মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলাকাগজ স্পেশাল
বহুমুখী সংকটে চাপে সরকার
আলতাফ হোসেন
প্রকাশ: সোমবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৬, ৮:৫৩ এএম আপডেট: ২০.০৪.২০২৬ ৯:২৯ এএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

জ্বালানি তেল ও এলপি গ্যাসের দাম বাড়ানোর ফলে দেশের অর্থনীতিতে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। ব্যয় বেড়েছে পরিবহন, কৃষি, শিল্প, নির্মাণ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ প্রায় সব খাতেই। পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় সরাসরি প্রভাব পড়ছে নিত্যপণ্যের দামে। ফলে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ইতোমধ্যেই খাদ্য ও ভোগ্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ভোক্তারা চাপে পড়েছেন। যা সামগ্রিকভাবে মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকরা।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানি খরচ বৃদ্ধির পাশাপাশি উচ্চ সুদের হার বিনিয়োগকে স্থবির করে দিয়েছে, ফলে নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি হচ্ছে না। অন্যদিকে সরকার বলছে, বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতি ও তহবিলের চাপ সামাল দিতেই সীমিত পরিসরে দাম সমন্বয় করা হয়েছে এবং জনগণের স্বার্থ বিবেচনায় ভর্তুকিও অব্যাহত আছে। তবে মাঠপর্যায়ে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তির পরিবর্তে উদ্বেগই বেশি দেখা যাচ্ছে।

ব্যবসায়ীরা আরও বলছেন, জ্বালানি সংকটে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়েছে। নতুন করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোয় অর্থনীতি আরও চাপে পড়বে বলে মনে করেন তারা। এই মুহূর্তে জ্বালানি সমস্যাই সবচেয়ে বড় সমস্যা বলে উল্লেখ করেন ব্যবসায়ী নেতারা। বৈশ্বিক সংকট মাথায় রেখে আসন্ন বাজেট দেওয়ার পরামর্শ দেন বক্তারা। তারা বলেন, জ্বালানি সংকটে চাহিদার তুলনায় ঘাটতি বেশি হওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এ অবস্থায় তেলের দাম বাড়ানোয় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন তারা।

দাম বাড়ানোর পরও পাম্পে কমেনি লাইন:
সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পরও কমেনি গ্রাহকদের ভোগান্তি। উল্টো অনেক পাম্পে আগের মতোই দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে, যেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে যানবাহন চালকদের। প্রতিদিনের মতো রাজধানীর পেট্রোল পাম্পগুলোতে রোববার সকাল থেকে তেল সংগ্রহে আসা যানবাহনের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। দাম বাড়ার পরও দীর্ঘ সময় লাইনে থেকে ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা। সব পাম্পে সরবরাহ চেইন ঠিক না হলে এমন ভোগান্তি কমবে না বলে মনে করেন পাম্প-সংশ্লিষ্টরা।

সরেজমিনে দেখা যায়, রাজধানীর পরিবাগে মেঘনা পেট্রোল পাম্পে তেল নিতে আসা গ্রাহকদের এই দীর্ঘ লাইন প্রতিদিনের মতো রোববারও শাহবাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল হয়ে মোতালিব প্লাজা পর্যন্ত বিস্তৃত। এই পাম্প থেকে তেল নিতে ভোর থেকেই লাইনে দাঁড়িয়েছেন গ্রাহকরা। দীর্ঘ ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা অপেক্ষা করে তেল নিতে পারছেন ব্যক্তিগত গাড়িচালকরা, আর বাইকারদেরও অপেক্ষা করতে হচ্ছে তিন থেকে চার ঘণ্টা। একই চিত্র রাজধানীর রমনা পেট্রোল পাম্পেও।

