জ্বালানি তেলের সংকট নিরসনের কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। বরং সময় যত গড়াচ্ছে, দেশের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি নিতে অপেক্ষমাণ যানবাহনের লাইন আরও দীর্ঘ হচ্ছে। রাজধানী থেকে জেলা শহর, এমনকি উপজেলা পর্যায়েও পেট্রোল পাম্পগুলোতে ভোররাত থেকে যানবাহনের সারি দেখা যাচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও অনেকে নির্ধারিত পরিমাণের বেশি তেল পাচ্ছেন না, আবার অনেককে খালি হাতেই ফিরতে হচ্ছে।
এদিকে দেশজুড়ে জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজার অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা চলছে বলে বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ উঠেছে। অসাধু ব্যবসায়ী, মজুতদার ও সিন্ডিকেটের কারসাজিতে বিভিন্ন এলাকায় পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন, নির্ধারিত পরিমাণের বেশি তেল বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা, কৃষকদের সেচ সংকট এবং পরিবহন খাতে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত মজুতের আশ্বাস দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, বৈশ্বিক সংকটের কারণে জ্বালানির যে সংকট, তার আঁচ বাংলাদেশকেও স্পর্শ করেছে। কিন্তু এতে জনগণ যাতে ভোগান্তির শিকার না হয়, সেজন্য সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে। তিনি বলেন, কৃষক যাতে কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সে জন্য সরকার কাজ করছে। কৃষকদের নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার কোনো মিল দেখা যাচ্ছে না। বরং পাম্পে লম্বা লাইন, সীমিত বিক্রি, কৃষকের সেচ সংকট ও কালোবাজারে বাড়তি দামে বিক্রি প্রমাণ করছে, সরবরাহ ব্যবস্থার কোথাও বড় ধরনের অসংগতি রয়েছে। তাদের মতে, এখনই কঠোর, দৃশ্যমান ও সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে এ কৃত্রিম সংকট দ্রুত জাতীয় অর্থনীতি, কৃষি উৎপাদন ও জনজীবনে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারকে অবিলম্বে সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। তাদের মতে, প্রথমেই দেশব্যাপী জ্বালানি ডিপো, ফিলিং স্টেশন ও ব্যক্তিগত গুদামে একযোগে অভিযান পরিচালনা করে অবৈধ মজুত ও কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। একইসঙ্গে জ্বালানির সরবরাহ ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে ডিস্ট্রিবিউশন চেইনকে ডিজিটাল মনিটরিংয়ের আওতায় আনতে হবে, যাতে কোথায় কত তেল যাচ্ছে এবং কোথায় ঘাটতি তৈরি হচ্ছে তা তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা যায়।
তাদের দাবি, জ্বালানি আমদানি, মজুত ও সরবরাহসংক্রান্ত তথ্য নিয়মিত জনসমক্ষে প্রকাশ করলে জনগণের মধ্যে আস্থা বাড়বে এবং গুজব বা আতঙ্ক ছড়িয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরির সুযোগও সীমিত হবে। পাশাপাশি মজুতদারি ও কালোবাজারির সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন প্রয়োজন।
কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে অভিযান শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। দেশের তিন জেলায় র্যাবের অভিযানে প্রায় ৫০ হাজার লিটার তেলের অবৈধ মজুত শনাক্ত হয়েছে। একইসঙ্গে বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে ৩ লাখ ৬১ হাজার ২০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিচ্ছিন্ন অভিযান পরিস্থিতি সামাল দিতে যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দেশব্যাপী সমন্বিত কঠোর ব্যবস্থা।
