ইরান যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হলে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটি জানিয়েছে, এই মন্দার প্রভাবে জি-৭-ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্যই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
গত মঙ্গলবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ওয়াশিংটনভিত্তিক এই সংস্থা জানায়, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে। যুদ্ধের বর্তমান প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে ইতোমধ্যে ২০২৬ সালের জন্য বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে দিয়েছে সংস্থাটি।
এদিকে যুদ্ধ বিরতির মধ্যেই পাল্টাপাল্টি হুমকি দিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। এর মধ্যে গত সোমবার থেকে ইরানের সব বন্দর অবরোধ করে রেখেছে মার্কিন বাহিনী। অন্যদিকে মার্কিন নৌ-অবরোধ অব্যাহত থাকলে পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরের পাশাপাশি লোহিত সাগরের বাণিজ্য পথও বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানের সেনাবাহিনী। এর মধ্যেই দুই পক্ষকে আলোচনার টেবিলে বসাতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে ইসলামাবাদ।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পুনরায় আলোচনা শুরুর বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নিতে পাকিস্তান সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির ইরানে পৌঁছেছেন। তার এই সফরের বিষয়টি আল-জাজিরাকে নিশ্চিত করেছে ইরানি সূত্রগুলো। এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের একটি বার্তা ইরানের কাছে পৌঁছে দেওয়াই এই সফরের উদ্দেশ্য।
একই সঙ্গে আলোচনা পুনরায় শুরুর উপযুক্ত সময় নির্ধারণ এবং যুদ্ধবিরতি-সংশ্লিষ্ট কিছু অমীমাংসিত বিষয়ে আলোচনার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
ইরানের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, লেবাননে যুদ্ধবিরতির শর্তগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। এ ছাড়া ইরানের জব্দ করা সম্পদ ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি তেহরানের কাছে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি। দ্বিতীয় দফার আলোচনায় বসার ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলোর সমাধান ইরানিদের কাছে অত্যন্ত জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ।
এর আগে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক বিবৃতিতে দেশটির সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড সেন্টারের প্রধান আলী আবদোল্লাহি বলেন, ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী পারস্য উপসাগর, ওমান সাগর এবং লোহিত সাগর দিয়ে কোনো ধরনের আমদানি-রপ্তানি চলতে দেবে না।’
মার্কিন নৌ অবরোধ যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের সূচনা মন্তব্য করে ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ইরান তার জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং স্বার্থ রক্ষায় চূড়ান্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
এ ছাড়া ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইরান যুদ্ধ নয়, বরং আলোচনা চায়। দেশটির বার্তা সংস্থা ইরনা এ কথা জানিয়েছে। তবে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান হুঁশিয়ার করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের ওপর কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে চায় বা আত্মসমর্পণে বাধ্য করার চেষ্টা করে, তবে তা সফল হবে না।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও হরমুজ প্রণালি অবরোধ উপেক্ষা করেই ইরানের একটি বিশাল তেলবাহী জাহাজ (সুপার ট্যাংকার) এ জলপথ অতিক্রম করে ইরানের ইমাম খোমেনি বন্দরের দিকে গেছে। ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সি এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
বিশ্বমন্দার শঙ্কা :
