রোববার, ২৩ আগস্ট ২০২৬,
৮ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

রোববার, ২৩ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও মাদক ব্যবসায়ীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের নির্দেশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর      হামের উপসর্গ নিয়ে আরও দুই শিশুর মৃত্যু      রাষ্ট্রপতির শপথ-দায়িত্বভার গ্রহণের প্রজ্ঞাপন জারি      নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলকে প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা বার্তা      রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ মির্জা ফখরুলের      প্রতিমন্ত্রী থেকে পূর্ণমন্ত্রী হলেন রশিদুজ্জামান মিল্লাত      কে কোন দায়িত্ব পাচ্ছেন শপথ নেওয়া ছয় মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী      
খোলাকাগজ স্পেশাল
খুলনার বক্ষব্যাধি হাসপাতাল
ভেঙে পড়েছে স্বাস্থ্যসেবা
শামিমুজ্জামান, খুলনা
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২৬, ৯:২৭ এএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

খুলনার গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান বক্ষব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এমরান হোসেনের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। মাসের পর মাস অফিসে অনুপস্থিত থেকেও বেতন-ভাতাসহ সব সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে ডা. এমরানের অনিয়ম, দায়িত্বে অবহেলা ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের একাধিক অভিযোগ সামনে আসায় স্বাস্থ্য বিভাগে ব্যাপক আলোড়নের সৃষ্টি হয়েছে। ইতোমধ্যে ডা. এমরান যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই মাসের পর মাস কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি তদন্তে দুই সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করেছেন বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক।

এদিকে খুলনা বিভাগের ১০ জেলাসহ পদ্মার এপারের ২১ জেলার মানুষের বক্ষসংক্রান্ত রোগের একমাত্র চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠানের প্রধানের অনুপস্থিতিতে ভেঙে পড়েছে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা। এতে চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ রোগীরা।

জানা গেছে, খুলনা মহানগরীর খানজাহান আলী থানাধীন ফুলবাড়িগেট এলাকার মীরেরডাঙ্গায় অবস্থিত এই বক্ষব্যাধি হাসপাতালটি দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলের মানুষের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। বিভাগের ১০ জেলার মানুষের যক্ষ্মা, অ্যাজমা, নিউমোনিয়া এবং অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের রোগের চিকিৎসায় হাসপাতালটির ওপর নির্ভরশীল রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। তবে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের প্রধান কর্মকর্তা নিয়মিত দায়িত্ব পালন না করায় চিকিৎসাসেবায় মারাত্মক প্রভাব পড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৫ সালের ৮ জানুয়ারি ডা. এমরান হোসেন বক্ষব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে যোগদান করেন। কিন্তু যোগদানের পর গত এক বছর দুই মাসে তিনি মাত্র ৫০ দিনের মতো অফিস করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বাকি সময় তিনি নিয়মিত অনুপস্থিত থেকে ঢাকায় ও নিজের পরিবারের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন। ডা. এমরান মাসের পর মাস হাসপাতালে অনুপস্থিত থাকলেও সরকারি নিয়ম অনুযায়ী বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করেছেন বলে দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর।

হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ একাধিক সূত্র জানিয়েছে, তত্ত্বাবধায়কের অনুপস্থিতির কারণে প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ বিলম্বিত হচ্ছে এবং রোগীদের স্বাস্থ্যসেবার মানও ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে হাসপাতালটির অন্যান্য চিকিৎসক ও কর্মচারীদের মধ্যেও এক ধরনের অসন্তোষ বিরাজ করছে।

রোগীদের অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ককে হাসপাতালে না পাওয়ায় তারা প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত ও সেবার ক্ষেত্রে দেরির শিকার হচ্ছেন। এতে করে রোগীদের ভোগান্তি বাড়ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে তারা চিকিৎসা নিতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।

আড়ংঘাটা থানার তেলিগাতী এলাকা থেকে চিকিৎসা নিতে আসা রোকসানা আক্তার বলেন, ‘হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক নিয়মিত না থাকার ফলে কর্তব্যরত ডাক্তার ও নার্সরা আমাদের ভালোভাবে চিকিৎসাসেবা দেন না। এখানে দেখাশোনা করার কেউ থাকে না।’

