সারা দেশে কয়েকদিন ধরে বেড়ে চলছে লোডশেডিং। শহরাঞ্চলে তুলনামূলক কম হলেও গ্রামাঞ্চলে এরই মধ্যে তীব্র আকার ধারণ করেছে বিদ্যুৎ সংকট। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান যুদ্ধের কারণে এমনিতেই জ্বালানি সংকট চলছে। তার ওপর কয়েকদিন ধরে গরমের প্রকোপ বেড়েছে। তাতে বেড়েছে বিদ্যুতের চাহিদাও। এ ছাড়া কয়েকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। এতে সংকট আরও তীব্র হচ্ছে। তারা আরও বলছেন, এবার বিদ্যুৎ সংকট অতীতের চেয়েও বেশি হবে।
জানা গেছে—গ্রামেগঞ্জে, বিশেষ করে পল্লি বিদ্যুতের আওতায় থাকা এলাকাগুলোতে লোডশেডিং বেশি হচ্ছে। কোথাও কোথাও দিনে-রাতে একাধিকবার লোডশেডিং হচ্ছে। আর প্রতিবার তিন থেকে চার ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। বিশেষ করে গত তিন-চার দিন থেকে সারা দেশে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, কোথাও লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ৩০ শতাংশ থেকে ৪৬ শতাংশ পর্যন্তও বাড়ছে। আর জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত এই তিন মাস দেশে গরম যেমন বাড়ে, তেমনি বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়ে। তবে এবার জ্বালানি সংকটসহ নানা কারণে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে।
ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির সংকট তৈরি হওয়ার পর বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সাশ্রয় রোধে অফিসের সময় কমানো, শপিং মল দ্রুত বন্ধ করাসহ নানা প্রচেষ্টা শুরু করেছে সরকার।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বলছে, জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি কয়লাভিত্তিক কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেশিন নষ্ট হয়ে যাওয়ায় উৎপাদন কিছুটা কমছে। সেটি রক্ষণাবেক্ষণ করে দ্রুত পুরোদমে উৎপাদন শুরুর চেষ্টা করছে সরকার।
শহরের বাইরে বেশি লোডশেডিং : গত রোববারের পর থেকে সারা দেশে গরম বাড়তে শুরু করেছে। এতে বেড়েছে বিদ্যুতের চাহিদা। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না গ্রাহকেরা। বিশেষ করে পৌর এলাকার বাইরে বিদ্যুৎ সংকট বেশি হচ্ছে। গড়ে ছয় থেকে আট ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ থাকছে না পৌর এলাকার বাইরে।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মেহেরপুর জোনের জেনারেল ম্যানেজার স্বদেশ কুমার ঘোষ বলেন, ‘আমাদের মোট যে ডিমান্ড আছে, তার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ লোডশেডিং হচ্ছে। আমরাও বিদ্যুৎ কম পাচ্ছি, সে জন্য লোডশেডিং হচ্ছে।’
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) এবং বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) গত কয়েক দিনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পিক আওয়ারে (সর্বোচ্চ চাহিদার সময়) সারা দেশে লোডশেডিং এক হাজার ৮০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাচ্ছে। পিডিবির গত কয়েক দিনের তথ্য বলছে, এই মাসের প্রথমার্ধে দেশে দিনে ও রাতে গড়ে ১২ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে।
গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সর্বোচ্চ চাহিদার সময় সারা দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে ১৪ হাজার ৮০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে বিদ্যুৎ চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট। সেই হিসেবে এই সময়ে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ছিল ৬৮৮ মেগাওয়াট। পরদিন অর্থাৎ বুধবার বিকাল তিনটায় সারা দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে এই সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে ১২ হাজার ৬৭০ মেগাওয়াট। পিজিসিবির তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে সারা দেশে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ছিল এক হাজার ৮৪৩ মেগাওয়াট। তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বুধবারের এই লোডশেডিংয়ের পরিমাণ চলতি মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘গত কয়েকদিনে বিদ্যুতের চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম হচ্ছে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কিছু মেশিন রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে। তাছাড়া জ্বালানি সংকটও রয়েছে। যে কারণে চাহিদা থাকলে সেই পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না।’
পিজিসিবির ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি এপ্রিল মাসের শুরুর দিকে সারা দেশের লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় শূন্যের কোটায়। সেটা গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে শুরু করেছে। এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহ, অর্থাৎ ৮ এপ্রিলের পর থেকে সেটি ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করে। প্রথম সপ্তাহে খুব সামান্য লোডশেডিং থাকলেও দ্বিতীয় সপ্তাহে সেটি বেড়ে গড়ে ৭০০-৯০০ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। আর গত বুধবার থেকে সেটি বেড়ে ১,৮০০ মেগাওয়াটেরও বেশি হয়েছে।
পিডিবি ও পিজিসিবির তথ্য অনুযায়ী, দেশের বর্তমানে ১৩৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র (আমদানিসহ) রয়েছে। এগুলোর সর্বমোট স্থাপিত সক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে প্রতিদিন গড়ে ১২ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাকি অর্ধেকের বেশি সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না মূলত জ্বালানি সংকটের কারণে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিগত সময়ের বকেয়া পরিশোধ, জ্বালানি তেলের সংকটসহ নানা কারণে এবার গরমে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি বেশ খারাপের দিকে যেতে পারে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম বলেন, ‘বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ফার্নেস অয়েল প্রয়োজন। সেটির একটি সংকট আছে। এ ছাড়া গ্যাসসহ জ্বালানি সংকট রয়েছে, যার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।’
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘যুদ্ধের কারণে কয়লা ও তেলের সাপ্লাই চেইনে সমস্যা হচ্ছে। বিশেষ করে কয়লার জন্য আমাদের দুটি মেশিন আন্ডার লোডে চলছে। অন্যদিকে গ্যাস সংকটের কারণেও উৎপাদন কমছে।’
বিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়ে সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত : জ্বালানি খাতকে স্বনির্ভর করতে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গতকাল রাতে বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদের নিয়মিত সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি। তিনি বলেন, ‘জ্বালানি খাতে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যপূরণে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোক্তারা কাজ করতে পারবে।’ তিনি জানান, এ বিষয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
কেকে/এলএ