আইএমএফের অর্ধবার্ষিক হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, জ্বালানির আকাশচুম্বী দাম যদি ২০২৬ সালের মাঝামাঝিও নিয়ন্ত্রণে আসে, তবু জি-৭-ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে এ বছর যুক্তরাজ্যেই প্রবৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি কমবে এবং মূল্যস্ফীতি সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকবে। তবে পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে, অর্থাৎ যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিলে ও জ্বালানির দাম অপরিবর্তিত থাকলে বিশ্ব অর্থনীতি ১৯৮০ সালের পর পঞ্চমবারের মতো ভয়াবহ মন্দার মুখে পড়বে।
আইএমএফের এই সতর্কবার্তার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া সমালোচনা করেছেন ব্রিটিশ চ্যান্সেলর র্যাচেল রিভস। আইএমএফের বৈঠকে যোগ দিতে ওয়াশিংটন যাওয়ার আগে তিনি বলেন, ‘ইরান যুদ্ধ আমাদের যুদ্ধ নয়, কিন্তু এর জন্য যুক্তরাজ্যকে চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে। আমি এই ব্যয় চাইনি, কিন্তু এখন আমাদের এর মোকাবিলা করতে হবে।’
র্যাচেল রিভস সরাসরি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দায়ী করে ‘দ্য মিরর’কে বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও যুদ্ধের ময়দান থেকে বেরিয়ে আসার পরিকল্পনা ছাড়াই কোনো সংঘাতে জড়ানোটা বোকামি। আমি অত্যন্ত হতাশ ও বাকরুদ্ধ যে, যুক্তরাষ্ট্র কোনো এক্সিট প্ল্যান ছাড়াই এই যুদ্ধে জড়িয়েছে।’
আইএমএফ জানিয়েছে, বিশ্বজুড়ে প্রবৃদ্ধি কমলেও জ্বালানি আমদানিকারক ও উন্নয়নশীল দেশগুলোই সবচেয়ে বড় ধাক্কা খাবে। মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের লক্ষ্য নিয়ে ট্রাম্পের স্ববিরোধী বক্তব্যের মধ্যেই ২০২৬ সালের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস শূন্য দশমিক ১ শতাংশ কমিয়ে ২.৩ শতাংশে নামিয়েছে সংস্থাটি।
যুক্তরাজ্যের জন্য এই পূর্বাভাস আরও উদ্বেগজনক। দেশটির প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ কমিয়ে শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি সরকারি লক্ষ্যমাত্রা ২ শতাংশের দ্বিগুণ, অর্থাৎ ৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
আইএমএফের প্রধান অর্থনীতিবিদ পিয়ের-অলিভিয়ের গৌরিনকাস সতর্ক করে বলেন, প্রতিদিন পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে এবং বিশ্ব অর্থনীতি একটি নেতিবাচক পরিণতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। যদি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার ছাড়িয়ে ২০২৭ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়, তবে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশে নেমে আসবে, যাকে বিশ্বমন্দার সমতুল্য ধরা হয়। ১৯৮০ সালের পর এমন পরিস্থিতি কেবল চারবার দেখা গেছে, যার সর্বশেষটি ছিল ২০২০ সালের করোনা মহামারি ও ২০০৮ সালের আর্থিক মন্দার সময়।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি যুদ্ধ বন্ধের ওপর জোর দিয়েছে আইএমএফ। গৌরিনকাস বলেন, ঢালাও ভর্তুকি বা দাম বেঁধে দেওয়ার মতো জনপ্রিয় সিদ্ধান্তগুলো প্রায়ই অকার্যকর ও ব্যয়বহুল প্রমাণিত হয়। এর পরিবর্তে লক্ষ্যভিত্তিক ও অস্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
ইরান সংশ্লিষ্ট ৮টি জাহাজকে ফেরত :
ইরানের বন্দরগুলো ছেড়ে আসা এবং সেখানে প্রবেশের চেষ্টাকারী অন্তত আটটি তেলবাহী জাহাজকে গতিরোধ করে ফেরত পাঠিয়েছে মার্কিন নৌবাহিনী।
গত সোমবার থেকে শুরু হওয়া হরমুজ প্রণালি অবরোধের এ মার্কিন অভিযানে জাহাজগুলোকে ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিটি ক্ষেত্রেই মার্কিন নৌবাহিনীর সদস্যরা রেডিওর মাধ্যমে জাহাজগুলোর ক্রুদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং তাদের গতিপথ পরিবর্তন করে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেন।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, মার্কিন বাহিনীর নির্দেশ পাওয়ামাত্র সব কয়টি ট্যাংকার বা তেলবাহী জাহাজ তা মেনে নিয়েছে। ফলে কোনো জাহাজেই তল্লাশি চালানোর জন্য ওঠার (বোর্ডিং) প্রয়োজন পড়েনি।
কেকে/ এমএস