গতকাল রোববার সচিবালয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে তেলের দাম বাড়ানোর কোনো সম্পর্ক নেই। তেলের দাম তো আইএমএফ মিটিংয়ে যাওয়ার আগে বাড়ানো হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘সারা দুনিয়ায় তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে তেলের দাম অতিরিক্ত বাড়ানো হয়নি। আমেরিকায় তেলের দাম দ্বিগুণ হয়েছে। বাংলাদেশ একটি দেশ, যেখানে শেষ পর্যন্ত আমরা বাড়াইনি—বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণ করে, তাদের কথা মাথায় রেখে।’ তেলের দাম যতটুকু বাড়ানো হয়েছে, তা খুবই নগণ্য বলেও মন্তব্য করেন তিনি। অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এটা বাড়াতে হয়েছে শুধু আমাদের তহবিলের ওপর এত চাপ আসছে, আমাদের তো বাকি প্রোগ্রাম চালাতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে হওয়া চুক্তির সব শর্তে বর্তমান সরকার একমত নাও হতে পারে। আইএমএফ, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থার সঙ্গে আলোচনা একটি চলমান প্রক্রিয়া। আমরা একটি নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার। শুধু তাদের সিদ্ধান্তে সবকিছু হবে না, আমাদেরও সিদ্ধান্ত আছে।’ মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি বাড়তেও পারে, আবার নাও বাড়তে পারে—সরকার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।’

দাম বাড়ার পরও ভর্তুকি আছে:
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, বিশ্ববাজারে দাম বাড়ার কারণে দেশেও সরকার দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এটা করতে বাধ্য হয়েছি আমরা, কারণ এটা বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে কিনতে হয়। তাই দাম কিছুটা বাড়িয়ে যাতে সহনীয় জায়গায় থাকতে পারি, সেই ব্যবস্থা করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ মানেই বিরূপ প্রভাব পড়া। এ যুদ্ধে শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বে প্রভাব পড়েছে। দাম বাড়ার পরও ভর্তুকি আছে। তবে ভর্তুকির হিসাব মন্ত্রণালয় পরে দিতে পারবে।’

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্বিগুণ হওয়ার পরও সরকার জনগণের কষ্টের কথা বিবেচনা করে দেশে তেলের দাম খুব সামান্য বাড়িয়েছে। সরকার ভর্তুকি দিয়ে হলেও বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে। জনগণের ভোগান্তি কমাতে এবং অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেই সরকার এই বাড়তি ব্যয়ের বোঝা নিজে বহন করছে এবং অত্যন্ত সীমিত পরিসরে দাম সমন্বয় করেছে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর সিনিয়র সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, জ্বালানি তেলের দাম হঠাৎ সমন্বয়ের নামে বাড়ানোর সিদ্ধান্তের প্রভাব সরাসরি নিত্যপণ্য ও সব ধরনের সেবার ওপর পড়বে। এতে সামগ্রিকভাবে বাজারে নতুন করে মূল্যস্ফীতি তৈরি হবে।

তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরেই নানা অজুহাতে পণ্যের দাম বাড়ানোর সুযোগ খোঁজেন। এবার সেই সুযোগ আরও প্রসারিত হলো। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে তারা অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারবেন। একই সঙ্গে কিছু মজুতদার আগেই পণ্য গুদামজাত করে রাখার মাধ্যমে অতিরিক্ত মুনাফা লুটতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

নাজের হোসাইন আরও বলেন, জ্বালানি তেলের সঙ্গে পরিবহন, উৎপাদন, কৃষি ও শিল্পসহ প্রায় সব খাতই সরাসরি যুক্ত। ফলে এর দাম বাড়লে প্রতিটি পর্যায়েই ব্যয় বাড়বে এবং তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই পড়বে। এতে নিত্যপণ্যসহ সবকিছুর দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে, যা সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়াবে। তিনি আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে এ ধরনের হঠাৎ মূল্য সমন্বয় সময়োপযোগী হয়নি এবং এতে বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে।

পরিবহন খাতে ভাড়া বৃদ্ধির প্রস্তাব:
বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে তেলের দাম অতিরিক্ত বাড়ানো হয়নি। আমেরিকায় তেলের দাম দ্বিগুণ হয়েছে। দেশে জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানোর পর সবচেয়ে বেশি চাপ পড়েছে পরিবহন খাতে। বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, লঞ্চসহ সব ধরনের যানবাহনের পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ভাড়া বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। এতে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন—দুই ক্ষেত্রেই খরচ বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা বলছেন, ডিজেল ও অকটেনের দাম বৃদ্ধির ফলে প্রতিদিনের অপারেশন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। দূরপাল্লার বাস ও পণ্যবাহী ট্রাকের ক্ষেত্রে এই চাপ আরও বেশি। ইতোমধ্যে অনেক পরিবহন মালিক সংগঠন ভাড়া সমন্বয়ের দাবি তুলেছে। তারা বলছেন, বর্তমান ভাড়ায় চলাচল করলে লোকসানের ঝুঁকি রয়েছে।