শিরোমনি থেকে চিকিৎসা নিতে আসা নুরুল ইসলাম বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক স্যার না থাকার কারণে ডাক্তার ও নার্সরা সময়মতো হাসপাতালে আসেন না। চিকিৎসা নিতে এসে আমাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। এখানে কোনো অভিযোগ দেওয়ার কাউকে পাওয়া যায় না। আমরা হাসপাতালের প্রধানের এ ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই।’

বক্ষব্যাধি হাসপাতালে দুই দফায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, তত্ত্বাবধায়ক ডা. এমরান হোসেন অফিসে নেই। অফিসের কর্মচারীদের কাছে জানতে চাওয়া হলেও তারা সঠিক উত্তর দিতে পারেননি। হাসপাতালের প্রধান সহকারী মো. শামীম হাসান জানান, তত্ত্বাবধায়ক স্যার ছুটিতে আছেন। তবে তিনি কোনো ছুটির আবেদনের অনুমোদনপত্র দেখাতে পারেননি। এমনকি ডা. এমরান তার অনুপস্থিতিতে কাউকে দায়িত্ব প্রদান করেছেন কি না, সেটিও জানাতে পারেননি।

এ বিষয়ে হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. সাগর সৈকত বিশ্বাস বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক স্যার নিয়মিত অফিস করেন না—এটা সত্য। এতে করে অনেক সময় আমাদের কার্যক্রম পরিচালনায় সমস্যা হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক স্যার ছুটিতে গেলে আমাদের কাউকে মাঝেমধ্যে দায়িত্ব দিয়ে যান। তবে এখন তিনি আমাদের কাউকে দায়িত্ব দিয়েছেন কি না জানি না। কিন্তু আমাকে তিনি দায়িত্ব দেননি।’ তার এই বক্তব্য থেকেই বিষয়টির সত্যতা সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যায়।

অন্যদিকে অভিযুক্ত ডা. এমরান হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য একাধিকবার তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে ফোন করা হলেও তিনি কোনো কল রিসিভ করেননি। এমনকি সাংবাদিকদের প্রশ্ন এড়াতে সচেতনভাবেই তিনি যোগাযোগ থেকে বিরত রয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। হাসপাতালের প্রধান সহকারী শামীম হাসানের মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনিও বিষয়টি এড়িয়ে যান এবং এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

স্বাস্থ্য বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে নিয়মিত উপস্থিতি ও দায়িত্ব পালনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কর্মকর্তা যদি অনুমতি ছাড়া দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন, তবে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। এ ধরনের অনিয়মের কারণে সরকারি সেবার মান ব্যাহত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে খুলনা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মো. মুজিবুর রহমান জানান, ‘চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে ডা. এমরান হোসেন কোনো ধরনের ছুটি গ্রহণ করেননি। অথচ তিনি নিয়মিত অফিসে উপস্থিত ছিলেন না—এমন অভিযোগ আমরা পেয়েছি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য ইতোমধ্যে দুই সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বর্তমানে গঠিত তদন্ত কমিটি তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অভিযুক্ত চিকিৎসকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) খুলনার সভাপতি অ্যাডভোকেট কুদরত-ই খোদা বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ একটি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক অফিসে উপস্থিত থাকবেন না—এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। সরকারি অফিসগুলোতে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করার কারণেই এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। এই অনিয়মের ঘটনায় অভিযুক্ত ডাক্তারের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। তা না হলে এ ধরনের অনিয়ম অন্যরা করার সাহস পাবে।’

এদিকে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, স্বাস্থ্য খাতের মতো স্পর্শকাতর একটি খাতে এ ধরনের অনিয়ম শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতাকেই প্রকাশ করে না, বরং সাধারণ মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়িয়ে তোলে। তাই তারা দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি বলে মনে করছেন।

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  খুলনা   বক্ষব্যাধি   হাসপাতাল   স্বাস্থ্যসেবা  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close