মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: হামে প্রাণ গেল আরও তিন শিশুর, মোট মৃত্যু ৬৮৬      একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      
খোলাকাগজ স্পেশাল
সংরক্ষিত নারী আসন
হাইব্রিডে কোণঠাসা তৃণমূল
আলতাফ হোসেন
প্রকাশ: সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬, ৯:২৮ এএম

সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়নকে কেন্দ্র করে দলে ‘হাইব্রিড’ প্রার্থীদের দাপটে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন বিএনপির তৃণমূলের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেত্রীরা। দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে রাজপথে সক্রিয় থাকা, মামলা-হামলা, জেল-জুলুম ও রাজনৈতিক নির্যাতন সহ্য করা নারী নেত্রীদের উপেক্ষা করে সাবেক মন্ত্রী-এমপিদের স্ত্রী, কন্যা, আত্মীয়স্বজন, প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠ, সদ্য সক্রিয় বা সুবিধাবাদী এবং বিত্তবানদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে মনোনয়ন বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ সামনে আসায় দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এতে প্রকৃত তৃণমূলের ত্যাগীদের মূল্যায়ন নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে।

দলীয় সূত্র বলছে, বিভিন্ন প্রভাবশালী নেতা, মন্ত্রী-এমপি ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ের সুপারিশে মনোনয়নপ্রত্যাশী হাইব্রিড প্রার্থীরা সংরক্ষিত নারী আসনের দৌড়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন। ফলে প্রকৃত ত্যাগী নেত্রীরা মনোনয়নের প্রক্রিয়ায় ন্যায্য মূল্যায়ন পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন। অনেকের অভিযোগ, দলের জন্য বছরের পর বছর ত্যাগ স্বীকার করেও এখন তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে উপেক্ষিত।

আগামী ১২ মে সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগেই মনোনয়ন প্রক্রিয়াকে ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগ বিএনপির জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। দলীয় বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়ন ঘিরে ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে ব্যাপক দৌঁড়ঝাঁপ, লবিং ও তদবির। কেন্দ্রীয় নেতাদের বাসা, কার্যালয় এবং প্রভাবশালী মহলে পদচারণা বেড়েছে সম্ভাব্য মনোনয়নপ্রত্যাশীদের। যাদের অনেককেই আন্দোলন-সংগ্রামের কঠিন সময়ে মাঠে দেখা যায়নি বলে অভিযোগ তৃণমূলের।

তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগ, অনেক মন্ত্রী-এমপি নিজেদের আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠদের নারী আসনে এমপি বানাতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। তাদের দাবি, প্রভাবশালী নেতাদের বলয়ে থাকা ব্যক্তিরাই মনোনয়নের দৌড়ে এগিয়ে থাকায় দীর্ঘদিন মাঠে সক্রিয় ও নির্যাতিত ত্যাগী নেত্রীরা কার্যত উপেক্ষিত হচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, মন্ত্রী-এমপিদের পছন্দের প্রার্থীদের পক্ষেই সুপারিশ ও লবিং চলায় প্রকৃত তৃণমূলের নেতাকর্মীরা সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের কাছেও পৌঁছানোর সুযোগ পাচ্ছেন না। এতে দলীয় ত্যাগী ও পরীক্ষিত কর্মীদের মধ্যে হতাশা, ক্ষোভ ও বঞ্চনার অনুভূতি বাড়ছে।

বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেছেন, গত ১৭ বছর ধরে মাঠে থেকে দলকে সংগঠিত রাখা, মামলা-হামলা ও নির্যাতন সহ্য করা নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন না করে এখন মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছে ‘সুপারিশনির্ভর’ ও ‘অর্থনির্ভর’ বিবেচনায়। তাদের ভাষ্য, ‘যারা আন্দোলন-সংগ্রামের সময় মাঠে ছিল না, এখন তারাই মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে।’

সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়নপত্র সংগ্রহকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই অভিযোগ করেছেন, দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রাম, মামলা-হামলা ও রাজনৈতিক নির্যাতনের সময় যারা মাঠে ছিলেন, তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। তাদের দাবি, হঠাৎ করে সামনে আসা কিছু মুখ মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় অগ্রাধিকার পাওয়ায় প্রকৃত ত্যাগী নেতাকর্মীরা উপেক্ষিত হচ্ছেন। এ নিয়ে হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে অনেকে বলেছেন, দুঃসময়ে যারা পাশে ছিলেন না, তারাই এখন প্রথম সারিতে চলে আসছেন।

বিএনপি নেত্রী সারিনা সাফিয়া লিখেছেন, ১৭ বছর আমরা জেল-জুলুম, রিমান্ড, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন করেছি, তখন কোথায় ছিলেন এনারা? এখন আমাদের বলা হচ্ছে পেছনে যেতে। এত মুখ দেখছি, যাদের আমরা ১৭ বছর মাঠে দেখিনি। আমার চোখের পানি ঝরে, ওই দিনগুলো মনে পড়ে—স্বৈরাচারী হাসিনার নির্যাতন আমাদের ওপর। স্বৈরাচারের অত্যাচার তো পোহাতে হয়নি, মামলা খেতে হয়নি—বুঝবেন কী আমাদের দুঃখ! হায়রে কপাল মন্দ, চোখ থাকিতে অন্ধ—কপালে কী আছে এই নব্য বিএনপির কারণে!

