দেশের চলমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় সরকারের ভেতর ও বাইরে থাকা স্বার্থান্বেষী মহলের তৎপরতায় বেকায়দায় পড়ছে সরকার। এই মহল ব্যক্তিস্বার্থ এবং পতিত শক্তির এজেন্ডা বাস্তবায়নে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে হস্তক্ষেপ করে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। শুধু তাই নয়, তারা সরকারকে বিতর্কিত করতে বিভিন্ন কৌশলেরও আশ্রয় নিচ্ছে। সবশেষ এই মহলের অসাধুতার কারণে জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, আমলাতন্ত্র ও প্রশাসনের ভেতরে থাকা এই স্বার্থান্বেষীরা বর্তমান সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।
গত ১৭ বছরে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দেশের জ্বালানি খাত একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই করে আসছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, এই সময়টিতে গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ না করে বরং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলের মতো আমদানি-নির্ভর জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি করা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশীয় গ্যাসের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান কার্যক্রমে গতি আনা হয়নি। রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর পরিবর্তে বিদেশি কোম্পানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। একইসঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনে দ্রুত সক্ষমতা বাড়ানোর নামে উচ্চমূল্যের রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়, যা মূলত আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল।
তাদের মতে, এই নীতিগত সিদ্ধান্তগুলোর কারণে দেশের জ্বালানি খাতে একটি টেকসই ভিত্তি গড়ে ওঠেনি। বরং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের ওঠা-নামার সঙ্গে সরাসরি দেশের অর্থনীতি জড়িয়ে পড়েছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বৃদ্ধি, জ্বালানি ভর্তুকি বেড়ে যাওয়া এবং সার্বিকভাবে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির মতো সমস্যাগুলো প্রকট আকার ধারণ করেছে।
বিশ্লেষকরা আরও বলেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করে সীমিত কয়েকটি গোষ্ঠীর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ফলে জ্বালানি খাতে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার হয়নি। এর ফলেই দেশ এখনও আমদানি-নির্ভরতা থেকে বের হতে পারেনি এবং জ্বালানি নিরাপত্তা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, বর্তমানে দেশে যে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে, সেই সংকটের জন্য বিগত স্বৈরাচারী সরকার দায়ী। তিনি আরও বলেন, দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণ গ্যাস থাকলেও বিগত সরকার ক্ষীণ ব্যবসার স্বার্থে গ্যাস উত্তোলনের কোনো কর্মসূচি না নিয়ে জ্বালানি আমদানি-নির্ভর একটি রুটিন তৈরি করেছিল। আজ দেশে নিজস্ব গ্যাস উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলে হরমুজ প্রণালির এই সমস্যায় পড়তে হতো না দেশকে।
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী বলেন, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল যখন গণবিচ্ছিন্ন ও গণবিরোধী হয়, তার সুদূরপ্রসারী পরিণতি কত খারাপ হতে পারে, তার একটি প্রমাণ হচ্ছে এই মুহূর্তে দেশে যে জ্বালানি সংকট। এর প্রধান অপরাধে অপরাধী হলো পলাতক স্বৈরাচারী সরকার।
তেলের সংকট নিয়ে মন্তব্য করেছেন আম-জনতার দলের নেতা মো. তারেক রহমান। তিনি অভিযোগ করে বলেন, পেট্রোবাংলাসহ বিভিন্ন তেল কোম্পানিতে জামায়াতের কর্মকর্তারা বসে আছেন। জ্বালানি সরবরাহে রেশনিং ব্যবস্থাও সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে না। তিনি মনে করেন, জামায়াতি ও ড. ইউনূসের রেখে যাওয়া কর্মকর্তাদের দিয়ে সংকটের কার্যকর সমাধান সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ ইসলামী দলের আমির ড. আবদুল্লাহ আল নাসের বলেছেন, মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এমনিতেই বেড়ে গেছে। এর মধ্যে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি জনজীবনকে আরও কঠিন করে তুলবে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ফলে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ওপর। খাদ্যপণ্যসহ সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। এতে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাদের আয় না বাড়লেও ব্যয় বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে, ফলে স্বাভাবিক জীবনযাপন ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়বে।
তিনি বলেন, শিল্প-কারখানার উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, যা শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে প্রতিফলিত হবে। এতে বাজারে মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে। একইসঙ্গে কৃষি খাতও বড় ধরনের চাপের মুখে পড়বে। সেচ, পরিবহন ও কৃষি উপকরণের খরচ বেড়ে যাওয়ায় কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ জরুরি। বাজার তদারকি জোরদার করা, সিন্ডিকেট ভাঙা এবং নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। তারা সতর্ক করে বলেছেন, যদি স্বার্থান্বেষী মহলের প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তাহলে সরকারের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অর্জনও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ-এর গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেছেন, বর্তমান জ্বালানি সংকট মূলত প্রাপ্যতার সংকট। সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত আমদানি ও মজুতের কথা বলা হলেও বাস্তবে ভোক্তা পর্যায়ে তা দেখা যাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে ন্যূনতম চাহিদাও পূরণ হচ্ছে না। তার মতে, এই বাস্তবতায় জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি সংকট সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখবে না।
