আতঙ্ক, উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তায় ঘেরা দিনরাত। এভাবেই কাটছিল ইরানে অবস্থানরত তিন প্রবাসী বাংলাদেশি যুবকের জীবন। হঠাৎ শুরু হওয়া ভয়াবহ যুদ্ধ তাদের স্বাভাবিক জীবনকে মুহূর্তেই তছনছ করে দেয়। চারদিকে বিকট শব্দ, আগুনের লেলিহান শিখা আর ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন আকাশ—সব মিলিয়ে যেন এক মৃত্যুপূরী। সম্প্রতি ইরান থেকে দেশে ফিরেছেন হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার ৩ যুবক।
দেশে ফেরা হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার গজনাইপুর ইউনিয়নের বনগাঁও গ্রামের মো. মামুন জানান, প্রায় ২০ দিন তারা যুদ্ধের বিভীষিকা প্রত্যক্ষ করেছেন। যুদ্ধ শুরুর দিন তিনি কারখানায় কাজ করছিলেন। প্রথমে মেশিনের শব্দের কারণে বাইরে কী ঘটছে তা বুঝতে পারেননি। কিন্তু কিছুক্ষণ পর বাইরে বের হয়ে দেখেন চারদিকে আগুন আর মানুষজনের ছুটাছুটি। কারখানার পাশেই মিসাইল হামলা হচ্ছিল। সেই আতঙ্কজনক পরিস্থিতিতে প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে পালাতে গিয়ে তিনি নিজেও পায়ে গুরুতর আঘাত পান।
মামুন আরও বলেন, “যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর একটি রাতও আমরা ঠিকমতো ঘুমাতে পারিনি। প্রতি মুহূর্তে মনে হতো, এই বুঝি মৃত্যু সামনে এসে দাঁড়ালো। ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগও সম্ভব হয়নি। খাবারের তীব্র সংকট দেখা দেয়—কখনো শুকনো রুটি খেয়ে, কখনো না খেয়েই দিন কাটাতে হয়েছে।’’
তিনি জানান, জীবিকার তাগিদে প্রায় ১১ বছর আগে ওমানে গিয়েছিলেন। সেখানে সুযোগ-সুবিধা না পেয়ে অবৈধভাবে ইরানে প্রবেশ করেন এবং দীর্ঘদিন সেখানে বসবাস করছিলেন।
একই ইউনিয়নের কায়স্তগ্রামের লুৎফুরও প্রায় ৫ বছর আগে একইভাবে ইরানে যান।
লুৎফুর বলেন, “যুদ্ধের সেই ভয়াবহ দৃশ্য এখনও তাড়া করে বেড়ায়। ঘুমের মাঝেও আঁতকে উঠি। চারদিকে শুধু আগুন, ধ্বংস আর মানুষের আর্তনাদ—এসব ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব না। যুদ্ধ চলাকালে দিনরাত ঘরে বন্দি অবস্থায় থাকতে হয়েছে। বাইরে বের হওয়ার সুযোগ ছিল না। মিসাইলের শব্দে কেঁপে উঠত চারদিক। অনেক সময় ৩-৪ দিন পর্যন্ত না খেয়ে থাকতে হয়েছে। কারখানার মালিকও অনুপস্থিত থাকায় কোনো সহায়তা পাওয়া যায়নি।”
এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেই একসময় খবর আসে ইরানে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই সংবাদ তাদের মাঝে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়ে আনে। পরবর্তীতে দূতাবাসের সহযোগিতায় তারা দেশে ফেরার সুযোগ পান।
দেশে ফেরা আরেক যুবক একই উপজেলার গজনাইপুর ইউনিয়নের বনগাঁও গ্রামের নুরুল হক। মামুন ও লুৎফুরের সুরে ইরানে কাটানো সময়ের বর্ণনা দিয়ে জানান, দেশে ফেরা সহজ ছিল না। দূতাবাসের নির্দেশনা অনুযায়ী আজারবাইজান সীমান্তে যান তারা। সেখানে গিয়ে প্রথমে কোনো কর্মকর্তাকে পাননি। তখন ছিল গভীর রাত, তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি—প্রচণ্ড শীত, এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতি। খোলা আকাশের নিচে সবাইকে বেঁচে থাকার লড়াই করতে হয়েছে।
তিনি বলেন, “এরপর কর্মকর্তারা আসলে তাদের সহযোগিতায় সীমান্ত অতিক্রম করে বাকু বিমানবন্দর দিয়ে দেশে ফেরেন।”
দেশের মাটিতে পা রাখার অনুভূতি বর্ণনা করতে গিয়ে তারা বলেন, “মনে হয়েছে যেন নতুন জীবন ফিরে পেলাম। এত কষ্টের পর আবার নিজের দেশে ফিরতে পেরে আমরা আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ।” তারা কৃতজ্ঞতা জানান বাংলাদেশ দূতাবাস ও বাংলাদেশ সরকারকে। পাশাপাশি তাদের পুনর্বাসনে সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন।
যুদ্ধের বিভীষিকা থেকে ফিরে আসা এই তিন যুবকের গল্প শুধু ব্যক্তিগত দুর্ভোগের নয়, বরং প্রবাসজীবনের কঠিন বাস্তবতা ও মানবিক সংকটের একটি নির্মম প্রতিচ্ছবি।
কেকে/এলএ