গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কর্তৃক ম্যানেজিং কমিটি গঠনে নিয়োজিত প্রিজাইডিং কর্মকর্তা জানেন না কমিটি গঠন করা হয়েছে। অথচ কমিটি গঠন দেখিয়ে নিয়োগও সম্পন্ন করা হয়েছে। আবার ডিজির প্রতিনিধি ছাড়া নিয়োগ কমিটির বাকি সদস্যরা জানেন না তারা নিয়োগ দিয়েছেন। অর্থাৎ তাদের স্বাক্ষরও জাল করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আর এসব জাল-জালিয়াতি করা হয়েছে সুপারের ছেলেকে ও সভাপতির ভাগিনাকে নিয়োগ দিতে।
কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে এ ধরনের জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে উপজেলার কঞ্চিবাড়ী ইউনিয়নের বজরা কঞ্চিবাড়ী মজিদিয়া দাখিল মাদ্রাসার সুপার মো. শহিদুর রহমানের বিরুদ্ধে।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, ম্যানেজিং কমিটি গঠনের জন্য গত বছরের ১৮ আগস্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে আবেদন করেন সুপার।
পরে তৎকালীন ইউএনও রাজ কুমার বিশ্বাস উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার মো. বেলাল হোসেনকে প্রিজাইডিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেন। তিনি ৭ অক্টোবর নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করেন। তফসিল অনুযায়ী ৯, ১২ ও ১৩ অক্টোবর মনোনয়নপত্র গ্রহণ ও জমা, ১৪ অক্টোবর বাছাই, ১৫ অক্টোবর আপিল শুনানি এবং ১৬ অক্টোবর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের কথা ছিল। নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল ২৭ অক্টোবর।
তথ্যে জানা যায়, প্রিজাইডিং অফিসার নিয়োগ ও তফসিল ঘোষণার পর সুপার শুধু মনোনয়নপত্র গ্রহণ ও জমা দেন। এরপর কমিটি গঠনের আর কোনো কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়নি। ফলে ম্যানেজিং কমিটি গঠনই হয়নি। অথচ কমিটি গঠন দেখিয়ে চলতি বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি জাতীয় দৈনিক নয়া দিগন্ত ও স্থানীয় দৈনিক মাধুকর পত্রিকায় ৫টি পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।
এর মধ্যে ঈদুল ফিতরের আগের দিন, অর্থাৎ চলতি বছরের ২০ মার্চ গাইবান্ধা জেলা শহরে নিয়োগ বোর্ড বসিয়ে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে সুপারের ছেলে এবং পরিচ্ছন্নতা কর্মী পদে সভাপতির ভাগিনাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বাকি তিনটি পদ—ইবতেদায়ী প্রধান শিক্ষক, ল্যাব সহকারী ও অফিস সহায়ক পদেও নিয়োগ দেওয়ার পাঁয়তারা চলছে।
এদিকে নিজের ছেলেকে নিয়োগ দিতে আইনি জটিলতা থাকায় সহকারী সুপার মো. গোলজার হোসেনকে ভারপ্রাপ্ত সুপার দেখিয়ে নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। নিয়োগ কমিটির ৫ সদস্যের মধ্যে ডিজির প্রতিনিধি ছাড়া বাকি সদস্যদের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে বলেও জানা গেছে। বিষয়টি জানাজানি হলে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি উঠেছে।
এ বিষয়ে নিয়োগ কমিটির সদস্য ও শিক্ষক প্রতিনিধি সুমন্ত চন্দ্র বর্মণের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, “আমিও শুনেছি নিয়োগ কমিটির সদস্য করা হয়েছে আমাকে। এর বেশি কিছু জানি না।”
কথা হয় আরেক নিয়োগ কমিটির সদস্য ও শিক্ষক প্রতিনিধি মো. সাজ্জাদুর রহমানের সঙ্গে।
তিনি বলেন, “বিধি মোতাবেক যে পদ্ধতিতে কমিটি গঠন হওয়ার কথা, সে পদ্ধতিতে করা হয়নি। হলে আমরা জানতাম। কারণ আমরা নিয়মিত মাদ্রাসায় আসি। তবে লোকমুখে শুনে আসছি, সুপার হুজুর গোপনে নাকি কমিটি গঠন করেছেন এবং নিয়োগও দিয়েছেন। আমরা বলেছি, এ কমিটি আমরা মানি না এবং মানবও না।”
অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “এ কমিটিতে আমাকে শিক্ষক প্রতিনিধি করা হয়েছে, কিন্তু আমি জানি না। বিষয়টি তারা আমাকে জানিয়েছেন। নিয়োগ পরীক্ষা কবে হয়েছে, কোথায় হয়েছে বা হয়েছে কি না—কিছুই আমি জানি না। তবে এনটিআরসিএর একজন নতুন শিক্ষকের বিল করার কথা বলে আমার কাছে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। নিয়োগের বিষয়ে কোনো স্বাক্ষর দিইনি।”
মাদ্রাসার সহকারী সুপার মাওলানা মো. গোলজার হোসেন বলেন, “আমার জানা মতে, এ প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজিং কমিটি গঠন করা হয়নি। তাছাড়া বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছি ম্যানেজিং কমিটি গঠনের কাজে নিয়োজিত প্রিজাইডিং অফিসার ও উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার মো. বেলাল হোসেন স্যারের মাধ্যমে। তিনিও বলেছেন, কমিটি গঠন করা হয়নি।”
অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “নিয়োগ কমিটিতে আমাকে নাকি ভারপ্রাপ্ত সুপার দেখানো হয়েছে। সুপার হুজুর তার নিজের ছেলেকে নিয়োগ দিতেই নাকি এ জালিয়াতি করেছেন। কারণ সুপার হয়ে তিনি নিজের ছেলেকে নিয়োগ দিতে আইনি জটিলতা রয়েছে।”
এ বিষয়ে মাদ্রাসার সুপার মো. শহিদুর রহমানের সঙ্গে কথা হয়।
তিনি জানান, কমিটি হয়েছে। তবে নিয়োগ দিয়েছেন কি না জানতে চাইলে ব্যস্ততা দেখিয়ে ফোন কেটে দেন। পরে আবারও ফোন দেওয়া হলে তিনি রিসিভ করেননি।
অভিযুক্ত ভুয়া কমিটির অবৈধ সভাপতি ও ধর্মপুর আবদুল জব্বার ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক আলহাজ মো. ইব্রাহিম আলী সরকারের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
ওই মাদ্রাসায় ম্যানেজিং কমিটি গঠনে নিয়োজিত প্রিজাইডিং কর্মকর্তা ও উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার মো. বেলাল হোসেন বলেন, “প্রিজাইডিং অফিসার পদে নিয়োগ পেয়ে গত বছরের ৭ অক্টোবর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা দিই। পরে সুপার শুধু মনোনয়নপত্র জমা দেন। ম্যানেজিং কমিটি গঠনের বাকি ধাপগুলো তিনি আর সম্পন্ন করেননি। সে কারণে ওই মাদ্রাসায় ম্যানেজিং কমিটি গঠন করা সম্ভব হয়নি।”
তিনি আরও বলেন, “শুনছি ওই মাদ্রাসার সুপার নাকি ভুয়া কমিটি বানিয়ে নিয়োগও দিয়েছেন।”
এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিয়োগ কমিটির সদস্য ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আতাউর রহমান বলেন, “ঈদের আগের দিন ডিজির প্রতিনিধি আমাকে ফোন দিয়েছিলেন। ঈদের ছুটিতে বাড়িতে ছিলাম। কাগজপত্র ঠিকঠাক থাকলে নিয়োগ দিতে বলেছি। এখন শুনছি ওই মাদ্রাসায় কমিটিও নাকি হয়নি। এটা প্রমাণিত হলে নিয়োগও টিকবে না। বিষয়টি তদন্তসাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এ বিষয়ে বজরা কঞ্চিবাড়ী মজিদিয়া দাখিল মাদ্রাসার নিয়োগ বোর্ডের মাদ্রাসা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের (ডিজি) প্রতিনিধি মো. জাহাঙ্গীর আলম চাকলাদার বলেন, “ঈদের আগের দিন ওই মাদ্রাসায় অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর ও পরিচ্ছন্নতা কর্মী পদে মোট দুজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।”
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “ওই মাদ্রাসার কমিটি কীভাবে হয়েছে, বিষয়টি আমাদের জানার কথা নয়। তবে অবৈধভাবে কমিটি হয়ে থাকলে মাদ্রাসা অধিদপ্তরে অভিযোগ দিলে কমিটি বাতিল হয়ে যাবে।”
কেকে/এলএ