বগুড়ায় সাম্প্রতিক সময়ে ধারালো অস্ত্র, বিশেষ করে চাকু দিয়ে হামলা ও খুনের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গেছে। শহরের পাশাপাশি গ্রামেও তুচ্ছ ঘটনায় ছুরিকাঘাতের ঘটনা ছড়িয়ে পড়েছে।
গত ৪০ দিনে জেলার বিভিন্ন এলাকায় পৃথক ঘটনায় চাকু এবং চাপাতির আঘাতে খুন হয়েছেন ৮ জন। এর মধ্যে দুইজন নারী রয়েছেন। আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৮০ জনেরও বেশি মানুষ।
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অধিকাংশ চাকু অনলাইনে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পৌঁছানো হয়। চাকুর অপব্যবহার রোধে কাজ করছে পুলিশ।
অন্যদিকে সুশাসনের জন্য প্রচার অভিযান (সুপ্র) বগুড়া জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক কেজিএম ফারুক বলেছেন, “চাকু বিক্রি এবং মজুদ মনিটরিং দরকার। চাকুর আঘাতে জখম, আহত ও নিহতের ঘটনা উদ্বেগজনক এবং জনসাধারণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।”
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তুচ্ছ ঘটনা, জমিজমা নিয়ে বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, চুরি, মাদক, ছিনতাইসহ ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে এসব হামলার ঘটনা ঘটছে। শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে জেলার প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতেও এ ধরনের সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
জেলা পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত মার্চ মাসের মঙ্গলবার (১ মার্চ) থেকে বৃহস্পতিবার (১০ এপ্রিল) পর্যন্ত চাকু এবং চাপাতি-রামদার আঘাতে খুন হয়েছেন ৮ জন।
এর মধ্যে মঙ্গলবার (১ মার্চ) শহরের মাহবুব নগরে জমি নিয়ে বিরোধে ছুরিকাঘাতে খুন হন জামায়াত নেতা সাইফুল ইসলাম।
সোমবার (২৩ মার্চ) রাতে বগুড়া শহরতলীর ফাঁপোড় এলাকায় সুদের টাকার লেনদেন নিয়ে ছুরিকাঘাতে খুন হন বিএনপি কর্মী আরিফুল ইসলাম মুন্না।
বুধবার (২৫ মার্চ) রাতে সারিয়াকান্দি উপজেলার জোড়গাছা এলাকায় মাদক সেবন নিয়ে বিরোধে ছুরিকাঘাতে খুন হন স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মী জাকারিয়া শয়ন।
শনিবার (২৮ মার্চ) বেলা সাড়ে ১১টায় শহরের ফতেহ আলী বাজার থেকে আলাল শেখ নামের যুবলীগ ক্যাডার ও পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীকে তুলে নিয়ে গিয়ে ছুরিকাঘাত ও কুপিয়ে খুন করা হয়। শনিবার (৪ এপ্রিল) সন্ধ্যায় শিবগঞ্জ উপজেলার মহব্বত নন্দী গ্রামে চুরি করতে বাধা দেওয়ায় নিজ ঘরে ছুরিকাঘাতে খুন হন অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা শাহনাজ বেগম।
সোমবার (৬ এপ্রিল) রাতে শহরের ফুলবাড়ি এলাকায় ছুরিকাঘাত ও কুপিয়ে খুন করা হয় আরেক সন্ত্রাসী রবিন হোসেনকে। মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) রাতে শিবগঞ্জ উপজেলার বিহার ফকিরপাড়া গ্রামে মাদকাসক্ত স্বামী নিজ ঘরে স্ত্রী শিল্পী বেগমকে খুন করে পালিয়ে যায়।
জেলা পুলিশের সূত্র অনুযায়ী, গত মার্চ মাসে চাকুসহ বিভিন্ন ধারালো অস্ত্রের আঘাতে জখম হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৭৫ জন। এপ্রিল মাসের বৃহস্পতিবার (১০ এপ্রিল) পর্যন্ত আহত হয়েছেন আরও ৭-৮ জন। মার্চ মাসে পুলিশ চাকু উদ্ধার করেছে মাত্র ৪টি—এর মধ্যে তিনটি বার্মিজ এবং একটি দেশি।
বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী প্রতিদিনই ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আহত রোগী চিকিৎসা নিতে ভর্তি হচ্ছেন।
চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, আহতদের বেশিরভাগই গুরুতর জখম অবস্থায় হাসপাতালে আসছেন, যাদের অনেকের শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।
বগুড়া শহরে চাকুর ব্যবহার নতুন কোনো ঘটনা নয়। দেখা গেছে, স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী এবং কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা পকেটে চাকু নিয়ে ঘোরাফেরা করে এবং তুচ্ছ ঘটনাতেই একে অপরকে আঘাত করছে। অনেক সময় এসব ঘটনায় প্রাণহানীর ঘটনাও ঘটছে।
গত বছরের শনিবার (২৬ জুলাই) জেলা পুলিশের সদস্যরা একাধিক টিমে বিভক্ত হয়ে শহরের বিভিন্ন মার্কেটে একযোগে অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করেছিল ৮১০টি অত্যাধুনিক বার্মিজ ও চাইনিজ চাকু।
বগুড়ার পুলিশ সুপার মীর্জা সায়েম মাহমুদ বলেছেন, “বেশিরভাগ চাকুর অর্ডার করা হয় অনলাইনে। পরে বিভিন্ন কুরিয়ার সার্ভিসের ডেলিভারি ম্যান চাকু বাসায় পৌঁছে দেয়। এসব চাকু গৃহস্থালি কাজের জন্য অর্ডার করা হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অপব্যবহার করা হচ্ছে।’’
তিনি বলেন, “জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই কুরিয়ার সার্ভিসগুলোতে তদারকি করা হচ্ছে। কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে কুরিয়ার সার্ভিসের প্রতিনিধিদের। কুরিয়ার সার্ভিসে চাকু এলে ডেলিভারি দেওয়ার আগে পুলিশকে জানাতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে চেকপোস্টের মাধ্যমে তল্লাশি করা হচ্ছে।”
কেকে/এলএ