তিনি উল্লেখ করেন, জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির ফলে সরকারের ভর্তুকির চাপ কিছুটা কমতে পারে। সরকারি হিসাবে এ পর্যন্ত জ্বালানি খাতে ভর্তুকি বাবদ প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে। এছাড়া আগামী তিন মাসে জ্বালানি আমদানির জন্য আরও প্রায় ২.২ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রয়োজন হবে। এই প্রেক্ষাপটে মূল্য সমন্বয় আংশিকভাবে সরকারের আর্থিক চাপ লাঘবে সহায়ক হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, সরকারের ঘোষিত মজুত তথ্য এবং বাস্তব বিতরণ ব্যবস্থার মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে মজুতদারি বেড়েছে, আবার কেউ কেউ অতিরিক্ত তেল সংগ্রহ করে বাইরে বিক্রি করে মুনাফা করছে। এমনকি প্রয়োজন না থাকলেও অনেকে প্রতিদিন জ্বালানি সংগ্রহ করছেন। ফলে স্বাভাবিক দৈনিক সরবরাহ দিয়েও সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছে না।
এই পরিস্থিতিতে তিনি রেশনিং ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পরামর্শ দেন। পাশাপাশি মজুত ও বিতরণসংক্রান্ত তথ্য আরও স্বচ্ছ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তার মতে, প্রতিদিন ডিপো থেকে কত জ্বালানি ছাড় হচ্ছে এবং তা কোন জেলায়, কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র বা ফিলিং স্টেশনে কতটুকু সরবরাহ করা হচ্ছে—এই তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ করা হলে সংকট ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা বাড়বে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিএনপি সরকার ১৮০ দিনের একটি বিশেষ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এই কর্মপরিকল্পনার আওতায় ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন খাতে দৃশ্যমান অগ্রগতি লক্ষ করা যাচ্ছে। সরকার এটিকে নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখছে এবং ‘অভূতপূর্ব সাফল্য’ অর্জনের লক্ষ্যে এটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
এই ১৮০ দিনের কর্মসূচির অধীনে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী জোরদার করতে ফ্যামিলি কার্ড চালু, কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড প্রদান এবং কৃষিঋণ মওকুফের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যখাতে ই-হেলথ কার্ড চালু, খাল পুনঃখননের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা নিরসন ও কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগ এবং শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, অবকাঠামো উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, প্রশাসনিক সংস্কার এবং উৎপাদনমুখী অর্থনীতি গড়ে তোলার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির দিকেও জোর দিচ্ছে সরকার। একইসঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে যেন কোনো ধরনের সংকট তৈরি না হয়, সে বিষয়েও সরকার বিশেষ নজর রাখছে। স্বল্প সময়ের এই কর্মসূচির মাধ্যমে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দ্রুত বাস্তবায়ন করে জনগণের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করছে সরকার।
বর্তমান সরকার বিভিন্ন স্তরে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছে। তবুও গত ১৭ বছরে গড়ে ওঠা প্রশাসনিক কাঠামো ও প্রভাববলয় এখনো পুরোপুরি ভেঙে ফেলা যায়নি। এতে নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় এক ধরনের অদৃশ্য বাধা তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন সচিবালয়ে কর্মরত একাধিক কর্মকর্তা। তাদের মতে, প্রশাসনের ভেতরে ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর সক্রিয়তা সরকারের জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
সচিবালয়ের একাধিক সূত্রের দাবি, দীর্ঘ সময় ধরে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে প্রভাব বিস্তারকারী একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক এখনও পুরোপুরি ভাঙা সম্ভব হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে যেসব কর্মকর্তা বিভিন্ন কারণে প্রভাবশালী অবস্থানে ছিলেন, তাদের একটি অংশ অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও নিজ নিজ অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হন।
একই সময়ে, কিছু ক্ষেত্রে জামায়াত-ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গেও সমঝোতার মাধ্যমে প্রশাসনের নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় নতুন করে অবস্থান তৈরি বা পুরোনো প্রভাব অটুট রাখার অভিযোগ উঠেছে। আর এই অপশক্তির পৃষ্ঠপোষকতা করছে বিএনপিতে গজিয়ে ওঠা নব্য প্রভাবশালীরা। কোণঠাসা হয়ে পড়েছে ত্যাগী ও জ্যেষ্ঠ নেতৃত্ব। এই নব্য প্রভাবশালীরা নিজেদের আর্থিক সুবিধার জন্য সরকার ও দলকে হুমকির মুখে ফেলছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা এবং বিএনপির একজন জ্যেষ্ঠ নেতা জানান, দ্রুতই এ-সকল অব্যবস্থাপনা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে যেকোনো মুহূর্তে সরকারের বড় ক্ষতি হতে পারে।
কেকে/এলএ