পণ্য পরিবহন খাতেও ইতোমধ্যে খরচ বাড়তে শুরু করেছে। ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান মালিকরা জানিয়েছেন, জ্বালানি ব্যয় বাড়ার কারণে প্রতি ট্রিপে অতিরিক্ত খরচ যোগ হচ্ছে। এর প্রভাব সরাসরি বাজারে পণ্যের দামে পড়বে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, পরিবহন ব্যয় বাড়লে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়াতে হবে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই চাপ সৃষ্টি করবে।

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির পর বাস-ট্রাক মালিকরা ভাড়া সমন্বয়ের দাবি জানিয়েছেন। দূরপাল্লার বাসে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ২ টাকা ১২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৪ টাকা ৫ পয়সা করার প্রস্তাব দিয়েছে মালিক সমিতি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়ায় আগের ভাড়ায় পরিবহন পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব মো. সাইফুল আলম বলেন, আশা করছিলাম যে সরকার তেলের দাম যদি বৃদ্ধি করে, তবে সেই সঙ্গে গেজেটে উল্লেখ করে দেবে যে তেলের কারণে এত পয়সা করে প্রতি কিলোমিটার ইনক্লুড হবে। কিন্তু সেটি হয়নি। আজ মালিকরা বেশি দামে তেল কিনছে, কিন্তু ভাড়া নিচ্ছে আগের রেটে। এভাবে তো মালিকরা লস দিয়ে বাস চালাবে না। আমরা অলরেডি সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি, যাতে আজকের মধ্যে এটা নিরসন করে দেওয়া হয়।

তিনি আরও বলেন, সরকার প্রতি বছর বাজেটের আগে একটা ক্যালকুলেশন করে, কস্টিং বডি দেখে বর্তমানে পরিস্থিতি অনুযায়ী জানিয়ে দিতে পারে যে এই বছরের জন্য এই ভাড়া নির্ধারণ করা হলো। এই হিসাবটা যদি ঠিকভাবে করা হয়, তাহলে সেটাই পুরো বছর চলতে পারে। এর মাঝে যদি কোনো বড় পরিবর্তন হয়, যেমন ডলারের দাম হঠাৎ বাড়ে বা কমে, তখন সেগুলোর প্রভাব নিয়ে আলাদা করে আলোচনা করা যেতে পারে। না হলে সাধারণভাবে ওই নির্ধারিত ভাড়াই কার্যকর থাকতে পারে। আমরা এই প্রস্তাবটাই দিয়েছিলাম স্থায়ী সমাধানের জন্য, কিন্তু সেটা গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে না।

নৌপথে ৪২ শতাংশ ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব:
দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে অভ্যন্তরীণ নৌপথে লঞ্চের ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে লঞ্চ মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল (যাত্রী পরিবহন) সংস্থা। তারা যাত্রীদের ভাড়া ৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়ে গতকাল রোববার বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে (বিআইডব্লিউটিএ) চিঠি পাঠিয়েছে।

লঞ্চ মালিকদের সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মো. বদিউজ্জামান স্বাক্ষরিত সেই চিঠিতে বলা হয়েছে, ১৮ এপ্রিল সরকার ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা নির্ধারণ করেছে। এর ফলে লঞ্চ পরিচালনার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে প্লেট, এল, প্রপেলার, ইঞ্জিনের খুচরা যন্ত্রাংশ, ফুয়েলিং রড, গ্যাস, রং ও অন্যান্য যন্ত্রাংশের দামও বৃদ্ধি পেয়েছে। সব মিলিয়ে পরিচালন ব্যয় প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

লঞ্চমালিকদের প্রস্তাব অনুযায়ী, যাত্রীভাড়া ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত দূরত্বে প্রতি কিলোমিটারে ১ টাকা বাড়িয়ে ৩ টাকা ৭৭ পয়সা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে, যা প্রায় ৩৬ শতাংশ বেশি। আর ১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে প্রতি কিলোমিটারে বর্তমান ১ টাকা বাড়িয়ে ৩ টাকা ৩৮ পয়সা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা প্রায় ৪২ শতাংশ বেশি। এ ছাড়া সর্বনিম্ন যাত্রীভাড়া ২৯ টাকার পরিবর্তে ৩৫ টাকা নির্ধারণের অনুরোধ করা হয়েছে।

