ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সুবিধাভোগী বিতর্কিত ব্যক্তি ও ব্যবসায়ী শিল্পগোষ্ঠীগুলোকে পুনর্বাসনের আশঙ্কায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, ‘ব্যাংক রেজুলেশন আইন, ২০২৬’-এ দুর্বল ব্যাংকের পুরোনো শেয়ারধারীদের জবাবদিহিতা ছাড়াই মালিকানায় ফেরার সুযোগ রেখে এবং প্রশাসনিক নমনীয়তার মাধ্যমে এস আলম গ্রুপসহ আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ বিভিন্ন গোষ্ঠীর ফেরার পথ তৈরি করা হচ্ছে। সরকারের অভ্যন্তরের একটি প্রভাবশালী অংশ এ কাজে সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এভাবে চিহ্নিত লুটেরা ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষক ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসন করা হলে তারা ফের আর্থিক শক্তি সঞ্চয় করে আওয়ামী লীগের পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে। এ ছাড়া ব্যাংকিং খাতকে ফের দুর্নীতি ও লুটপাটের ঝুঁকিতে ফেলবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতীতে ক্ষমতাকেন্দ্রিক সুবিধাভোগী এ গোষ্ঠীগুলো শুধু অর্থনৈতিক সুবিধাই নেয়নি, বরং রাজনৈতিক শক্তি টিকিয়ে রাখার অন্যতম অর্থনৈতিক ভিত্তি হিসেবেও কাজ করেছে। ফলে জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করে তাদের পুনর্বাসন করা হলে তা শুধু অর্থনৈতিক বৈষম্যই বাড়াবে না, বরং ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগের পুনর্গঠন ও রাজনৈতিক পুনঃসংগঠনের ক্ষেত্রও তৈরি করে দেবে।
দেশের ব্যবসায়িক অঙ্গনে নতুন করে অসন্তোষের সুর উঠেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যেসব শিল্পগোষ্ঠী ক্ষমতাসীনদের অর্থায়ন ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিল, তাদের একটি অংশকে আবারও পুনর্বাসনের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন একাধিক ব্যবসায়ী।
তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে যারা রাজনৈতিক কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছেন এবং বিএনপির বিভিন্ন কার্যক্রমে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। বরং ব্যবসা পুনরুদ্ধার বা সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা, প্রণোদনা কিংবা বিশেষ সুবিধা থেকেও তারা বঞ্চিত হচ্ছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী আমলে যারা সুবিধা নিয়েছে, এখন তারাই আবার নানা মাধ্যমে সক্রিয় হয়ে উঠছে। অথচ যারা নির্যাতিত হয়েছে, ব্যবসা হারিয়েছে, মামলা-হামলার শিকার হয়েছে, তাদের পাশে কেউ দাঁড়াচ্ছে না।’
আরেক ব্যবসায়ী নেতা বলেন, ‘বিএনপির জন্য ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা অনেক উদ্যোক্তা আজ আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত। কিন্তু তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য কোনো আলাদা সহায়তা বা পুনর্বাসন পরিকল্পনা নেই। এতে ত্যাগী ব্যবসায়ী মহলে হতাশা বাড়ছে।’
ব্যবসায়ী মহলের একটি অংশ মনে করছে, অতীতে রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে সুবিধা পাওয়া গোষ্ঠীগুলো পুনরায় শক্তিশালী হলে বাজার প্রতিযোগিতা ও সুশাসন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দীর্ঘদিন বৈষম্য ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের পুনরুদ্ধারে বিশেষ নীতিগত সহায়তা দেওয়া হলে তা অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের জন্য ইতিবাচক হবে।
দেশের শীর্ষ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠান এস আলম গ্রুপকে চারটি ব্যাংক ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে, এমন দাবি করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও এনসিপি নেতা আসিফ মাহমুদ। রোববার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘ব্যাংক ডাকাত এস আলমকে সরকারের ৩৫ হাজার কোটি টাকাসহ চারটি ব্যাংক ফেরত দেওয়া হচ্ছে। কে দিচ্ছে আমি জানি না, আপনারা জানেন?’ তিনি আরও ইঙ্গিত দেন যে, দেশের শীর্ষ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় অংশই এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
এর আগে চলতি বছরের ৬ এপ্রিল অর্থমন্ত্রী আমির খসরু সংসদে শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের তালিকা উপস্থাপন করেন। তালিকার ১১টি প্রতিষ্ঠানই এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এসব প্রতিষ্ঠানের মোট ঋণের পরিমাণ ৩৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলছে, ‘ব্যাংক রেজুলেশন আইন, ২০২৬’-এ একীভূত হওয়া দুর্বল ব্যাংকের পুরোনো শেয়ারধারীদের কোনো ধরনের জবাবদিহিতা ব্যতিরেকে আবারও ব্যাংকের মালিকানায় ফেরার সুযোগের বিধান যুক্ত করার মাধ্যমে সরকার চিহ্নিত লুটেরাদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিয়েছে। ফলে ব্যাংকিং খাত পুনরায় দুর্নীতি ও লুটপাটের অভয়ারণ্যে পরিণত হবে, যা আত্মঘাতীমূলক। এর মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও সুশাসনের ঘাটতি দূর করার পরিবর্তে দায়মুক্তি ও বিচারহীনতার পূর্ববর্তী কর্তৃত্ববাদী চর্চা অব্যাহত রাখা হয়েছে বলেও মনে করে সংস্থাটি।