বিপাকে পড়েছেন ক্রেতারা। যাদের কাছে বৈশাখ মানেই পান্তা-ইলিশ, তাদের জন্য সেই ঐতিহ্য ধীরে ধীরে ‘অতীত’ হতে বসেছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত কয়েক বছরের তুলনায় এ বছর ইলিশের আমদানি খুবই কম। জেলেরা জালে তেমন মাছ পাচ্ছে না। আরেকদিকে অভিযান লেগেই থাকে অঞ্চলভেদে। বিশেষ করে মিঠাপানি ও উজানের মাছ এ মুহূর্তে খুবই কম পাওয়া যাচ্ছে। বাজারে আমদানি কম এবং বৈশাখকে ঘিরে চাহিদা বেশি থাকায় থাকায় ইলিশের দাম কেজি প্রতি ৪০০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
কেকে/ এমএস