মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলাকাগজ স্পেশাল
নৃশংস কিশোর গ্যাং হুমকিতে নিরাপত্তা
খান মুহাম্মদ মুরসালীন
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬, ৯:১৫ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার এলাকা। ঘড়ির কাঁটায় তখন বিকাল সাড়ে ৪টা। হঠাৎ শুরু হয় চিৎকার আর দা-চাপাতির ঝনঝনানি। ১০-১৫ জন কিশোর-তরুণ ধাওয়া করছে একজনকে। ছুটতে থাকা যুবক একটি গলির কোণায় পড়ে যেতেই শুরু হয় নির্বিচার কোপ। কয়েক মিনিটের মধ্যেই নিথর হয়ে পড়েন ২০ বছর বয়সী যুবক ইমন হোসেন ওরফে ‘এলেক্স ইমন’। গত ১২ এপ্রিল ঘটে যাওয়া এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং গত এক মাসে দেশে কিশোর গ্যাংয়ের ক্রমবর্ধমান দৌরাত্ম্য ও নিষ্ঠুরতার একটি প্রতিচ্ছবি মাত্র।

গত এক মাসে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, আধিপত্য বিস্তার এবং ‘মব জাস্টিস’-এর আড়ালে সহিংসতা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পরিসংখ্যান বলছে, গত এক মাসে কিশোর গ্যাংয়ের হাতে খুনের শিকার হয়েছেন অন্তত ৭ জন এবং আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক মানুষ। 

এ ছাড়া গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৪৩ জন। ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন শতাধিক মানুষ। শুধু ঢাকা ও চট্টগ্রামেই সক্রিয় রয়েছে শতাধিক কিশোর গ্যাং। এর পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ ও র‌্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছে দেড় শতাধিক গ্যাং সদস্য।

খুনের নেপথ্যে ‘বড় ভাই’ সংস্কৃতি : 

কিশোর গ্যাংয়ের অধিকাংশ সহিংসতার মূলে রয়েছে ‘এলাকা দখল’ এবং ‘সিনিয়র-জুনিয়র’ দ্বন্দ্ব। ১২ এপ্রিল মোহাম্মদপুরে ইমন খুনের নেপথ্যেও ছিল দুটি গ্রুপের আধিপত্যের লড়াই। 

নিহতের মা ফেরদৌসী বেগমের দায়ের করা মামলা থেকে জানা যায়, রায়ের বাজারের ১ নম্বর গেট এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ‘এলেক্স গ্রুপ’ এবং ‘আরমান-শাহরুখ গ্রুপের’ মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। ছিনতাই করা একটি মোবাইলের ভাগাভাগি নিয়ে উত্তেজনার একপর্যায়ে এলেক্স গ্রুপের প্রধানকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

একইভাবে গত মাসে উত্তরার তুরাগ ও দক্ষিণ খান এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে।

ছিনতাই ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা : 

কিশোর গ্যাং এখন কেবল নিজেদের মধ্যে মারামারিতে সীমাবদ্ধ নেই, সাধারণ পথচারীদের জন্যও তারা যমদূত হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত এক মাসে ঢাকা ও চট্টগ্রামে ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। গভীর রাতে বা ভোরের দিকে পথচারী, রিকশাযাত্রী বা বাজার করতে বের হওয়া মানুষদের টার্গেট করছে তারা।

গত মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহে রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে এক বেসরকারি চাকরিজীবী প্রাণ হারান। তদন্তে দেখা যায়, ছিনতাইকারী চক্রের সদস্যরা কিশোর গ্যাং ‘ডি-কোম্পানি’র সদস্য। ছিনতাই করা টাকা দিয়ে তারা মূলত মাদক ক্রয় এবং গ্যাংয়ের আড্ডা বা ‘পার্টি’র খরচ মেটায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, ছিনতাইকালে বাধা দিলে বা চিৎকার করলে এরা তাৎক্ষণিক খুনের মতো সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা করে না।

মব ভায়োলেন্স ও বিচারহীনতা : 

কিশোর অপরাধের সমান্তরালে গত এক মাসে ‘মব ভায়োলেন্স’ বা গণপিটুনির প্রবণতাও বেড়েছে। গত মাসে দেশে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন ১৬ জন। 

