চৈত্রের ক্লান্ত দুপুর পেরিয়ে যখন প্রকৃতি নতুন দিনের স্বপ্ন আঁকে, ঠিক তখনই সেই স্বপ্নের রঙে রাঙতে শুরু করে সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজ। বাংলা ১৪৩৩ বঙ্গাব্দকে বরণ করে নিতে কলেজে শুরু হয়েছে এক গভীর উন্মাদনা, যেখানে প্রতিটি তুলির আঁচড় বলে দেয় নতুন সূচনার গল্প।
সোমবার (১৩ এপ্রিল) কলেজ প্রাঙ্গণে ঢুকলেই মনে হয় এ যেন এক জীবন্ত ক্যানভাস। পুরোনো সব জীর্ণতা ও গ্লানি পেছনে ফেলে নতুন দিনের আহ্বানে ব্যস্ত শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। কেউ বাঁশ আর কাঠ দিয়ে গড়ে তুলছে শোভাযাত্রার প্রতীকী কাঠামো, কেউবা রঙে রঙে ফুটিয়ে তুলছে গ্রামবাংলার চিরচেনা রূপ। বাঘ, প্যাঁচা আর কল্পিত চরিত্রের মুখোশ যেন একে একে প্রাণ পাচ্ছে তাদের হাতে।
কলেজের রাস্তায় আলপনার নকশা, দেয়ালে জলরঙের গল্পসব মিলিয়ে পুরো ক্যাম্পাস যেন এক উপন্যাসের পাতা, যেখানে প্রতিটি রঙ, প্রতিটি রেখা একেকটি অনুভূতির ভাষা হয়ে উঠেছে। এই বার্তাকে হৃদয়ে ধারণ করেই এগিয়ে চলছে প্রস্তুতি। আনন্দের আড়ালে লুকিয়ে আছে সমাজকে নতুন করে ভাবার, ঐক্য আর সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার এক গভীর আহ্বান।
জানা যায়, শুধু কলেজ নয়, পুরো জেলা জুড়ে বইছে বৈশাখের আগমনী সুর। জেলা প্রশাসন, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোও নিয়েছেন নানা আয়োজন। সব মিলিয়ে যেন এক বিশাল সম্মিলিত উৎসবের অপেক্ষা। সূর্যোদয়ের সেই প্রথম প্রহরের অপেক্ষায় এখন প্রহর গুনছে সবাই। কারণ তারা জানে এই বৈশাখ শুধু একটি দিন নয়, এটি এক নতুন স্বপ্নের দরজা খুলে দেওয়ার নাম।
শিক্ষার্থীদের হাতের শিল্পকর্ম দেখতে ভিড় করছেন শিক্ষক ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তাদের চোখে মুগ্ধতা, মুখে প্রশংসা মনে হচ্ছে, এই আয়োজন শুধু একটি উৎসব নয়, এটি এক অনুভূতির মিলনমেলা।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী শাপলা পারভীন বলেন, বৈশাখ আমাদের শুধু একটি উৎসব নয়, এটি আমাদের শেকড় ও সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে। আমরা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী হিসেবে বিশ্বাস করি একটি সুন্দর ও গণতান্ত্রিক সমাজ গড়তে ঐক্য, সহমর্মিতা ও সচেতনতা খুবই জরুরি। এবারের প্রতিপাদ্য ‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণ’ আমাদের সেই দায়িত্বের কথাই মনে করিয়ে দেয়। নতুন বছরে আমরা চাই, ভেদাভেদ ভুলে সবাই একসাথে এগিয়ে যাক। এটাই হোক বৈশাখের আসল শিক্ষা।
ক্যাশ কাউজ বিপনী স্টলের শিক্ষার্থী মায়া রহমান বলেন, বর্ষবরণ উপলক্ষে আমাদের এই স্টল শুধু ব্যবসা বা বিক্রির জায়গা নয়, এটা আমাদের শেখার একটি বাস্তব ক্ষেত্র। এখানে আমরা দলগতভাবে কাজ করতে শিখছি, দায়িত্ব ভাগ করে নিচ্ছি এবং কাস্টমারের সঙ্গে যোগাযোগের অভিজ্ঞতা অর্জন করছি। বৈশাখের এই উৎসব আমাদের জন্য আনন্দের পাশাপাশি দক্ষতা বাড়ানোরও একটি সুযোগ। আমরা চাই, সবাই এসে আমাদের স্টল ঘুরে দেখেন এবং আমাদের তৈরি পণ্য গুলো উপভোগ করুক।
সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বলেন, বাংলা নববর্ষ আমাদের শেকড়ের উৎসব। এবারের আয়োজনে আমরা সময়ের কথা বলবো, সমাজের কথা বলবো। যেমন ভোরের মোরগের ডাক নতুন দিনের সূচনা জানায়, তেমনি এই বৈশাখও হোক নতুন জাগরণের প্রতীক।
কেকে/ এমএস