তবে সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করতে আসা নারী নেত্রীদের উপস্থিতি ও উৎসাহে মুখর ছিল রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়। সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে আগত মনোনয়নপ্রত্যাশী নারী নেত্রীরা ফরম সংগ্রহের জন্য ভিড় করেন কার্যালয়ে।

তাদের অনেকেই জানান, বিগত ‘ফ্যাসিস্ট’ সরকারের আমলে দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রাম, মামলা-হামলা, নির্যাতন ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও যারা দলের প্রতি অনুগত থেকে রাজপথে সক্রিয় ছিলেন, সেই ত্যাগী নেত্রীদেরই এবার সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন দেওয়া হবে বলে তারা প্রত্যাশা করছেন। তাদের ভাষ্য, এ আসনগুলো হওয়া উচিত দলের দুঃসময়ের পরীক্ষিত কর্মীদের মূল্যায়নের ক্ষেত্র, যাতে দীর্ঘদিনের ত্যাগ ও অবদান যথাযথ স্বীকৃতি পায়।

জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে প্রার্থী মনোনয়নের বিষয়ে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, দলের মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় এবার সংগঠন করার দক্ষতা, মেধা ও মননশীলতা—সব মিলিয়ে প্রার্থী নির্বাচন করা হবে। তিনি বলেন, মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ বা জমাদানের সময়সীমা আপাতত নির্ধারিত থাকলেও ঊর্ধ্বতন নেতৃত্ব চাইলে তা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

তৃণমূল নেতাকর্মীরা বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করে বলেছেন, মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির কারণে প্রকৃত ত্যাগীরা বঞ্চিত হচ্ছেন। তাদের দাবি, ‘কোনো সুপারিশে নয়, গত ১৭ বছর যারা আপসহীনভাবে দলের জন্য কাজ করেছে, জেল-জরিমানা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে, তাদের যাচাই-বাছাই করে মনোনয়ন দিতে হবে।’

তৃণমূল নেতাকর্মীরা বলছেন, বিগত ১৭ বছর যারা রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও দলের পক্ষে সক্রিয় ছিলেন, তাদের এখন দূরে সরিয়ে রাখা হচ্ছে। তাদের অভিযোগ, বর্তমানে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের আশপাশে এমন অনেকেই ঘোরাফেরা করছেন, যাদের আন্দোলন-সংগ্রামে দৃশ্যমান ভূমিকা ছিল না।

একাধিক নেতা অভিযোগ করেন, নিরাপত্তা ও প্রটোকলের অজুহাতে প্রকৃত ত্যাগীরা শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে পৌঁছাতে পারছেন না, অথচ সুবিধাভোগী গোষ্ঠী প্রভাব বিস্তার করছে।

এ উত্তেজনার মধ্যেই বিস্ফোরক অভিযোগ এনেছেন জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক ফাতেমা বাদশা। তিনি দাবি করেছেন, সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়ন নিশ্চিত করতে তার কাছে ১২ কোটি টাকা দাবি করা হয়েছিল। সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ঢাকা থেকে একটি প্রতিনিধি দল মাইক্রোবাসে করে চট্টগ্রামে এসে সরাসরি তার সঙ্গে বৈঠক করে। সেখানে তাকে জানানো হয়, ১২ কোটি টাকা দিলে সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন এবং পরবর্তী সময়ে সংসদ সদস্য হওয়া নিশ্চিত করা হবে।

ফাতেমা বাদশা বলেন, ‘তারা স্পষ্ট করে বলেছে, টাকা দিলে এমপি হওয়া নিশ্চিত। আমি না করায় তারা বিকল্প প্রস্তাব দেয়।’

ফাতেমা বাদশার ভাষ্য অনুযায়ী, টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে আরেকটি প্রস্তাব দেওয়া হয়। ওই প্রস্তাবে বলা হয়, তিনি এমপি হতে পারবেন, তবে আগেভাগে এমন কিছু নথিতে স্বাক্ষর করতে হবে, যাতে তার নামে বরাদ্দ হওয়া উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ ব্যবহারের অনুমোদন থাকবে অন্যদের হাতে।

এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তাহলে আমি পুতুল ছাড়া কিছুই থাকতাম না। আমার হাত-পা বাঁধা থাকত। রাজনীতিতে আসার উদ্দেশ্য এটা নয়।’ তিনি জানান, দুই প্রস্তাবই তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন।

প্রায় ৪০ বছর ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ফাতেমা বাদশা বলেন, তিনি ব্যক্তিগত লাভের আশায় রাজনীতি করেননি। চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি-বাকলিয়া) আসনে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন এবং চট্টগ্রাম বিভাগের আট জেলায় নিয়মিত সফর করে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন।

তার অভিযোগ, ‘নিজের অর্থ ব্যয় করে দলকে সংগঠিত করেছি। কিন্তু আজ সেই ত্যাগের কোনো মূল্য নেই।’ তিনি আরও দাবি করেন, দলীয় স্বীকৃতি প্রাপ্তির পথে একটি ‘অদৃশ্য শক্তি’ কাজ করছে, যারা মনোনয়ন ও সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করছে। ফাতেমা বাদশা অভিযোগ করেন, চট্টগ্রামের রাজনীতিতে বাইরের জেলার নেতাদের হস্তক্ষেপ বাড়ছে, যা স্থানীয় নেতৃত্বকে দুর্বল করছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়ন নিয়ে অর্থ লেনদেন ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হস্তক্ষেপের অভিযোগ সত্য হলে, তা শুধু বিএনপির অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নয়, দলটির নৈতিক অবস্থানকেও প্রশ্নের মুখে ফেলবে। একই সঙ্গে তৃণমূলের দীর্ঘদিনের ত্যাগ উপেক্ষিত হলে ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক ঐক্যও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  হাইব্রিড   কোণঠাসা   তৃণমূল  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close