জ্বালানি ও ভোজ্যতেলের কৃত্রিম সংকট রোধে দেশের তিন জেলায় অভিযান চালিয়েছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। আটটি ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে পরিচালিত এ অভিযানে প্রায় ৫০ হাজার লিটার তেলের অস্বাভাবিক মজুত শনাক্ত করা হয়। একইসঙ্গে বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ৩ লাখ ৬১ হাজার ২০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। গত শুক্রবার চট্টগ্রাম, সিরাজগঞ্জ ও ফরিদপুর জেলায় এসব অভিযান চালানো হয় বলে গতকাল শনিবার র্যাব এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়।
তিন জেলায় র্যাবের অভিযান, বিপুল তেল উদ্ধার
র্যাব জানিয়েছে, শুক্রবার চট্টগ্রাম, সিরাজগঞ্জ ও ফরিদপুরে আটটি ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান চালিয়ে ৪৫ হাজার ৫৪৯ লিটার অকটেন, পেট্রোল, ডিজেল ও ভোজ্যতেল উদ্ধার করা হয়েছে।
চট্টগ্রামের হাটহাজারী, কর্ণফুলীর মইজ্জারটেক বাজার, নগরের সদরঘাট, মেডিকেল রোডসহ বিভিন্ন আবাসিক ভবনের ফ্ল্যাট ও ব্যক্তিগত গুদামে অভিযান চালিয়ে অবৈধ মজুতের প্রমাণ পাওয়া যায়। সেখানে অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণভাবে তেল সংরক্ষণ, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তেল উৎপাদন এবং অনুমোদনহীন মজুতের দায়ে ছয়টি প্রতিষ্ঠানকে ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। জব্দ করা হয় ১ হাজার ৫০০ লিটার মেয়াদোত্তীর্ণ তেল।
সিরাজগঞ্জের সলঙ্গায় অবৈধভাবে ৭০০ লিটার ডিজেল ও ৫০০ লিটার পেট্রোল মজুতের দায়ে দুজনকে দুই মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ফরিদপুরে একটি পেট্রোল পাম্পে অবৈধ মজুতের দায়ে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এ ছাড়া অতিরিক্ত জ্বালানি বহনের দায়ে এক মোটরসাইকেল আরোহীকে ১ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
র্যাব বলছে, বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টিকারী মজুতদার ও কালোবাজারিদের বিরুদ্ধে এ অভিযান চলমান থাকবে।
পাম্পে তেলের জন্য দীর্ঘ লাইন, ভোগান্তিতে মানুষ
রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলা শহর ও উপজেলা পর্যায়ে জ্বালানি তেলের জন্য দীর্ঘ লাইনের চিত্র এখন নিয়মিত। অনেক এলাকায় রাতভর অপেক্ষা করেও তেল পাচ্ছেন না চালকরা।
জামালপুরের বকশীগঞ্জে শনিবার ভোর ৩টা থেকেই পাম্পের সামনে শত শত মোটরসাইকেল ও পরিবহনচালকের লাইন পড়ে যায়। সকাল ৯টায় তেল সরবরাহ শুরুর কথা থাকলেও তা শুরু হয় বেলা ১১টার পর। এতে প্রচণ্ড গরমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয় সাধারণ মানুষকে।
চালকদের অভিযোগ, লাইনে দাঁড়িয়েও অনেক সময় তেল মেলে না; আবার দিলেও ৩০০ টাকার বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না। অথচ একটি চক্র বারবার ভিন্ন কৌশলে তেল তুলে নিয়ে বাইরে বেশি দামে বিক্রি করছে।
ডিজেল না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কৃষকরাও। বোরো মৌসুমে সেচের জন্য ডিজেলনির্ভর কৃষকরা বলছেন, সংকট অব্যাহত থাকলে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।
কার্যকারিতা নেই ‘ফুয়েল পাস’ অ্যাপের
জ্বালানি সরবরাহে শৃঙ্খলা আনা ও অগ্রাধিকারভিত্তিক তেল বিতরণের উদ্দেশ্যে চালু করা ‘ফুয়েল পাস’ অ্যাপ কার্যত মাঠপর্যায়ে কোনো সুফল দিতে পারছে না। চালুর দ্বিতীয় দিনেই অ্যাপটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। চালকদের অভিযোগ, যে উদ্দেশ্যে অ্যাপটি চালু করা হয়েছিল, বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না; বরং নতুন এ ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে পাম্পে বেড়েছে বিশৃঙ্খলা ও ভোগান্তি।
