সোনারগাঁয়ের জয়রামপুরে দাঁড়িয়ে আছে একটি শতবর্ষী বটগাছ। এই গাছটিকে ঘিরেই প্রতি বছর পহেলা বৈশাখে বসে এক ভিন্নধর্মী আয়োজন—বউমেলা। প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো এই মেলা কেবল একটি উৎসব নয়, এটি নারীদের বিশ্বাস, প্রার্থনা আর লোকজ সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
বুধবার (১৫ এপ্রিল) সকাল থেকেই বটতলায় জড়ো হতে থাকেন সনাতন ধর্মাবলম্বী নারীরা। কারও হাতে ফলের ঝুড়ি, কারও হাতে ফুল। নববধূ থেকে শুরু করে কুমারী ও বয়োজ্যেষ্ঠ নারীদের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। তাদের সবার দৃষ্টি বটবৃক্ষের দিকে, যাকে অনেকেই ‘সিদ্ধেশ্বরী দেবী’ হিসেবে মান্য করেন।
স্থানীয়দের বিশ্বাস, এই বটগাছ পুণ্যের প্রতীক। এখানে পূজা দিলে দাম্পত্য জীবনে সুখ-শান্তি আসে, সংসারের বন্ধন অটুট থাকে। সেই বিশ্বাস থেকেই বছরের এই বিশেষ দিনটির জন্য অপেক্ষা করেন নারীরা।
নববধূ পূজা রাণী বলেন, “বিয়ের পর এই প্রথম বউমেলায় এলাম। স্বামী-সংসারের সুখের জন্য প্রার্থনা করেছি।”
গৃহবধূ শীলা রানী দাস বলেন, “প্রতি বছরই আসি। এই বটতলায় পূজা দিলে মনে শান্তি পাই।”
মেলায় ঘুরে দেখা যায়, মৃৎশিল্পীদের তৈরি টেপা পুতুল, হাতি-ঘোড়া, পাখি, বাঘ-ভালুক, হাড়িপাতিলসহ নানা সামগ্রীর দোকান বসেছে। পাশাপাশি রয়েছে মন্ডা-মিঠাইয়ের পসরা, যা যোগ করেছে গ্রামীণ উৎসবের রঙ।
পুরোহিত উৎপল ভট্টাচার্য জানান, বহু প্রজন্ম ধরে এই মেলা চলে আসছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে নারীরা এসে এখানে পূজা-অর্চনায় অংশ নেন। দুপুরে আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে পূজা শেষে মেলার কার্যক্রম শুরু হয়।
আয়োজক কমিটির সদস্য নিলোৎপল রায় বলেন, বর্ষবরণ উপলক্ষে সিদ্ধেশ্বরী কালীপূজার আয়োজন করা হয় এবং সার্বজনীনভাবে এই মেলা উদ্যাপন করা হয়। এতে এলাকার মানুষের শান্তি ও মঙ্গল কামনায় প্রার্থনা করা হয়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসিফ আল জিনাত জানান, “মেলাকে ঘিরে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। এটি নারীকেন্দ্রিক একটি ব্যতিক্রমধর্মী আয়োজন, যেখানে সব ধর্মের মানুষই অংশ নিচ্ছেন।”
বটগাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকা নারীদের বিশ্বাস আর প্রার্থনাই যেন এই মেলার প্রাণ—যে বিশ্বাস শত বছর পেরিয়েও টিকিয়ে রেখেছে সোনারগাঁয়ের ঐতিহ্যবাহী বউমেলা।
কেকে/ এমএস