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, কিশোর গ্যাংয়ের মতো অপরাধীদের বিচার বিলম্বিত হওয়া বা আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যাওয়ার ক্ষোভ থেকে সাধারণ মানুষ অনেক সময় আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে। এটি অপরাধের বিপরীতে আরেকটি অপরাধের জন্ম দিচ্ছে, যা বিচার ব্যবস্থার ওপর এক বড় প্রশ্নচিহ্ন।

এদিকে কিশোর অপরাধ দমন আইনে কিছুটা সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের চেয়ারম্যান ড. ফারহানা জামান। তিনি খোলা কাগজকে বলেন, ‘কিশোর-তরুণরা যে সব অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে, সেগুলো কিন্তু কিশোরসুলভ নয়। বড় ধরনের অপরাধ ঘটছে। কিন্তু বয়সের কারণে তাদের কঠোর শাস্তি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, তারা তথাকথিত ‘বড় ভাই’ কালচারের শিকার হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিকভাবেও ব্যবহৃত হচ্ছে।” 

কিশোর গ্যাং বা কিশোর অপরাধ কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে সমাধান কি হতে পারে? এ সম্পর্কে এ সমাজবিজ্ঞানী বলেন, ‘কিশোর অপরাধের সঙ্গে যুক্ত অনেকের বক্তব্যেই উঠে এসেছে যে, এদের সিংহভাগেরই পারিবারিক বন্ধন কম বা নেই। ফলে হতাশার একটা ব্যাপার থাকে। পাশাপাশি প্রযুক্তিরও একটা প্রভাব রয়েছে। 

আগে একটা গ্রুপ হয়ে উঠতে হলে অন্তত সবাইকে সশরীরে একটা জায়গায় মিলিত হতে হতো। প্রযুক্তির কারণে সেটা অনেক দ্রুত সম্ভব হচ্ছে। ফলে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পারিবারিক বন্ধনটা দৃঢ় করতে হবে। কমিউনিটি গড়ে তুলতে হবে। তার আওতায় তাদের ভালো কাজের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। ভালো কাজের বিনিময়ে পুরস্কৃত করতে হবে। শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধে লাগাম টানা যাবে না।’

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা ও চ্যালেঞ্জ : 

কিশোর গ্যাং দমনে গত এক মাসে ডিএমপি এবং র‌্যাব একাধিক বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেছে। অভিযানে মোহাম্মদপুর, রায়ের বাজার, তেজগাঁও এবং মিরপুর এলাকা থেকে প্রায় ১৬০ জন গ্যাং সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র ও মাদক।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উপকমিশনার ও ডিএমপি গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের মুখপাত্র এন এম নাসিরুদ্দিন খোলা কাগজকে বলেন, ‘যে কোনো অপরাধ দমনের ক্ষেত্রেই আমরা শক্ত অবস্থানে রয়েছি। আপনারা জানেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে ইতোমধ্যে দেড় শতাধিক অপরাধী গ্রেপ্তার হয়েছে। এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে। আমরা চেষ্টা করছি সকল অপরাধীকে আইনের আওতায় নিয়ে আসার। তবে অপরাধী কিশোরদের গ্রেপ্তার করার পর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা জামিনে বেরিয়ে এসে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।”

কিশোর গ্যাং এবং এদের অপরাধ দমনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অনুষদের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সোহাগও। তিনি খোলা কাগজকে বলেন, ‘বিদ্যমান আইনে কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে যারা জড়িয়ে পড়ছে, নানান অপরাধ করছে, তাদের বিচার নিশ্চিত করা কঠিন। 

অল্প বয়স হওয়ায় তারা আইনের ফাঁক গলে বের হয়ে যাচ্ছে। আবারও অপরাধে জড়াচ্ছে। এর প্রতিকার হিসেবে সমাজ বিশেষজ্ঞ, মানবাধিকার কর্মী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সকল স্টেক হোল্ডারদের একসঙ্গে বসতে হবে। একটা প্রোপার গাইডলাইন ঠিক করতে হবে। 

শুধু গ্রেপ্তার করে কিংবা সাজা দিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য কমানো যাবে বলে আমি মনে করি না। প্রো একটিভ কাজও করতে হবে। কেন তারা অপরাধে জড়াচ্ছে সেটা খুঁজে বের করতে হবে। কিশোর বয়সে যাতে অপরাধে না জড়ায় সে জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি অপরাধ যাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে, তাদের বিচার নিশ্চিত করতে আইনের লুপহোলগুলোও বন্ধ করতে হবে।’

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  নৃশংস   কিশোর গ্যাং   হুমকি   নিরাপত্তা  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close