জ্বালানি সংকটে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বেড়েছে লোডশেডিং। রাজধানীতে পরিস্থিতি তুলনামূলক সহনীয় থাকলেও গ্রামাঞ্চলে দিনে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। কোথাও কোথাও পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। আকস্মিক ও অনিয়মিত লোডশেডিংয়ের কারণে প্রচণ্ড গরমে দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। সবচেয়ে বেশি কষ্টে রয়েছেন শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থরা। দিনের তাপমাত্রা বৃদ্ধির পাশাপাশি রাতে লোডশেডিং বাড়ায় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। ঘুম, পড়াশোনা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সব ক্ষেত্রেই তৈরি হয়েছে সমস্যা।
এমনকি দেশে চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে মোবাইল টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে বলে জানিয়েছে মোবাইল অপারেটরগুলো। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সারা দেশে নেটওয়ার্ক সচল রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে—বরিশাল নগরীতে দিনের ১২ ঘণ্টার মধ্যে গড়ে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। রাতেও একই অবস্থা বিরাজ করছে। বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলায় প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলায় প্রায় চার লাখ মানুষ বিদ্যুৎ সংকটে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। সামান্য বাতাস হলেই বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। পৌর এলাকায় দিনে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলেও উপজেলার ১০টি ইউনিয়নে প্রায় ১২ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকছে না। ঝিনাইদহে নির্ধারিত সময়সূচি ছাড়াই বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় শিক্ষা কার্যক্রম, স্বাস্থ্যসেবা ও ক্ষুদ্র ব্যবসা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাবনায় প্রতিদিন ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে, আর গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও খারাপ। একই চিত্র নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, মেহেরপুর ও গাজীপুরের কালিয়াকৈরেও। এসব এলাকায় চাহিদার তুলনায় অনেক কম বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে।
এর মধ্যে খুলনাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলায় প্রতিদিন ১০০ থেকে ২০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। জ্বালানি সংকটের কারণে কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ফলে দিন-রাত লোডশেডিং বেড়ে জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। অনেক এলাকায় সকালে এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ দিলে বিকেলে আসে না, আবার বিকেলে সরবরাহ দিলে রাতের বড় অংশ অন্ধকারে কাটছে। বিদ্যুৎ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কোনো কোনো উপজেলায় চাহিদা ১৯ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ দেওয়া যাচ্ছে মাত্র ৫ থেকে ৬ মেগাওয়াট।
রাষ্ট্রীয় সংস্থা পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার দুপুর ১টায় দেশে ১৪ হাজার ৩৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১২ হাজার ৩২৪ মেগাওয়াট। তখন ঘাটতি ছিল ২ হাজার ২৬ মেগাওয়াট। পরে বিকেলে উৎপাদন কিছুটা বাড়ানো হলে পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি হয়। বিকাল ৫টার দিকে ১৪ হাজার ১৮০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন হয় ১৩ হাজার ১৪৮ মেগাওয়াট। তখনও ঘাটতি ছিল প্রায় ১ হাজার ৩২ মেগাওয়াট। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) জানিয়েছে, আগামী মাসে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে সাড়ে ১৮ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে। পর্যাপ্ত জ্বালানির ব্যবস্থা করা না গেলে তখন বড় ধরনের লোডশেডিং হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, জ্বালানি আমদানিতে জটিলতা, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিপুল বকেয়া বিল এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য অস্থিরতা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহেও বিঘ্ন ঘটছে। ফলে গ্যাস ও কয়লার সরবরাহ কমে গেছে। বেসরকারি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জ্বালানি মজুতও শেষের পথে। দেশে প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানির অভাবে তা পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ব্যয়বহুল হওয়ায় তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোও পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না।
বিপিডিবি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশি-বিদেশি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া বিল ৪৭ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে বেসরকারি তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর পাওনা সাড়ে ১৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। সাত থেকে আট মাস ধরে বিল পরিশোধ না হওয়ায় এসব কেন্দ্রের উদ্যোক্তারা চরম সংকটে রয়েছেন। একই সঙ্গে আমদানি করা বিদ্যুতের বিলও প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা বকেয়া পড়েছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, কয়লাভিত্তিক উৎপাদন কিছুটা ব্যাহত হওয়ায় ঘাটতি দেখা দিলেও পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট চালু হয়েছে। পাশাপাশি এসএস পাওয়ার প্লান্টের একটি ইউনিটও পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে যাচ্ছে। এতে প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ইনডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডেভিড হাসানাত বলেন, তেল সংকটের কারণে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে গেছে। প্রায় ৫ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ২ হাজার মেগাওয়াটের মতো। পর্যাপ্ত তেল থাকলে আরও ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার মেগাওয়াট সরবরাহ সম্ভব ছিল। তিনি বলেন, বর্তমানে মোট সক্ষমতার মাত্র ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাচ্ছে, যা দ্রুতই ২০ শতাংশে নেমে আসতে পারে। এতে লোডশেডিং আরও বাড়বে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া বিল, ঋণ পরিশোধে জটিলতা, তেল আমদানিতে বিলম্ব এবং গ্যাস-কয়লার সরবরাহ ঘাটতির কারণে সংকট দ্রুত কাটার সম্ভাবনা কম। তাদের আশঙ্কা, মে মাসে তাপমাত্রা ও চাহিদা বাড়লে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং কমাতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে কৃষি উৎপাদন, খাদ্য নিরাপত্তা এবং গ্রামীণ অর্থনীতি বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
কেকে/এলএ