অন্যদিকে যাত্রীরা ভাড়া বাড়ানোর সম্ভাবনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আয়ের তুলনায় ব্যয় এমনিতেই বেড়ে গেছে। এখন পরিবহন ভাড়া বাড়লে দৈনন্দিন চলাচল আরও কঠিন হয়ে পড়বে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত কর্মজীবী মানুষের ওপর এর প্রভাব বেশি পড়বে।

কৃষি খাতে বাড়তি চাপ:
দেশে ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়ানোর ফলে কৃষি খাতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। বছরে প্রায় ১০ লাখ ৪৪ হাজার টন ডিজেল কৃষিতে ব্যবহৃত হওয়ায় কৃষকের মোট খরচ বাড়বে প্রায় ১ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা। আগে যেখানে বছরে ডিজেলে খরচ ছিল প্রায় ১০ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা, এখন তা বেড়ে দাঁড়াবে ১২ হাজার ৬ কোটি টাকায়।

দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ সেচ কার্যক্রম ডিজেলনির্ভর হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। বোরো মৌসুমের শেষ পর্যায়ে থাকলেও ধান কাটা, মাড়াই ও পরিবহনে অতিরিক্ত খরচ পড়বে। কোথাও কোথাও সেচ খরচও ইতোমধ্যে বেড়েছে।

কৃষকরা বলছেন, সেচ, যন্ত্র ভাড়া ও শ্রম খরচ বাড়ায় প্রতি বিঘায় উৎপাদন ব্যয় কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে। এতে ফসল বিক্রি করে খরচ উঠবে কি না, তা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, এ মূল্যবৃদ্ধি কৃষি অর্থনীতিতে দ্বিমুখী চাপ তৈরি করবে। একদিকে উৎপাদন খরচ বাড়ায় কৃষকের পক্ষে ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা আরও কঠিন হয়ে উঠবে। অন্যদিকে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষের ব্যয় বাড়বে। বিশেষ করে চালের দাম বৃদ্ধি দরিদ্র মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে এবং এর প্রভাব অন্যান্য খরচেও পড়ে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে আরও ত্বরান্বিত করবে।

বাড়ছে শিল্প উৎপাদন ব্যয়:
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর দেশের শিল্প ও উৎপাদন খাতে চাপ বাড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ঘাটতির সময়ে ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভরশীল কারখানাগুলোতে উৎপাদন ব্যয় দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। এতে করে পণ্যের দাম বাড়ানো অথবা মুনাফা কমে যাওয়ার দ্বৈত চাপে পড়েছেন উদ্যোক্তারা।

শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি সরাসরি উৎপাদন খরচে প্রভাব ফেলছে। তৈরি পোশাক, সিমেন্ট, ইস্পাত, সিরামিকসহ বিভিন্ন খাতে ইতোমধ্যে খরচ বাড়ার প্রবণতা দেখা গেছে। অনেক কারখানায় গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি থাকায় বিকল্প হিসেবে ডিজেল ব্যবহার করতে হয়, যা এখন আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।

রপ্তানিমুখী শিল্প খাতে পরিস্থিতি আরও জটিল। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে গিয়ে উদ্যোক্তারা পণ্যের দাম সহজে বাড়াতে পারছেন না। ফলে বাড়তি জ্বালানি খরচ তাদের মুনাফায় সরাসরি প্রভাব ফেলছে। এতে নতুন বিনিয়োগে ধীরগতি দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এদিকে অভ্যন্তরীণ বাজারমুখী শিল্পগুলোতে পণ্যের দাম বাড়ানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, উৎপাদন খরচ বাড়লে তা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই চাপানো ছাড়া বিকল্প থাকে না। ফলে বাজারে বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

শিল্প মালিকদের একটি অংশ মনে করছেন, যদি জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকে, তাহলে অনেক ছোট ও মাঝারি কারখানা টিকে থাকতে হিমশিম খাবে। বিশেষ করে যেসব কারখানার নিজস্ব জ্বালানি দক্ষতা কম, তাদের জন্য ঝুঁকি আরও বেশি।

