বিএনপি সরকার গঠনের পর দিনই নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, ‘মব কালচার শেষ।’ বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে একের পর এক মব সন্ত্রাসের ঘটনা অবসানের কথাই বলেছিলেন তিনি। তবে নতুন সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক দিনেই ফের দেশের বিভিন্ন স্থানে জনতার হাতে সহিংসতা, হামলা ও বিশৃঙ্খলার ঘটনা নতুন করে সামনে এসেছে, যার ফলে জনমনে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই বছর গণপিটুনি বা ‘মব সন্ত্রাসের’ শিকার হয়ে প্রাণ গেছে ১৯৭ জনের। ২০২৪ সালে সংখ্যাটি ছিল ১২৮।
অতিসম্প্রতি কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীর নামে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ওই ব্যক্তি নিজেকে পীর হিসেবে পরিচয় দিতেন। ঘটনার পর উত্তেজিত জনতা তার আস্তানায় হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে।
কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন জানান, ইসলাম ধর্ম নিয়ে আপত্তিকর পুরোনো একটি ভিডিও সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়ায় এ ঘটনা ঘটে। বিক্ষুব্ধ জনতার তুলনায় পুলিশ কম থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়নি। এর আগেও তিনি একই অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।
এ ঘটনার পর নিহত পীরের ভক্ত-অনুসারীরা ছুটে আসছেন দরবার শরিফে। তারা ভাঙচুর করা ঘরবাড়ি ও আসবাবপত্র দেখছেন, কেউ কেউ কেঁদে উঠছেন। তারা বলছেন, পীর খুবই ভালো মানুষ ছিলেন। তার যদি কোনো অন্যায় থাকত, তার আইনে বিচার হতো। এর বিচার হওয়া উচিত। দরবারে বর্তমানে অর্ধশতাধিক পুলিশ সদস্য মোতায়েন রয়েছে। বিজিবির একটি দলও পরিদর্শন করে গেছে।
এ ছাড়া গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে খুলনা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ জয়নুদ্দিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এ সময় তিনি বলেন, ধর্ম অবমাননা করা অন্যায়, তেমনি কোনো মানুষকে হত্যা করা, বাড়ি ভাঙচুর করা, হামলা চালানোও অন্যায়। আইনের ভিত্তিতে এর সুষ্ঠু তদন্ত করে বিচার করা হবে। পুলিশের একাধিক দল সব বিষয় নিয়ে কাজ করছে।
এ প্রসঙ্গে লেখক ও শিক্ষক আনু মুহাম্মদ গণমাধ্যমকে বলেন, আগের ঘটনাগুলোর বিচার হয়নি বলেই আবার একই ঘটনা ঘটেছে। আগে যেসব মব সৃষ্টি করে হামলা হয়েছে, সরকারের উচিত সেসব ঘটনা তদন্ত করে শ্বেতপত্র প্রকাশ করা এবং ব্যবস্থা নেওয়া। বিচার না করলে বুঝতে হবে, এসব ঘটনায় সরকারের সমর্থন রয়েছে।
বিচার না হওয়ায়ই নতুন ঘটনা ঘটার পথ তৈরি করে দিচ্ছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান, সহকারী অধ্যাপক রেজাউল করিম সোহাগও। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, মব সহিংসতা যারাই করুক, বিচার হতে হবে। মানুষের মধ্যে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে, আইনের হাতে সোপর্দ করলে অপরাধের যথাযথ বিচার হবে না। নিজেরাই আগ বাড়িয়ে বিচারের নামে অপরাধে জড়াচ্ছে। কোন বিষয় অপরাধ, আর কোন বিষয় অপরাধ নয়, সেটা নিয়ে জ্ঞানের ঘাটতি রয়েছে। না বুঝে নিজেরাই অপরাধের একটি সংজ্ঞা দাঁড় করিয়ে হামলা করছে। গুজবের ওপর ভিত্তি করে মব সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। মব সন্ত্রাসের ঘটনা আর ঘটবে না—নতুন সরকারের এমন কথা কাজে প্রমাণিত করতে পারেনি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মব সহিংসতার বিচার নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়ে রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, একই মানুষ, একই গোষ্ঠী বারবার হামলা করছে, অপরাধ করছে। এ ধরনের অপরাধের ঘটনায় যে রকম শাস্তি হওয়ার কথা ছিল, তা হয়নি। একই অপরাধের বিচার না হওয়ায় তা বারবার ঘটছে এবং অভ্যাসগত অপরাধে পরিণত হচ্ছে। এখনই ঘটনাগুলোকে আইনের আওতায় নিয়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত না করলে মব সহিংসতা আরও বাড়বে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পুলিশের ভেঙে পড়া মনোবল এখনো পুনরুদ্ধার হয়নি বলেও মনে করেন অপরাধবিজ্ঞানের এই শিক্ষক।
উল্লেখ্য, এরও আগে রাজধানীর শাহবাগ এলাকায়ও অনুরূপ বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটে। জাতীয় জাদুঘরের সামনে ট্রান্সজেন্ডারদের ওপর হামলা চালায় একদল সাধারণ মানুষ। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, প্রতি শুক্রবার সেখানে ট্রান্সজেন্ডার ও সমকামী ব্যক্তিরা জড়ো হন, যা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ ছিল। গত শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে উত্তেজনা তৈরি হলে এক পর্যায়ে হামলার ঘটনা ঘটে। এর আগে ৩ এপ্রিল একই এলাকায় ট্রান্সজেন্ডারদের সঙ্গে সংঘর্ষে সাংবাদিক বোরহান উদ্দিন ইয়াসিন আহত হন। পরে অভিযান চালিয়ে আটজন ট্রান্সজেন্ডারকে আটক করে পুলিশ।
অন্যদিকে রাজনৈতিক অঙ্গনেও এমন ঘটনা ঘটছে। সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করতে গিয়ে বাধার মুখে পড়েন কণ্ঠশিল্পী কনকচাঁপা। গত শনিবার দুপুরে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গেলে দলীয় কিছু নারী নেত্রী তার রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাকে বাধা দেন। এ সময় স্লোগান ও হট্টগোলের সৃষ্টি হয়। তবে সহকর্মীদের সহায়তায় তিনি শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করতে সক্ষম হন।
বগুড়া জেলা বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক সুরাইয়া জেরিন রনি কনকচাঁপার রাজনৈতিক অবদান নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, দীর্ঘদিন মাঠে সক্রিয় থাকা নেতাকর্মীদের উপেক্ষা করে নতুনদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে কনকচাঁপা জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে দলের সঙ্গে যুক্ত এবং নিজের অবস্থান নিয়ে তিনি আশাবাদী।
কেকে/এলএ