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জারি করা ‘ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এ ব্যাংকের বিপর্যয়ের জন্য দায়ী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সব অর্থ ফেরত দিলেও মালিকানায় ফিরে আসার সুযোগ থাকবে না—এই বিধান সংশোধন করে ‘ব্যাংক রেজুলেশন আইন, ২০২৬’-এ ১৮ (ক) ধারা সংযোজনের মাধ্যমে সরকার সংশ্লিষ্টদের বিচারের পরিবর্তে দায়মুক্তির নিশ্চয়তা প্রদান করছে—উল্লেখ করে এক বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘সরকার যে যুক্তিই দেখাক না কেন, দুর্নীতি ও লুটপাট সহায়ক ও সুরক্ষাকারী এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বাস্তবে ব্যাংক খাতের লুটেরাদের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা দূরে থাক, বিশালভাবে পুরস্কৃত করা হলো, যা আত্মঘাতীমূলক। সরকারের এ সিদ্ধান্ত হতাশাজনক হলেও অবাক করার মতো তেমন কিছু নেই। কর্তৃত্ববাদের পতনের অর্থ যে ব্যাংক খাতে ক্ষমতার অপব্যবহার ও জবরদখলের অবসান নয়, বরং ‘উইনার টেকস অল’ ফর্মুলায় নীতিদখলের পালাবদলের মাধ্যমে চোরতন্ত্রের সাময়িক বিরতির পর পুনর্বাসনের পথ সুগম রাখা—সরকারের এ পদক্ষেপ তারই দৃষ্টান্ত, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগের চরম বিতর্কিত সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা মাত্র।’
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘সংকটে নিমজ্জিত ব্যাংকগুলোর আগের মালিকরা, যারা এ খাতের লুটপাটের পাইওনিয়ার, তারাই বা কোন যাদুবলে এমন শুদ্ধতা অর্জন করলেন যে তারা একই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ইত্যাদি পুনরায় করায়ত্তের জন্য সরকার নির্ধারিত অর্থের মাত্র সাড়ে সাত শতাংশ জমা দেবেন, বাকি ৯২ দশমিক ৫ শতাংশ দুবছরে মাত্র ১০ শতাংশ সুদসহ শোধ করবেন! নতুন মূলধন যোগান দেবেন! বিদ্যমান মূলধন ঘাটতি পূরণ করবেন! আগের সব আমানতকারী ও পাওনাদারের দায় শোধ করবেন! সরকারের কর ও রাজস্ব পরিশোধ করবেন! ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষকে ক্ষতিপূরণ দেবেন এবং সংশ্লিষ্ট নিয়মকানুনের কমপ্লায়েন্স কাঠামো পুনর্গঠন করবেন? এ প্রশ্নের উত্তর কী সরকারের কাছে আছে! তা ছাড়া কোন মানদণ্ডে পুনর্দখলের বিনিময় মূল্য নির্ধারিত হবে? অধিকন্তু, ব্যাংক পুনর্দখলের পর ঘোষিত শর্তাবলি বাস্তবে প্রতিপালিত হবে—এমন নিশ্চয়তা স্বার্থের দ্বন্দ্বে দুষ্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে কীভাবে সম্ভব হবে, তা বোধগম্য নয়। নাকি বাস্তবে তথাকথিত শর্ত পূরণের নামে তারা স্বনির্ধারিত শর্তে নতুন করে ঋণ আদায় করে ঋণখেলাপির চলমান স্বাভাবিকতার সুযোগ নিয়ে ব্যাংক খাতে গভীরতর দেউলিয়াপনার ফ্লাডগেট উন্মোচন করবে? যার বোঝা জনগণকে বইতে হবে!’
যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ব্যাংকিং খাত ধ্বংসের জন্য দায়ী পুরোনো শেয়ারহোল্ডারদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করে ঢালাওভাবে মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ অব্যাহত রাখা হলে এ খাতে গুণগত কোনো পরিবর্তন আসবে না—উল্লেখ করে ড. জামান বলেন, ‘সরকার ব্যাংক সচল রাখা, আমানত সুরক্ষা ও অর্থনীতির স্থিতিশীলতার নামে দুর্নীতিসহায়ক নতুন বিধান যুক্ত করে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে যে আইনটি সংসদে পাস করেছে, তা কী আদৌ ক্ষমতাসীন দল তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাত সংস্কারের যে অঙ্গীকার করেছে, তা প্রতিপালনে সহায়ক হবে? নাকি সুবিধাবাদী গোষ্ঠীতন্ত্রের স্বার্থরক্ষায় এ জাতীয় আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে? এ ব্যাপারে সরকারকে পুনরায় ভেবে দেখার অনুরোধ করছি।’
সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীকে আত্মগোপন থেকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসা এবং পরবর্তী সময়ে জামিনে মুক্তি দেওয়ার ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। এ ঘটনাকে আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের সম্ভাব্য ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন অনেকে।
সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, সাম্প্রতিক কিছু প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পদক্ষেপে আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগুলোর প্রতি নরম অবস্থানের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। তাদের মতে, শিরীন শারমিনের প্রকাশ্যে আসা এবং দ্রুত জামিন পাওয়ার ঘটনাও সেই ধারাবাহিকতার অংশ। তাদের অভিযোগ, বিগত সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে ধীরে ধীরে পুনরায় সক্রিয় হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে।
কেকে/এলএ