শনিবার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, ফুয়েল পাসধারী ও সাধারণ গ্রাহক সবাইকে একই লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিতে হচ্ছে। শুরুতে ফুয়েল পাসধারীদের বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়ার ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে সেই সুবিধা মিলছে না। সংশ্লিষ্ট পাম্প কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে আলাদা অগ্রাধিকার দিয়ে তেল সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।
এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ চালকরা। তাদের অভিযোগ, ফুয়েল পাস থাকার অজুহাতে অনেকেই লাইনের নিয়ম ভেঙে সামনে চলে আসার চেষ্টা করছেন, যার ফলে পাম্পে সৃষ্টি হচ্ছে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি। এতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা চালকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।
পাম্পে তেল নিতে আসা একাধিক মোটরসাইকেল ও পরিবহনচালক জানান, সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও সময়মতো তেল পাওয়া যাচ্ছে না। অনেকেই না খেয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন। তাদের অভিযোগ, নিয়মের কথা বলা হলেও বাস্তবে প্রভাবশালী ও পরিচয়ধারীরা সহজেই লাইনের শৃঙ্খলা ভেঙে তেল সংগ্রহ করছেন।
‘সরকারকে বেকায়দায় ফেলতেই কৃত্রিম সংকট’
বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, দেশে বাস্তবিক কোনো সরবরাহ সংকট না থাকলেও একটি প্রভাবশালী চক্র পরিকল্পিতভাবে জ্বালানি মজুত করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে চাইছে। এতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে, একইসঙ্গে সরকারের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস. এম. নাজের হোসাইন বলেন, ‘তদারকির দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর নীরবতার সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা জ্বালানি নিয়ে কারসাজি করছে। নানা কৌশলে তারা সরকারকে বিভ্রান্ত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। একইসঙ্গে অতিমুনাফা করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে।’
তিনি অভিযোগ করেন, ‘অকটেন দেশে উৎপাদিত হওয়া সত্ত্বেও পাম্প মালিক, ডিপো মালিক ও মজুতদারদের যোগসাজশে সব ধরনের জ্বালানিতে সংকট তৈরি করা হচ্ছে। এতে সারা দেশে এক ধরনের অরাজক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।’
বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেছেন, সরকারের কঠোর তদারকি না থাকায় জ্বালানি সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
শনিবার কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে আয়োজিত এক সেমিনারে তিনি বলেন, ‘পাম্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা থেকেও তেল পাওয়া যায় না, অথচ বাইরে বেশি দামে তেল পাওয়া যায়। রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের কারণেই এ সংকট।’
তিনি আরও বলেন, ‘তেল আছে শুধু বক্তব্যে। মন্ত্রীরা কথা বললে মনে হয়, বাংলাদেশ তেলের ওপর ভাসছে। বাস্তবে মানুষ পাম্পে ঘুরে তেল পাচ্ছে না।’
ডা. শফিকুর রহমান সরকারকে ৬০ থেকে ৯০ দিনের বাফার স্টক গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে হবে। ডিমান্ড ম্যানেজমেন্টে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সিন্ডিকেট ভেঙে বিকল্প জ্বালানি ও সৌরশক্তির দিকে নজর দিতে হবে।’
কৃষি ও পরিবহন খাতে নেতিবাচক প্রভাব
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, জ্বালানি সংকট দীর্ঘায়িত হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে কৃষি ও পরিবহন খাত। বর্তমানে বোরো মৌসুম চলমান থাকায় সেচনির্ভর অঞ্চলে ডিজেলের সংকট উৎপাদনে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। একইসঙ্গে পরিবহন ব্যাহত হলে পণ্য সরবরাহ শৃঙ্খলও ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যার প্রভাব পড়বে নিত্যপণ্যের বাজারে।
কেকে/এলএ