ব্যাপক প্রভাব বিদ্যুৎ উৎপাদনে:
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে ব্যয় ও চাপ আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন খরচ সরাসরি বৃদ্ধি পাবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সম্প্রতি ফার্নেস অয়েলের দাম প্রতি লিটার ২৪ টাকা ৫৯ পয়সা বাড়িয়ে ৯৪ টাকা ৬৯ পয়সা নির্ধারণ করেছে। কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের অনেক বেসরকারি ও স্বতন্ত্র বিদ্যুৎকেন্দ্র (আইপিপি) এবং ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টে ফার্নেস অয়েল গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এসব কেন্দ্র জাতীয় বিদ্যুৎ সরবরাহের একটি বড় অংশ জোগান দেয়। ফলে তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইউনিটপ্রতি বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচও বেড়ে যাবে।

এনার্জি খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাস সংকটের কারণে অনেক সময় তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হয়। এই পরিস্থিতিতে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় আরও অস্থিতিশীল করে তুলবে। উৎপাদন ব্যয় বাড়লে শেষ পর্যন্ত এর চাপ শিল্প, ব্যবসা ও সাধারণ ভোক্তার ওপর পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

মূল্যস্ফীতিতে নতুন চাপ:
জ্বালানি তেল ও এলপি গ্যাসের দাম এক দফায় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোয় দেশে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, কৃষি উৎপাদন খরচ বাড়া এবং শিল্প খাতে অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রোববার থেকে কার্যকর নতুন দরে ডিজেলের লিটার ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অকটেন ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৪০ টাকা এবং পেট্রোল ১৯ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হয়েছে। একই সঙ্গে ১২ কেজি এলপি গ্যাসের দাম ২১২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৯৪০ টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন।

রাজধানীর পাইকারি বাজারগুলোতে পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত ডিজেলের দাম বাড়ায় সরবরাহ ব্যয় ইতোমধ্যে বেড়েছে। এর প্রভাবে খুচরা বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কাঁচাবাজারে বেশিরভাগ সবজির দাম কেজিপ্রতি ৮০ টাকার ওপরে উঠেছে, যা রোজার সময় ছিল ৬০ টাকার মধ্যে। ডিমের দামও বেড়ে ডজনপ্রতি ১২৮ টাকায় পৌঁছেছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বর্তমানে দেশে প্রায় ৯ শতাংশ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে, যা নতুন করে আরও বাড়তে পারে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক মহাপরিচালক ড. মোস্তফা কে. মুজেরীর মতে, জ্বালানির দাম বাড়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর চাপ আরও বাড়বে।

নির্মাণ ও অবকাঠামো খাতে ব্যয় বাড়ছে:
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব এবার স্পষ্ট হয়ে উঠছে নির্মাণ ও অবকাঠামো খাতে। ডিজেলনির্ভর যন্ত্রপাতি, পরিবহন এবং কাঁচামাল উৎপাদনের খরচ বেড়ে যাওয়ায় সামগ্রিক নির্মাণ ব্যয় বাড়তে শুরু করেছে। এতে সরকারি-বেসরকারি উভয় ধরনের প্রকল্পেই অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তেলের দাম বাড়ায় পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়ছে, যা সরাসরি নির্মাণ ব্যয়ে প্রভাব ফেলছে। পাশাপাশি নির্মাণসামগ্রী পরিবহনে ব্যবহৃত ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া বাড়ার আশঙ্কায় বাজারে কাঁচামালের দাম আরও বাড়তে পারে। নির্মাণ প্রকল্পে ব্যবহৃত এক্সকাভেটর, ক্রেন, কংক্রিট মিক্সারসহ অধিকাংশ ভারী যন্ত্রপাতিই ডিজেলচালিত। ফলে তেলের দাম বাড়ায় এসব যন্ত্র পরিচালনার খরচ বেড়ে গেছে। ঠিকাদাররা বলছেন, আগের বাজেটে প্রকল্প বাস্তবায়ন এখন কঠিন হয়ে পড়ছে, কারণ জ্বালানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আবাসন ও রিয়েল এস্টেট খাতে নির্মাণ ব্যয় বাড়ার কারণে ফ্ল্যাট ও বাণিজ্যিক স্থাপনার দাম বাড়তে পারে। এতে নতুন বিনিয়োগ কিছুটা কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  বহুমুখী   সংকট   চাপ   সরকার  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close