গত কয়েকদিন ধরে সারা দেশে লোডশেডিং তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে কারেন্ট থাকছে না ঘণ্টার পর ঘণ্টা। এর মধ্যেই বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর তোড়জোড় চলছে। ইরান যুদ্ধের প্রভাবে উদ্ভূত জ্বালানি সংকটের কারণে বিপুল ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। আর এর চাপ সামলাতেই বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। পাইকারি ও খুচরা উভয় পর্যায়েই দাম বাড়ছে।
সূত্র বলছে, এপ্রিলের শুরুতে বিদ্যুৎ বিভাগের পেশ করা একটি প্রস্তাব এখন মন্ত্রিসভার অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে, যেখানে পাইকারি বিদ্যুতের দাম বর্তমানের প্রতি ইউনিট ৭ টাকা ০৪ পয়সা থেকে সর্বোচ্চ ১ টাকা ২০ পয়সা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত একাধিক কর্মকর্তা জানান, এপ্রিলের শুরুতে বিদ্যুৎ বিভাগের প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভায় পাঠানো হয়। তবে মন্ত্রিসভা কিছু বিষয়ে আরও স্পষ্টকরণের জন্য সেটি ফেরত পাঠায় এবং কর্মকর্তারা বর্তমানে তা নিয়ে কাজ করছেন।
পহেলা বৈশাখের আগে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয় বিদ্যুতের ট্যারিফ সংক্রান্ত প্রস্তাবটি চূড়ান্ত করার জন্য। প্রস্তাবিত রূপরেখা অনুযায়ী, পাইকারি দাম প্রতি ইউনিটে ৫০ পয়সা বাড়ালে ভর্তুকি কমবে পাঁচ হাজার কোটি টাকা; এক টাকা বাড়ালে কমবে ১০ হাজার কোটি টাকা এবং ১ টাকা ২০ পয়সা বাড়ালে ভর্তুকি কমবে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যারা ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, সেই গ্রাহকদের জন্য খুচরা দাম অপরিবর্তিত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এর চেয়ে বেশি ব্যবহারকারী গ্রাহকদের জন্য ইউনিটপ্রতি ৭০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৮০ পয়সা পর্যন্ত দাম বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
জানা গেছে, প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হলে, গণশুনানি শেষে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য তা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে পেশ করা হবে।
এদিকে এমন এক মুহূর্তে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যখন গত বৃহস্পতিবার বিকালে বিদ্যুৎ ঘাটতি বেড়ে এক হাজার ৯০০ মেগাওয়াটে ঠেকেছে—যা গত সপ্তাহের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
তীব্র গরমে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় দেশের বড় একটি অংশের মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছে।
পিজিসিবির ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি এপ্রিল মাসের শুরুর দিকে সারা দেশের লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় শূন্যের কোটায়। সেটা গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে শুরু করেছে। এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহ, অর্থাৎ ৮ এপ্রিলের পর থেকে সেটি ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করে। প্রথম সপ্তাহে খুব সামান্য লোডশেডিং থাকলেও দ্বিতীয় সপ্তাহে সেটি বেড়ে গড়ে ৭০০–৯০০ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। আর গত বুধবার থেকে সেটি বেড়ে ১,৮০০ মেগাওয়াটেরও বেশি হয়েছে।
পিডিবি ও পিজিসিবির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১৩৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র (আমদানিসহ) রয়েছে। এগুলোর সর্বমোট স্থাপিত সক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে প্রতিদিন গড়ে ১২ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাকি অর্ধেকের বেশি সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না মূলত জ্বালানি সংকটের কারণে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিগত সময়ের বকেয়া পরিশোধ, জ্বালানি তেলের সংকটসহ নানা কারণে এবার গরমে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি বেশ খারাপের দিকে যেতে পারে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম বলেন, ‘বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ফার্নেস অয়েল প্রয়োজন। সেটির একটি সংকট আছে। এ ছাড়া গ্যাসসহ জ্বালানি সংকট রয়েছে, যার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।’
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘যুদ্ধের কারণে কয়লা ও তেলের সাপ্লাই চেইনে সমস্যা হচ্ছে। বিশেষ করে কয়লার জন্য আমাদের দুটি মেশিন আন্ডারলোডে চলছে। অন্যদিকে গ্যাস সংকটের কারণেও উৎপাদন কমছে।’
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধ জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে ব্যাহত করেছে। পাশাপাশি এলএনজি, কয়লা ও ফার্নেস অয়েলের মতো বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান উপকরণগুলোর আমদানি খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। কয়লা সরবরাহ বজায় রাখা এবং চড়া মূল্যে এলএনজি আমদানি অব্যাহত রাখার চেষ্টায় সরকারের ওপর আর্থিক বোঝার ভার দ্রুতই বেড়ে গেছে।
বর্তমান বিদ্যুতের দাম বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) প্রকৃত উৎপাদন খরচের তুলনায় অনেক কম, যার ফলে সৃষ্ট বিশাল ঘাটতি মেটাতে হচ্ছে সরকারি ভর্তুকি দিয়ে।
২০২৪–২৫ অর্থবছরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের প্রকৃত উৎপাদন খরচ ছিল ১২ টাকা ৩৬ পয়সা, যেখানে পাইকারি বিক্রয়মূল্য ছিল মাত্র ৭ টাকা ০৪ পয়সা।
ফলে ৪৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার পরও পিডিবিকে ১০ হাজার ৬০০ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে। ২০২৫–২৬ অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকির পরিমাণ ৩৭ হাজার কোটি টাকায় আটকে রাখার পরিকল্পনা করা হলেও চলমান জ্বালানি সংকটে তা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
সর্বশেষ প্রাক্কলন অনুযায়ী, প্রাথমিক জ্বালানির আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় চলতি অর্থবছরে ভর্তুকির পরিমাণ বেড়ে প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।
জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার একটি বড় অংশই অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে। গতকাল ১৪৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে অন্তত ৬৬টি জ্বালানি সংকটের কথা জানিয়েছে। আগের এক মূল্যায়নে দেখা গিয়েছিল যে, জ্বালানি সীমাবদ্ধতার কারণে প্রায় ৬০ শতাংশ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস বসে থাকবে; সাম্প্রতিক দিনগুলোতে এই পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
পিডিবির গ্রীষ্মকালীন পরিকল্পনায় গ্যাস থেকে পাঁচ হাজার ২০০ মেগাওয়াট, কয়লা থেকে পাঁচ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট এবং ফার্নেস অয়েল থেকে তিন হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রত্যাশা করা হয়েছিল। কয়লা সরবরাহের অভাবে চট্টগ্রামের এসএস পাওয়ার, কক্সবাজারের মাতারবাড়ী ও পটুয়াখালীর আরএনপিএল বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে; এই তিনটি বৃহৎ কেন্দ্রের মোট উৎপাদন ক্ষমতা চার হাজার ৮০০ মেগাওয়াট।
কেকে/এলএ